বিদেশি ঋণ পরিশোধে ব্যয় মেটাতে গিয়ে বিশ্বের অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশ শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারছে না। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ১১৩টি উন্নয়নশীল দেশ শিক্ষার তুলনায় বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে।
ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলো শিক্ষা খাতের তুলনায় গড়ে ৩ দশমিক ৬ গুণ বেশি অর্থ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেছে। এতে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পরিস্থিতি আগামী বছরগুলোতে আরও জটিল হতে পারে। কারণ, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলো ২০২৩ সালের তুলনায় শিক্ষা খাতে আন্তর্জাতিক সহায়তার ২১ শতাংশ ইতোমধ্যে হারিয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে এ সহায়তা আরও ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আফগানিস্তান, মালি, নাইজার ও লাইবেরিয়ার মতো কয়েকটি দেশে গত তিন বছরে শিক্ষা সহায়তা ৪০ শতাংশেরও বেশি কমেছে।
ইউনেস্কোর শিক্ষা বিভাগের পরিচালক মিন জিয়ং কিম বলেন, বর্তমান ঋণ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে মিতব্যয়ী, কম বিনিয়োগ এবং স্থবির উন্নয়নের এক দুষ্টচক্রে আটকে রাখছে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা কমছে এবং ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা মোকাবিলার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত ১৮টি দেশ শিক্ষা খাতের তুলনায় অন্তত পাঁচ গুণ বেশি অর্থ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেছে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা শিক্ষা খাতের ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১৬ গুণ বেশি অর্থ বিদেশি ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রচারাভিযান সংস্থা ডেট জাস্টিস জানিয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে দরিদ্র দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের চাপ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে দরিদ্র দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের পরিমাণ গত ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ৫৬টি দেশ তাদের মোট সরকারি আয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেছে।
ডেট জাস্টিসের নীতিবিষয়ক পরিচালক টিম জোনস বলেন, ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক জনসেবায় ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সহায়তা কমে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ২০২৪ সালে শিক্ষা খাতে বৈশ্বিক সহায়তা ৬০ কোটি মার্কিন ডলার কমে যায় এবং ২০২৫ সালে তা আরও হ্রাস পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউনেস্কোর মতে, শিক্ষা খাতে অর্থের ঘাটতির কারণে অনেক দেশে বিদ্যালয় পরিচালনায় সংকট তৈরি হয়েছে, পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না এবং শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঋণ পুনর্গঠনের বর্তমান পদ্ধতিতে পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছে ইউনেস্কো। সংস্থাটি স্বল্পমেয়াদি সমাধানের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ-সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে, যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলো ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি শিক্ষা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জনসেবায় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


