ইসরাইলের নির্বাচনে মুসলিম দলগুলোর আকাশচুম্বী সাফল্য, কেন বাড়ছে গুরুত্ব

ইসরাইলের নির্বাচনে মুসলিম দলগুলোর আকাশচুম্বী সাফল্য, কেন বাড়ছে গুরুত্ব

ইসরাইলের পার্লামেন্ট (নেসেট) নির্বাচনে নজিরবিহীন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে দেশটির মুসলিম ও আরব দলগুলো। ৪০ লাখেরও বেশি ভোট গণনার পর দেখা গেছে, আরব-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলো সম্মিলিতভাবে রেকর্ড ১৯টি আসন পেতে যাচ্ছে। দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ নির্বাচনে আরব দলগুলোর এই আকাশচুম্বী সাফল্য ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের সমীকরণ সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে এবং তাদেরকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু বা ‘কিংমেকার’-এর ভূমিকায় নিয়ে এসেছে।

২০২২ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে আরব দলগুলো পেয়েছিল মাত্র ১০টি আসন। এবার সেই আসনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছাতে চলেছে।

বিজ্ঞাপন

আরব জোটের বিপুল উত্থান

ইসরাইলের নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশটির আরব দলগুলোর মধ্যে প্রধান নির্বাচনী জোট জয়েন্ট লিস্ট একাই ১৩টি আসন পেতে যাচ্ছে। অন্যদিকে মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থী দল ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা ‘রা’আম’ পাচ্ছে ৬টি আসন। ফলে পার্লামেন্টের ১২০টি আসনের মধ্যে এই দুই দলের যৌথ আসনসংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ১৯টিতে।

নজিরবিহীন এ ফলাফলের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে মুসলিম ভোটারদের বিপুল উপস্থিতি। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে রেকর্ড ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা ২০২২ সালের চেয়ে ৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। বেদুইন অধ্যুষিত অঞ্চলসহ আরব লোকালয়গুলোতে ভোট দেওয়ার তীব্র স্রোত দেখা যায়, যার ফলশ্রুতিতে পার্লামেন্টে বড় চমক দেখাল মুসলিম প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো।

সরকার গঠনে মুসলিমদের ওপর নির্ভরশীলতার সমীকরণ

ইসরাইলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য যেকোনো জোটের প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। তবে গণনাকৃত ফলাফলে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট পেয়েছে ৫৪টি আসন। এর মধ্যে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৭টি, ধর্মীয় দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ৭টি, শাস ৭টি, উগ্র ডানপন্থী ওজমা ইয়েহুদিত ৭টি এবং রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টি ৬টি আসন পাচ্ছে।

অন্যদিকে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মাঠে নামা সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পাচ্ছে মাত্র ৪৭টি আসন। এর মধ্যে আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি ২১টি, নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদের জোট ‘বি’ইয়াখাদ’ ১১টি, ইয়াইর গোলানের ডেমোক্র্যাটস ৮টি এবং আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু ৭টি আসন পেতে পারে।

ফলে ডান বা মধ্যপন্থী—কোনো জোটই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি।

‘কিংমেকার’ মুসলিম দলগুলো, কাটছে না অনিশ্চয়তা

ফলাফল পর্যালোচনায় স্পষ্ট যে, আরব-মুসলিম দলগুলোর ১৯টি আসনের সমর্থন ছাড়া কোনো জোটেরই পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা বা দীর্ঘমেয়াদে সরকার পরিচালনা করা অসম্ভব। অর্থাৎ, ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা নির্ধারণে মুসলিম আইনপ্রণেতাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে।

তবে এই আকাশচুম্বী সাফল্যের মুখেও সরকার গঠন নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। কারণ গাদি আইজেনকট ও নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের কট্টর নেতারা আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সরকার গঠনের ক্ষেত্রে প্রবল বিরোধিতা করছেন। একমাত্র ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়াইর গোলান এ বিষয়ে কিছুটা নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছেন।

এদিকে রা’আম নেতা মানসুর আব্বাস জানিয়েছেন, আরব সমাজের উন্নয়ন, অধিকার রক্ষা ও অপরাধ নির্মূলে সুনির্দিষ্ট সমঝোতার ভিত্তিতেই তারা সরকারে যুক্ত হওয়া বা বাইরে থেকে আস্থা ভোটে সমর্থনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।

যদি শেষ পর্যন্ত বিরোধী বা ক্ষমতাসীন দলগুলো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয় এবং মুসলিম দলগুলোর সঙ্গে জোট গড়তে অস্বীকৃতি জানায়, তবে ইসরাইলের রাজনীতি চরম অচলাবস্থায় পড়বে এবং দেশটিতে পুনরায় নতুন জাতীয় নির্বাচনের ডাক দিতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন