পাকিস্তানে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশটির শক্তিশালী সেনাপ্রধানকে আরও বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে এবং সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার সীমিত করা হচ্ছে । সোমবার সিনেটে গৃহীত একটি সাংবিধানিক সংশোধনীতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিরোধীদল এই পদক্ষেপকে গণতন্ত্রের জন্য “হুমকি” বলে আখ্যা দিয়েছে।
ইতিহাসে সামরিক অভ্যুত্থানের প্রবণতা থাকা পাকিস্তান বর্তমানে নির্বাচিত সরকারের দীর্ঘতম সময় পার করছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসামরিক সরকার কর্তৃত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করলে সেনাবাহিনী ক্রমেই শাসন ব্যবস্থায় প্রভাব বাড়িয়েছে, যদিও সরাসরি ক্ষমতা দখল করেনি।
মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে সিনেটে পাস হয় বিলটি। যা সাংবিধানিক সংশোধনের জন্য অস্বাভাবিক দ্রুত প্রক্রিয়া। বিলটি এখন নিম্নকক্ষে যাবে, যেখানে অনুমোদন পেলেই আইনে পরিণত হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সেনাপ্রধান আসিম মুনির— যাকে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর “প্রিয় ফিল্ড মার্শাল” বলে উল্লেখ করেছিলেন— চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস নামে নতুন একটি পদে পুরো সেনাবাহিনী, বিমান ও নৌবাহিনীর সর্বমোট কমান্ড গ্রহণ করবেন। তাঁর মেয়াদ শেষে তিনি আজীবন পদমর্যাদা ও আইনি দায়মুক্তি পাবেন।
এর ফলে সেনাবাহিনীর প্রভাব সাংবিধানিকভাবে আরও দৃঢ় হবে, যা ভবিষ্যতে সহজে বাতিল করা যাবে না। এতদিন পর্যন্ত সেনাপ্রধান ছিলেন বিমান ও নৌবাহিনীর প্রধানদের সমতুল্য। তাঁদের ওপর ছিল জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান। এই পদটি বাতিল করা হবে প্রস্তাবিত সংস্কারে।
একই সঙ্গে সংবিধান-সংক্রান্ত মামলা আর সুপ্রিম কোর্টে নয়, নতুন গঠিত ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্টে শুনানি হবে, যার বিচারপতিরা সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। সমালোচকরা বলছেন, এর ফলে সরকার-নিয়ন্ত্রিত বিচারকরা এখন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলির রায় দেবেন। আর সুপ্রিম কোর্ট কেবল দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা দেখবে।
সংস্কার অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারিও আজীবন বিচার থেকে অব্যাহতি পাবেন।
তথ্য মন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেন, “এই সংশোধনীগুলো শাসনব্যবস্থা ও প্রাদেশিক সমন্বয় জোরদার করতে এবং ভারতের সঙ্গে মে মাসের সংঘর্ষের পর জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে জরুরি।”
সরকার জানিয়েছে, তাদের সংসদে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ ভোট রয়েছে, যা সিনেট ও জাতীয় পরিষদ উভয় কক্ষের অনুমোদনের জন্য আবশ্যক।
বিরোধীদের ওয়াকআউট
বন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রতিষ্ঠিত সবচেয়ে বড় বিরোধী দল পিটিআই (পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ) জানায়, তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি। সোমবার সংশোধনীটি সিনেটে উত্থাপন করা হলে তীব্র প্রতিবাদের পর বিরোধী দলগুলো ওয়াকআউট করে।
পিটিআইয়ের আন্তর্জাতিক মুখপাত্র জুলফি বুখারি বলেন, “এই সংশোধনী সরকারের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার, বিরোধী কণ্ঠ রুদ্ধ করার এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করার হাতিয়ার।”
আইনমন্ত্রী আজম তারার বলেন, মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয়েছে ভারতের সঙ্গে মে মাসের সংঘর্ষে “জাতির নায়ক” হিসেবে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে। এই পদটি সংবিধানিক সুরক্ষা পাবে।
সেনাবাহিনী এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। তবে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আধুনিক যুদ্ধের পরিবর্তিত রূপ— যেখানে স্থলবাহিনী এককভাবে মুখ্য নয়— সেই বাস্তবতায় তিন বাহিনীর ঐক্যবদ্ধ কমান্ড এখন অপরিহার্য।
সরকারের দাবি, নতুন আদালত গঠনের উদ্দেশ্য হলো সুপ্রিম কোর্টের মামলার জট কমানো, কারণ বর্তমানে সংবিধান-সংক্রান্ত মামলার কারণে আদালতের অধিকাংশ সময় নষ্ট হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
এসআর/
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

