যুক্তরাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত একটি বিমানঘাঁটিতে হামলার ষড়যন্ত্রের পেছনে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) হাত থাকার জোরালো সন্দেহ করছে ব্রিটিশ সরকার। এ ঘটনায় ইরানের দুই নাগরিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে লন্ডন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে তেহরান।
সোমবার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেন, ইংল্যান্ডের ফেয়ারফোর্ডে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) একটি ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে কথিত ষড়যন্ত্রটি ‘প্রায় নিশ্চিতভাবেই’ ইরানের আইআরজিসি পরিচালনা করেছে। তবে এ ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতার পক্ষে বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ করেনি ব্রিটিশ সরকার।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বার্নহাম বলেন, ‘আমরা আমাদের ভূখণ্ডে এ ধরনের হুমকি সহ্য করব না।’
তিনি আরো বলেন, ‘ইরানের অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোর তৎপরতা দমনে আমরা আমাদের হাতে থাকা সব ক্ষমতা ব্যবহার করব। তাদের অর্থায়নের উৎসগুলোও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।’
ইরান ও আইআরজিসির ক্ষতি করার সক্ষমতা সীমিত করতে আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলেও জানান তিনি।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর ভোরে ইংল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির কাছে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবাদ ও বিস্ফোরকসংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহে ২০ বছর বয়সি পাঁচ ব্রিটিশ নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
পুলিশ জানায়, সন্দেহভাজনদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি ভ্যানে পেট্রল পাওয়া গেছে। তবে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।
পরে কঠোর শর্তে পুলিশি জামিনে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর আরো দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের একজন ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিক। তারাও পরে মুক্তি পান। এখন পর্যন্ত কাউকেই অভিযুক্ত করা হয়নি। ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিকে ঘিরে হুমকির উৎস ও ধরন সম্পর্কেও বিস্তারিত জানা যায়নি।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় দুই ইরানি
সোমবার যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড জানান, ইরানি সরকারের পক্ষে ‘শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করা বা তাতে জড়িত থাকার’ অভিযোগে দুই ইরানি নাগরিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একজন হলেন রুহোল্লাহ বাঘজান্দি। তিনি আইআরজিসির পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রমের প্রধান। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তার সম্পদ জব্দ করা হবে, যুক্তরাজ্যে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
অন্যজন শাহরাম আলি রেজা তামারজাদেহ জাক্কি। ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি জিন্দাশতি অপরাধী নেটওয়ার্কের একজন সহযোগী। নেটওয়ার্কটির ওপর আগেই যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইরানের ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে একাধিক ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে।
মিলিব্যান্ড জানান, তিনি যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতকেও তলব করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানকে বারবার স্পষ্ট করে জানিয়েছি, ব্রিটেন তার ভূখণ্ডে কোনো হুমকি সহ্য করবে না।’
অভিযোগ অস্বীকার তেহরানের
ব্রিটিশ অভিযোগ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। সোমবার যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলী মুসাভি দেশটির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মন্ত্রী স্টিফেন ডাউটির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি ফেয়ারফোর্ডের ঘটনায় ইরানের কোনো ভূমিকার অভিযোগ ‘দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান’ করেন। পাশাপাশি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে ‘প্রমাণহীন বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকার’ আহ্বান জানান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার (আইআরএনএ) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তে সহযোগিতা করতে তেহরান প্রস্তুত বলে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন মুসাভি।
গত মাসে লন্ডনে ইরানের দূতাবাস এক বিবৃতিতে বলেছিল, ফেয়ারফোর্ডের কাছে গ্রেপ্তারের ঘটনার সঙ্গে ইরানকে যুক্ত করার ‘ভিত্তিহীন ও বিদ্বেষপূর্ণ জল্পনা’ তেহরান দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান ও নিন্দা করছে। এ ধরনের অভিযোগ ‘ইরানভীতি ছড়ানোর প্রচারণাকে উসকে দেবে’ বলেও সতর্ক করেছিল দূতাবাস।
ইরান যুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ফেয়ারফোর্ড
লন্ডন থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত আরএএফ ফেয়ারফোর্ড। ইউরোপে মার্কিন বোমারু বিমানের জন্য এটি অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের সময় মার্কিন সামরিক বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রেও ঘাঁটিটি ব্যবহার করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, সম্ভাব্য ইরানি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ঘাঁটিটিতে জটিল ড্রোন হামলার আশঙ্কায় চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বি-৫২ ও বি-১ বোমারু বিমান সরিয়ে নেয়।
এদিকে সোমবার যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের অধিকাংশ দেশ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ ২৯টি দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানের ‘সহিংস হামলা চালানোর ব্যবহার’ কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে প্রাণঘাতী হামলার ষড়যন্ত্র, অগ্নিসংযোগ, নাশকতা, সাইবার হামলা এবং অংশীদার দেশগুলোর বিরুদ্ধে অন্যান্য সমন্বিত তৎপরতা।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘প্রতিনিধি গোষ্ঠী বা অন্য কোনো উপায়ে আমাদের ভূখণ্ডে থাকা মানুষকে হুমকি দেওয়া, নীরব করা, ভয় দেখানো, হয়রানি করা, ক্ষতি করা বা জবরদস্তি করার যেকোনো চেষ্টা অগ্রহণযোগ্য।’
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

