রোহিঙ্গা গণহত্যার রায় ১৯ নভেম্বর, ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা বাংলাদেশের

রোহিঙ্গা গণহত্যার রায় ১৯ নভেম্বর, ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা বাংলাদেশের

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের দায় নির্ধারণে আগামী ১৯ নভেম্বর রায় দেবেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আদালতের শান্তি প্রাসাদে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় প্রকাশ্য অধিবেশনে রায় পড়বেন আদালতের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি ইউজি ইওয়াসাওয়া। এই রায়ে প্রথমবারের মতো কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি গণহত্যার জন্য দায়ী ঘোষণা করতে পারে আদালত। এমন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনে গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার আদালত রায় ঘোষণার তারিখ জানিয়েছে। এই রায় চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক হবে। এর বিরুদ্ধে আপিলের কোনো সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার রায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার অভিযোগে চলমান অন্য মামলাগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত দক্ষিণ আফ্রিকার করা ইসরাইলবিরোধী মামলা। গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধের ঘটনায় গণহত্যার অভিযোগ তুলেছে দেশটি। সেখানে নিশ্চিতভাবে নিহত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজারে পৌঁছেছে।

২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাটি করে। এতে ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযানের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ওই অভিযানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রাণ বাঁচাতে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবিরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী বসতি।

মিয়ানমার গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দেশটির দাবি, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসার হামলার জবাব দিতেই সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়েছিল। ২০১৭ সালের আগস্টে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় আরসার হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য নিহত হয়েছিলেন বলে দাবি করে মিয়ানমার।

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ভয়াবহতাও মামলাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের হয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা তদন্ত করেছিলেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী অ্যান্টোনিয়া মুলভি। তিনি মিডল ইস্ট আইয়ের ‘এক্সপার্ট উইটনেস’ পডকাস্টকে বলেন, গণহত্যার অভিযোগের পক্ষে গাম্বিয়ার যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে যৌন সহিংসতার ঘটনা।

মুলভির ভাষ্য অনুযায়ী, এক নারী তাকে বলেছিলেন, ‘আমি ভাগ্যবতী ছিলাম, আমাকে মাত্র তিনজন ধর্ষণ করেছে।’

তিনি জানান, সেনারা নারী ও কিশোরীদের পরিবারের সদস্য, এমনকি সন্তানদের সামনেই প্রকাশ্যে ধর্ষণ করত। জনসমাগমস্থলেও এসব ঘটনা ঘটানো হতো। কোনো কোনো ঘটনায় একসঙ্গে ৪০ জন পর্যন্ত নারী ও কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইড এই মামলায় রোহিঙ্গা সাক্ষীদের প্রতিনিধিত্ব করছে।

গাম্বিয়ার অভিযোগ, ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদ লঙ্ঘন করে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে মিয়ানমার। তৎকালীন সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে এসব অভিযান পরিচালিত হয়।

সেই সময় মিয়ানমারে অং সান সু চির নেতৃত্বে বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও সেনাবাহিনী কার্যত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। সেনাবাহিনীর তৈরি সংবিধানের কারণে সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সু চির সরকারকে উৎখাত করেন মিন অং হ্লাইং। চলতি বছরের এপ্রিলে তিনি সেনাপ্রধানের পদ ছাড়েন। পরে সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট আইনপ্রণেতাদের নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্ট তাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। জান্তা সরকারের আয়োজন করা নির্বাচনের পর এই ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে।

২০১৭ সালের অভিযানের সময় রোহিঙ্গারা গণহত্যা, ধর্ষণ ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার শিকার হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ওই অভিযানকে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ বা নির্মূল অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছিল।

তবে আইসিজেতে মামলাটি কোনো ব্যক্তির অপরাধের বিচার নয়। এটি দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধ। ফলে আদালত নির্ধারণ করবেন, গণহত্যার জন্য রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমার দায়ী কি না। কোনো ব্যক্তি অপরাধী কি না, তা এই মামলার বিষয় নয়।

মিয়ানমারকে গণহত্যার জন্য দায়ী করা হলে মিন অং হ্লাইংয়ের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরো বাড়তে পারে। তার প্রেসিডেন্ট হওয়াকে আন্তর্জাতিক বৈধতা পাওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন অনেকে।

যেভাবে শুরু হয়েছিল মামলা

২০১৮ সালে মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত মিশন জানায়, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল বলে ধারণা করার মতো যথেষ্ট তথ্য রয়েছে। এ জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে তদন্ত ও বিচার করার সুপারিশ করে সংস্থাটি।

এর পরের বছর, ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করে। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সমর্থন ছিল এই উদ্যোগের পেছনে। কোনো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও একটি রাষ্ট্রের গণহত্যার অভিযোগে অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘটনা ছিল এটি।

গাম্বিয়ার যুক্তি ছিল, ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদে স্বাক্ষরকারী প্রতিটি রাষ্ট্রেরই এই সনদ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। তাই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করার অধিকার তাদের রয়েছে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মিয়ানমারের তৎকালীন বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চি নিজে আদালতে উপস্থিত হয়ে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইসিজে অন্তর্বর্তী আদেশ দেন। আদালত বলেন, গণহত্যা সনদের আওতায় রোহিঙ্গাদের অধিকার অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বাস্তব ও আসন্ন ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে মিয়ানমারকে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ এবং এ-সংক্রান্ত প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

২০২২ সালের জুলাইয়ে মামলাটি শুনানির এখতিয়ার নিয়ে মিয়ানমারের আপত্তি খারিজ করে দেন আদালত। এরপর ২০২৬ সালের ১২ থেকে ২৯ জানুয়ারি মামলার মূল বিষয়ের ওপর শুনানি হয়। এতে রোহিঙ্গা সাক্ষীদের রুদ্ধদ্বার কক্ষে জবানবন্দি নেওয়া হয়।

মামলায় গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের বাইরে আরো ১১টি রাষ্ট্র অংশ নিয়েছে। দেশগুলো হলো বেলজিয়াম, কানাডা, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, মালদ্বীপ, নেদারল্যান্ডস, স্লোভেনিয়া ও যুক্তরাজ্য।

ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সহকারী অধ্যাপক এবং আইসিজের সাবেক সহযোগী আইন কর্মকর্তা মাইক বেকার মিডল ইস্ট আইকে বলেন, তৃতীয় পক্ষের এতগুলো রাষ্ট্রের অংশগ্রহণে এই প্রথম কোনো মামলার মূল বিষয়ে রায় দিতে যাচ্ছে আদালত।

তার মতে, গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমারের মতো মামলাগুলো সমসাময়িক বিশ্বে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ভূমিকা ও কার্যক্রমের পরিধি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই মামলার ফলাফল নির্ধারণ করবে, সেই প্রবণতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে কি না।

গণহত্যার অভিযোগে দুই পক্ষের যুক্তি

গাম্বিয়ার দাবি, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের একমাত্র যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা হলো, তাদের উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করা। ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদে উল্লেখ করা চার ধরনের কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে এই অভিযোগ আনা হয়েছে। এগুলো হলো—হত্যাকাণ্ড, শারীরিক বা মানসিকভাবে গুরুতর ক্ষতি করা, কোনো জনগোষ্ঠীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো জীবনযাপনের পরিস্থিতি তৈরি করা এবং জন্ম প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ব্যবস্থা নেওয়া।

মুলভি জানান, গাম্বিয়া প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা হত্যার তথ্য তুলে ধরেছে। তার মতে, এটি প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম হিসাব। এ ছাড়া কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের বিয়ে, সন্তান জন্মদান, চলাচল ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের বিষয়টিও আদালতে তুলে ধরা হয়েছে।

অন্যদিকে মিয়ানমারের দাবি, আরসার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালিয়েছিল তাদের সেনাবাহিনী। গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল—এমন সরাসরি কোনো প্রমাণ নেই। এ ছাড়া জাতিসংঘের তদন্ত মিশনের প্রতিবেদনকে প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয় বলেও যুক্তি দিয়েছে দেশটি।

২০২০ সালের আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশ মেনে চলার বিষয়ে মিয়ানমার ১২টি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে গাম্বিয়ার বক্তব্য, এসব প্রতিবেদন থেকে মিয়ানমার আদালতের নির্দেশনা মেনে চলছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো কারণ পাওয়া যায় না।

গণহত্যার অভিযোগে যৌন সহিংসতা কেন গুরুত্বপূর্ণ

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন সহিংসতার ধরন ও ব্যাপকতা মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মুলভি জানান, রাখাইনের মংডু, বুথিডং ও রাথিডং এলাকায় তিনি একই ধরনের ঘটনার ধারাবাহিকতা দেখতে পেয়েছেন।

তার বর্ণনা অনুযায়ী, সেনারা প্রথমে গ্রাম ঘিরে ফেলত। এরপর গুলি চালাত এবং বাড়িঘরে আগুন দিত। পরে নারী ও কিশোরীদের বেছে নিয়ে ধর্ষণ করত।

বেঁচে যাওয়া নারীদের কাছ থেকে তিনি দলবদ্ধ ধর্ষণ, পরিবারের সদস্যদের সামনে যৌন নির্যাতন, সামরিক শিবিরে কয়েক সপ্তাহ আটকে রাখা এবং যৌনাঙ্গ বিকৃত করার মতো ঘটনার বিবরণ পেয়েছেন। কোনো কোনো সেনাসদস্য নারী ও কিশোরীদের বলত, ‘ধর্ষণ করেই তোমাদের হত্যা করব।’

এক নারী মুলভিকে জানিয়েছিলেন, আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে ৯ জন পুরুষ ধর্ষণ করেছিল। তাদের অধিকাংশই ছিলেন সেনাসদস্য। ওই ঘটনায় তার গর্ভের সন্তান মারা যায়। নারীর এই বক্তব্য জাতিসংঘের তদন্ত মিশনের প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও তা পড়ে শোনানো হয়।

১৯৯৮ সালে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক রায়ে বলেছিলেন, ধর্ষণও গণহত্যার শামিল হতে পারে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও এই আইনি নীতি মেনে নিয়েছেন। তবে এ পর্যন্ত যৌন সহিংসতার ভিত্তিতে কোনো রাষ্ট্রকে গণহত্যার জন্য দায়ী করেননি আদালত।

মুলভির মতে, এবার এমন সিদ্ধান্ত এলে তা হবে ঐতিহাসিক। তিনি বলেন, বসনিয়া ও ক্রোয়েশিয়া-সংক্রান্ত আগের মামলাগুলোতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত যৌন সহিংসতার এমন ব্যাপকতা ও নৃশংসতা দেখেননি।

আন্তর্জাতিক আইনে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই রায়

গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলায় মূল বিষয়ের ওপর আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের এটি হবে তৃতীয় রায়। এক দশকেরও বেশি সময় পর এ ধরনের মামলায় রায় দিতে যাচ্ছেন বিচারকেরা।

২০০৭ সালে বসনিয়ার স্রেব্রেনিৎসায় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল বলে রায় দিয়েছিলেন আদালত। তবে গণহত্যা প্রতিরোধ ও অপরাধীদের শাস্তি দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সার্বিয়াকে দায়ী করা হয়েছিল। সরাসরি গণহত্যা সংঘটনের জন্য দেশটিকে দায়ী করা হয়নি।

২০১৫ সালে ক্রোয়েশিয়ার করা মামলায় সার্বিয়ার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে রায় দেন আদালত।

এবারের মামলায় বিচারকদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন হলো, গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণে ‘একমাত্র যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা’ পরীক্ষাটি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে।

কোনো জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্য থাকলে তাকে গণহত্যার উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এ ধরনের উদ্দেশ্যের সরাসরি প্রমাণ—যেমন লিখিত নির্দেশনা বা নীতিমালা—না থাকলে তা কীভাবে প্রমাণ করা যাবে, সেটিই এই আইনি পরীক্ষার মূল বিষয়।

এ ক্ষেত্রে আদালতকে দেখতে হবে, রাখাইনে ২০১৭ সালে যা ঘটেছিল, তার ব্যাখ্যা গণহত্যার উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো যুক্তিসংগত কারণে দেওয়া সম্ভব কি না।

গাম্বিয়ার দাবি, ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা, ধরন ও নৃশংসতা এই পরীক্ষায় গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। তারা গণহত্যা, নারী ও কিশোরীদের ওপর পরিকল্পিত ধর্ষণ এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কয়েক দশকের বৈষম্যমূলক নীতির বিষয়গুলো তুলে ধরেছে।

মুলভি বলেন, গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণ করে—এমন কোনো সরাসরি লিখিত নথি তাদের হাতে নেই। তবে তারা সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহ ও সহিংসতার ধরন আদালতের সামনে তুলে ধরেছেন।

অন্যদিকে মিয়ানমারের বক্তব্য, এসব ঘটনার অন্য যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা রয়েছে। দেশটির দাবি, আরসার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছিল সেনাবাহিনী। জানুয়ারির শুনানিতে মিয়ানমারের আইনজীবীরা আরো বলেন, সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করা ছিল না; বরং তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা ছিল লক্ষ্য।

মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের তদন্ত মিশনের সাবেক সদস্য ক্রিস সিডোটি বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত কীভাবে ঘটনার সত্যতা নির্ধারণ করেন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনকে কতটা গুরুত্ব দেন, সেটিও স্পষ্ট হবে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত মূলত আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি করেন। তাদের নিজস্ব কোনো তদন্তকারী বিভাগ নেই। কিন্তু এই মামলায় আদালতকে সরাসরি ঘটনার সত্যতা নির্ধারণের কাজও করতে হচ্ছে।

গণহত্যা প্রমাণের মানদণ্ড কি শিথিল হবে

গত অক্টোবরে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ গাম্বিয়ার নিয়োগ দেওয়া বিশেষ বিচারক নাভি পিল্লাইয়ের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তোলেন। নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী পিল্লাই গণহত্যা প্রমাণের আইনি মানদণ্ড শিথিল করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ওয়াল্টজের দাবি, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ প্রয়োগ করা সহজ হবে।

তবে মুলভি এই অভিযোগকে বিভ্রান্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বক্তব্য, গাম্বিয়া আদালতের কাছে গণহত্যা প্রমাণের মানদণ্ড শিথিল করার আবেদন করেনি। বরং তাদের যুক্তি, বিদ্যমান আইনি মানদণ্ড পূরণের মতো যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা কী

রোহিঙ্গা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা চান, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত মিয়ানমারকে গণহত্যার জন্য দায়ী ঘোষণা করুন। একই সঙ্গে তাদের জমি ও সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া, ক্ষতিপূরণ এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হোক।

তবে তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়া। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের আওতায় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়েছে বলে জানান মুলভি।

মাইক বেকারের মতে, মিয়ানমারকে গণহত্যার জন্য দায়ী করা হলে রোহিঙ্গাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও তৈরি হবে। তবে এ-সংক্রান্ত প্রতিকারের বিষয়টি আদালত পরবর্তী কোনো পর্যায়ে বিবেচনার জন্য রেখে দিতে পারেন।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের মৌলিক অধিকার ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ আইন ও ব্যবস্থায় সংস্কারের নির্দেশ দিলে তা হবে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

মুলভি বলেন, কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও রোহিঙ্গারা তাদের নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের কথা ভুলে যাননি। অন্তত তাদের ওপর সংঘটিত অপরাধের স্বীকৃতি চান তারা।

রায়ের পর কী ঘটতে পারে

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় মেনে চলতে মিয়ানমার আইনগতভাবে বাধ্য। দেশটি রায় বাস্তবায়ন না করলে গাম্বিয়া বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তুলতে পারবে। তবে এখন পর্যন্ত আইসিজের কোনো রায় বাস্তবায়নে নিরাপত্তা পরিষদ তার ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি।

মাইক বেকার মনে করেন, মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আদালতের রায় কার্যকর করা কঠিন হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে পুনরায় স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার শর্ত হিসেবে আইসিজের রায় মেনে চলার বিষয়টি সামনে আসতে পারে।

তার মতে, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রায় এলে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য অন্য রাষ্ট্রগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে। রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা এখন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

এদিকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন ও নিপীড়নের অভিযোগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কৌঁসুলি। তখন তিনি মিয়ানমারের সেনাপ্রধান ছিলেন। তবে বিচারকেরা এখনো এ আবেদনের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি।

মুলভি বলেন, তারা ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি দেখতে চান। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়া হোক, সেটিও তাদের প্রত্যাশা।

এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আর্জেন্টিনার একটি আদালত মিয়ানমারের ২৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন। তাদের মধ্যে মিন অং হ্লাইং ও অং সান সু চিও রয়েছেন। বিশ্বে যেকোনো জায়গায় সংঘটিত নৃশংস অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার রয়েছে—এমন আইনি নীতির ভিত্তিতে মামলাটি করা হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত আগের মামলার রায় ও আইনি নজির বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন। সে কারণে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায় অন্য বিচারাধীন মামলাগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেন বনাম রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ইসরাইল, নিকারাগুয়া বনাম জার্মানি এবং গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র বনাম রুয়ান্ডার মামলা।

ফলে আগামী ১৯ নভেম্বরের রায় শুধু রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রশ্নেই নয়, আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার দায় নির্ধারণ এবং রাষ্ট্রগুলোর জবাবদিহির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন