দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম সাহারা ও উত্তর আফ্রিকার মাগরেব অঞ্চলে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছে আলজেরিয়া ও মরক্কো। এবার সেই প্রতিযোগিতা আরো দক্ষিণে সাহেল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। কূটনীতি, নিরাপত্তা, অবকাঠামো, জ্বালানি, বাণিজ্য ও ধর্মীয় সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে অঞ্চলটিতে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে উত্তর আফ্রিকার এ দুই দেশ।
আলজেরিয়া নিরাপত্তা, ভৌগোলিক নৈকট্য ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সাহেল অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। অন্যদিকে মরক্কো অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক, অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর ও জ্বালানি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের কৌশল নিয়েছে।
এদিকে সাহেল অঞ্চলের মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজার নিজেদের সাবেক পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে নতুন অংশীদার খুঁজছে। তিন দেশ মিলে ‘অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস’ (এইএস) গঠন করেছে। ফলে আলজেরিয়া ও মরক্কোর প্রতিযোগিতা তাদের সামনে নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করছে।
পশ্চিম সাহারা ঘিরে দীর্ঘদিনের বিরোধ
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আলজেরিয়া ও মরক্কোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পশ্চিম সাহারা এবং মাগরেব অঞ্চলে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন।
সাবেক স্প্যানিশ উপনিবেশ পশ্চিম সাহারার বেশির ভাগ অংশ বর্তমানে মরক্কোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অঞ্চলটিকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে রাবাত। অন্যদিকে সাহরাউই জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোট আয়োজনের দাবিতে পলিসারিও ফ্রন্টকে সমর্থন দিয়ে আসছে আলজেরিয়া।
পাশাপাশি স্বাধীনতার পর থেকেই মাগরেব অঞ্চলের প্রধান শক্তি হওয়ার প্রতিযোগিতায় রয়েছে দেশ দুটি। এসব বিরোধের কারণে তাদের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ১৯৯৪ সাল থেকে দুই দেশের সীমান্ত বন্ধ রয়েছে। ২০২১ সাল থেকে তাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কও বিচ্ছিন্ন।
তবে বর্তমানে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা মাগরেব অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে সাহেল পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা করছে দুই দেশ।
নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক নৈকট্যের ওপর আলজেরিয়ার নির্ভরতা
আলজেরিয়ার কাছে সাহেল অঞ্চল প্রথমত জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। মালি ও নাইজারের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ফলে এ দুই দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ে আলজেরিয়ার ওপর।
সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, সীমান্তপারের চোরাচালান এবং দক্ষিণ সীমান্তসংলগ্ন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা—এসব চ্যালেঞ্জ আলজেরিয়ার পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। এ কারণে বিদেশে হস্তক্ষেপ না করার দীর্ঘদিনের নীতি ধীরে ধীরে পুনর্বিবেচনা করছে দেশটি।
গত ৩০ আগস্ট নাইজারের রাজধানী নিয়ামেতে অভ্যুত্থানের একটি চেষ্টা হওয়ার পরদিন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুরোধে দেশটিতে চারটি এসইউ-৩০ যুদ্ধবিমান পাঠায় আলজেরিয়া। এরপর ২৫ অক্টোবর দেশটির পার্লামেন্ট নাইজারে সেনা মোতায়েনের অনুমোদন দেয়। ১৯৭৩ সালের পর এই প্রথম এমন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে আলজেরিয়া।
একই সঙ্গে বামাকো ও নিয়ামের সঙ্গে সংকটের কারণে যে অঞ্চলে আলজেরিয়ার প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়েছিল, সেখানে কূটনৈতিক ভূমিকা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে দেশটি।
মালির সঙ্গে আলজেরিয়ার বিরোধের সূত্রপাত ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। সে সময় আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলে মালি। দুই দেশই নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়। এর পর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ২০১৫ সালের আলজিয়ার্স শান্তিচুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয় বামাকো। উত্তর মালিতে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আলজেরিয়ার মধ্যস্থতায় ওই চুক্তি হয়েছিল।
২০২৫ সালের এপ্রিলে আলজেরিয়ার গুলিতে মালির একটি ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার পর বিরোধ আরো বিস্তৃত হয়। দুই পক্ষই দাবি করে, ড্রোনটি তাদের নিজ নিজ আকাশসীমায় উড়ছিল। এরপর সাহেল রাষ্ট্রজোটের তিন দেশ এবং আলজেরিয়া একে অপরের কাছ থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়। তবে এরপর থেকে নাইজারের সঙ্গে আলজেরিয়ার সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) বিশ্লেষক জালেল হারচাউই মনে করেন, আলজেরিয়ার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে মরক্কোর সঙ্গে প্রতিযোগিতার দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, ‘সব জায়গায় মরক্কোকে দেখতে যাওয়ার বিষয় এটি নয়।’ তার মতে, মালিতে মরক্কোর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হলেও নাইজারে তা অনেক বেশি সীমিত।
হারচাউই আরো বলেন, ‘আলজেরিয়া মরক্কোকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত নেয় না।’ তার মতে, আলজেরিয়ার সিদ্ধান্তের মূল চালিকাশক্তি বাস্তব নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিশেষ করে মালি ও নাইজারের অবস্থা।
তিনি উল্লেখ করেন, বামাকো ও নিয়ামের কর্তৃপক্ষ এখন তুয়ারেগ জনগোষ্ঠীর প্রশ্নে আলজেরিয়ার বিশ্লেষণকে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আলজেরিয়া মনে করে, এ সমস্যার সমাধানে শুধু সামরিক পদ্ধতি নয়, রাজনৈতিক উদ্যোগও প্রয়োজন।
তুয়ারেগরা উত্তর মালি, নাইজার ও দক্ষিণ আলজেরিয়ায় বসবাসকারী বারবার জনগোষ্ঠী। স্বাধীনতার পর থেকেই তারা অধিক স্বায়ত্তশাসন ও স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকারগুলো তাদের অবহেলা করে। দীর্ঘদিনের এই অসন্তোষ থেকেই একাধিক বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১২ সালে মালির বিদ্রোহ অন্যতম। তুয়ারেগদের দাবির সমাধানের লক্ষ্যে ২০১৫ সালের আলজিয়ার্স শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল।
ভৌগোলিক নৈকট্য, স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান এবং তুয়ারেগ সংকট মোকাবিলার অভিজ্ঞতা—এসব কারণে সাহেল অঞ্চলে আলজেরিয়ার প্রভাব আবার বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অর্থনীতি ও অবকাঠামোকে হাতিয়ার করছে মরক্কো
আলজেরিয়ার তুলনায় মরক্কোর কৌশল কিছুটা ভিন্ন। দেশটি নিরাপত্তার চেয়ে অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
পলিসি সেন্টার ফর দ্য নিউ সাউথের (পিসিএনএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক ও সাহেলবিষয়ক স্বাধীন পরামর্শক রিদা লিয়ামুরি বলেন, ‘মরক্কো সাহেল অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে।’
আফ্রিকার কয়েকটি দেশে মরক্কোর ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম রয়েছে। এসব ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সাহেল অঞ্চলে নিজেদের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে দেশটি। পাশাপাশি কৃষি সহযোগিতা এবং ইমামদের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে, যা ধর্মীয় সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজার মরক্কোর রাজধানী রাবাতে দেশটির ‘আটলান্টিক ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রতি সমর্থন জানায়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, স্থলবেষ্টিত সাহেল অঞ্চলের দেশগুলোকে মরক্কোর বন্দর অবকাঠামো ব্যবহার করে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেওয়া।
এই উদ্যোগ শুধু বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নয়; এর মাধ্যমে মরক্কো উত্তর আফ্রিকা থেকে পশ্চিম আফ্রিকা ও সাহেল অঞ্চল পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তুলতে চায়।
দাখলা-নুয়াকচট পরিবহন ও অর্থনৈতিক একীভূতকরণ প্রকল্প এই কৌশলের একটি উদাহরণ। গত সেপ্টেম্বরে মরক্কো ও মৌরিতানিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি কাঠামোগত চুক্তিতে আরএন৪ সড়ক সংস্কার ও সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। বৃহত্তর এই যোগাযোগপথটি পশ্চিম সাহারার দক্ষিণাঞ্চলের দাখলা থেকে গেরগুয়েরাত সীমান্ত চৌকি হয়ে মৌরিতানিয়ার নুয়াদিবু ও নুয়াকচট পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
এ ছাড়া ২০২৮ সালে চালু হওয়ার কথা রয়েছে দাখলা আটলান্টিক বন্দর। মরক্কোর এই কৌশল বাস্তবায়নে বন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দুই দেশের প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ মৌরিতানিয়া
মরক্কোর আটলান্টিকমুখী পরিকল্পনা এবং আলজেরিয়ার আঞ্চলিক স্বার্থের মাঝখানে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে মৌরিতানিয়া। দেশটি দুই দেশের পরিকল্পনার সংযোগস্থলে পরিণত হচ্ছে।
আলজেরিয়া ঐতিহ্যগতভাবে নিজেদের দক্ষিণ সীমান্ত ও সাহারা অতিক্রমকারী যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সাহেল অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। অন্যদিকে মরক্কো মৌরিতানিয়াকে কেন্দ্র করে আটলান্টিক উপকূলমুখী করিডর গড়ে তুলছে।
দুই দেশের কৌশলের ভিত্তি একই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত—সাহেল অঞ্চলের মতো স্থলবেষ্টিত এলাকায় অবকাঠামো ও বাজারে প্রবেশাধিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে।
জ্বালানি খাতেও দুই দেশের প্রতিযোগিতা রয়েছে। নাইজেরিয়া-মরক্কো গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পটি মৌরিতানিয়ার ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা। প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন প্রকল্পের অর্থায়ন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে নাইজেরিয়া-নাইজার-আলজেরিয়া ট্রান্স-সাহারান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প। গত জুনে আলজেরিয়ার অংশে এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। দুটি প্রকল্পেরই লক্ষ্য নাইজেরিয়ার গ্যাস ইউরোপের বাজারে পৌঁছে দেওয়া।
এই প্রতিযোগিতার পেছনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকাও রয়েছে। আবুধাবি মৌরিতানিয়ায় অবকাঠামো ও বন্দর নেটওয়ার্কের অর্থায়ন এবং উন্নয়নে যুক্ত রয়েছে। এর ফলে মরক্কোর আটলান্টিকমুখী পরিকল্পনা আরো শক্তিশালী হতে পারে।
অন্যদিকে আবুধাবি ও রাবাতের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা এবং পশ্চিম সাহারা প্রশ্নে মরক্কোর অবস্থানের প্রতি আমিরাতের সমর্থনকে সন্দেহের চোখে দেখে আলজেরিয়া। এই অবিশ্বাস দুই দেশের বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনার অংশ। এর পরিণতিতে গত সেপ্টেম্বরে আলজেরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। আমিরাতের বিরুদ্ধে বৈরী কর্মকাণ্ড ও আঞ্চলিক বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনেছিল আলজেরিয়া।
সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে দুই দেশ
অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে সামরিক ব্যয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে আলজেরিয়া। ২০২৫ সালে দেশটি প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ২৫৪০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে মরক্কো ব্যয় করেছে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার। আগের বছরের তুলনায় দেশটির সামরিক ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে সামরিক ব্যয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মরক্কো।
দুই দেশের সামরিক প্রতিযোগিতা থেকে উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে সাহেল অঞ্চল ভবিষ্যতে আলজেরিয়া ও মরক্কোর সরাসরি সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠবে। বরং এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, দুই দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এখন মাগরেব অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
সাহেল-আফ্রিকা ইনস্টিটিউট ফর ডিপ্লোম্যাসি অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্সের (ইসাদি) সভাপতি ও মালির সাবেক ইউনেসকো রাষ্ট্রদূত ওমর কেইতা মনে করেন, এই অস্ত্র প্রতিযোগিতা প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের দিকে গড়াবে না।
তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আমি একে সংঘাতের চেয়ে অবস্থান ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা হিসেবেই বর্ণনা করব।’
কেইতা জোর দিয়ে বলেন, সাহেল অঞ্চলকে এমন কোনো ‘শূন্যস্থান’ হিসেবে দেখা উচিত নয়, যেখানে বাইরের শক্তিগুলো কেবল নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে।
প্রতিযোগিতাকে সুযোগ হিসেবে দেখছে সাহেল অঞ্চলের দেশগুলো
সাহেল রাষ্ট্রজোটের দেশগুলোর জন্য আলজেরিয়া ও মরক্কোর এই প্রতিযোগিতা একই সঙ্গে সীমাবদ্ধতা ও সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ফ্রান্সসহ অন্যান্য পশ্চিমা অংশীদারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাওয়া সাহেল অঞ্চলের সামরিক জান্তাগুলো রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। তবে শুধু রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করলেই তাদের বিনিয়োগ, সড়ক যোগাযোগ, জ্বালানি, বাণিজ্যিক বাজারে প্রবেশাধিকার এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।
এ অবস্থায় আলজেরিয়া ও মরক্কোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা তাদের সামনে আরও বেশি বিকল্প তৈরি করছে।
কেইতার মতে, সাহেল অঞ্চলের দেশগুলোর উচিত কোনো একটি পক্ষ বেছে না নিয়ে একাধিক দেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। এসব অংশীদারত্ব হবে পরস্পরের পরিপূরক এবং এর ভিত্তি হবে ‘বৈচিত্র্যভিত্তিক কূটনীতি’।
তার মতে, এর ঝুঁকি হলো—একটি দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে অন্য কোনো দেশের ওপর নতুন করে নির্ভরশীল হয়ে পড়া।
কেইতা বলেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এটি গড়ে ওঠে আস্থা, প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতা এবং জনগণের জন্য বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে।’
এটাই সম্ভবত আলজেরিয়া ও মরক্কো—দুই দেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বর্তমানে অর্থনীতি ও অবকাঠামো খাতে মরক্কো কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে ভৌগোলিক নৈকট্য, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে বিশেষ করে মালি ও নাইজারে আলজেরিয়ার অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী।
তবে কোনো শক্তিই সাহেল অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ করে না। অঞ্চলটি এখনো নিজস্ব রাজনৈতিক সংকট, স্থানীয় সংঘাত, সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং সাহেল অঞ্চলের সরকারগুলোর সার্বভৌম সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
কেইতা বলেন, ‘তাই প্রশ্নটি এই নয় যে সাহেল অঞ্চলে আলজেরিয়া নাকি মরক্কো বেশি প্রভাব বিস্তার করবে। মৌলিক প্রশ্ন হলো, সাহেল অঞ্চলের দেশগুলো এই প্রতিযোগিতাকে নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, উন্নয়ন এবং সম্মিলিতভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগে পরিণত করতে পারবে কি না।’
আগামী দিনে এই প্রতিযোগিতার গতিপথ বোঝার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রথমটি হলো, ২০২৮ সালে দাখলা আটলান্টিক বন্দর চালু করা সম্ভব হয় কি না। দ্বিতীয়টি হলো, বামাকো ও নিয়ামেতে কূটনৈতিক প্রভাব পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে আলজেরিয়া তার প্রচেষ্টাকে বাস্তব ও দৃশ্যমান প্রকল্পে রূপ দিতে পারে কি না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

