আজকাল চিকিৎসকদের চেম্বারে একটি কথা খুবই পরিচিত হয়ে উঠেছে—‘ডাক্তার সাহেব, আমার সব রিপোর্ট নরমাল, কিন্তু আমি ভালো নেই।’ এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ অনেক সময় দেখা যায়, রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে বা অন্যান্য রিপোর্টে বড় কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে না, কিন্তু রোগী দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক, মাথাব্যথা বা মানসিক অবসাদে ভুগছেন। এই বাস্তবতা থেকেই চিকিৎসা জগতে গুরুত্ব পাচ্ছে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি—ফাংশনাল মেডিসিন। সহজ ভাষায় বললে, ফাংশনাল মেডিসিন রোগের নামের চেয়ে রোগের মূল কারণ খুঁজে বের করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। প্রচলিত চিকিৎসায় সাধারণত প্রথমে রোগ শনাক্ত করা হয়, তারপর সেই রোগ অনুযায়ী ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু ফাংশনাল মেডিসিন একটি ভিন্ন প্রশ্ন দিয়ে শুরু করে—এই রোগটি কেন হলো? শরীরের কোনো ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, যার ফলে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে?
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি, হজমের সমস্যা এবং ঘুমের অসুবিধায় ভুগছেন। সাধারণ চিকিৎসায় এই সমস্যাগুলো আলাদা আলাদা রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। কিন্তু ফাংশনাল মেডিসিন এই লক্ষণগুলোর পেছনের সামগ্রিক কারণ খোঁজার চেষ্টা করে। রোগীর খাদ্যাভ্যাস কেমন, তিনি পর্যাপ্ত ঘুম পাচ্ছেন কি না—তার মানসিক চাপ কতটা, শরীরের হরমোন ও হজমব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করছে কি না—এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। এখানে ‘ফাংশনাল’ শব্দটির অর্থ হলো শরীরের কার্যকারিতা বা কাজ করার ক্ষমতা। এটি কোনো বিকল্প বা অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি নয়। বরং এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে এবং কোথা থেকে সমস্যার সূচনা হচ্ছে—সে বিষয়টি বোঝার একটি বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত পদ্ধতি। ফাংশনাল মেডিসিনে চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো জীবনযাত্রার পরিবর্তন। সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম—এই বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রয়োজনে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় এবং রোগীর অবস্থা অনুযায়ী ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। এখানে ‘একই চিকিৎসা সবার জন্য’—এ ধারণা নেই। প্রতিটি মানুষ আলাদা, তাই চিকিৎসাও হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক। বিশেষ করে, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, দীর্ঘদিনের গ্যাস্ট্রিক সমস্যা, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS), অটোইমিউন রোগ বা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির মতো সমস্যায় এই পদ্ধতি সহায়ক হতে পারে। কারণ এই রোগগুলোর পেছনে প্রায়ই জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যের ভূমিকা থাকে। তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা জরুরি—ফাংশনাল মেডিসিন জরুরি চিকিৎসা, সংক্রমণ বা অপারেশনের বিকল্প নয়। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, গুরুতর সংক্রমণ বা সার্জারির প্রয়োজনীয় অবস্থায় প্রচলিত আধুনিক চিকিৎসাই সবচেয়ে কার্যকর। ফাংশনাল মেডিসিন মূলত দীর্ঘমেয়াদি ও জীবনযাত্রা-সম্পর্কিত সমস্যায় একটি সহায়ক ও সমন্বিত পদ্ধতি হিসেবে কাজ করে।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি, সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


খাদ্য ওষুধের কাজ করে?