বিহার থেকে মাদরাসায় পড়তে যাওয়া শিশুদের কেন আটক করা হয়েছিল

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

বিহার থেকে মাদরাসায় পড়তে যাওয়া শিশুদের কেন আটক করা হয়েছিল
ছবি: সংগৃহীত

ঘটনাটি গত ১১ এপ্রিলের। বিহারের আটজন শিক্ষক এবং ১৬৩ শিশু-কিশোর পাটনা-পুনে এক্সপ্রেসে করে মহারাষ্ট্রের একটি মাদরাসার উদ্দেশে যাচ্ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রদেশের কাটনি রেলওয়ে স্টেশনে তাদের জোর করে নামিয়ে আনা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

দুর্গেশ মারিয়া নামে শিশু কল্যাণ কমিটির এক সদস্যের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) ও রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (আরপিএফ) এই পদক্ষেপ নিয়েছিল। লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়, ওই বাচ্চাদের কাজ করানোর জন্য মহারাষ্ট্রের লাতুরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ওই শিশু-কিশোরদের পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখিও হতে হয়।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, তাদের পরিবারের দাবি, শিশু-কিশোরেরা শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে মাদরাসায় যাচ্ছিল। প্রয়োজনীয় সব নথি তাদের সঙ্গে ছিল। তা-ও পুলিশ তাদের বাধা দেয়।

বেশ কয়েক দিন অপেক্ষার পর অবশ্য এই শিক্ষার্থীরা শেষ পর্যন্ত নিজেদের বাড়িতে ফিরেছে।

ঘটনার কারণ জানতে বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে গিয়েছিল বিবিসি নিউজ হিন্দির টিম। ভুক্তভুগীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথাও বলেছে।

কাটনি স্টেশনে যে ১৬৩ জন নাবালককে নামানো হয় তাদের মধ্যে ১৪৪ জনই বিহারের আরারিয়া জেলার বাসিন্দা।

সেখানে পৌঁছে আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল বছর ৫৫-র কিস্মতির। এই ঘটনার আগে কখনো আরারিয়ার বাইরে না গেলেও সম্প্রতি দুই ছেলে ও এক নাতির জন্য ৯০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মধ্যপ্রদেশের কাটনিতে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি।

তিনি বিবিসিকে বলেছেন, ‘আমার ছেলেরা পড়াশোনার জন্য যাচ্ছিল। ওরা দুই বছর ধরে হাফেজ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এটা ওদের তৃতীয় বছর। কিন্তু আমি মোবাইলে (টেলিফোনে বোঝাতে) জানতে পারি ওদের পুলিশ ধরেছে।’

মাদ্রাসায় পড়াশোনা নিয়ে পরিবারগুলোর বক্তব্য

প্রতি বছর বিহারের মুসলিম সম্প্রদায়ের শিশুরা মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং ওড়িশাসহ বিভিন্ন রাজ্যের মাদ্রাসায় পড়াশোনার জন্য যায়। এদের অধিকাংশই বিহারের সীমান্ত লাগোয়া অঞ্চলের বাসিন্দা।

এই তালিকায় রয়েছে ওই রাজ্যের পূর্ণিয়া, কাটিহার, কিষাণগঞ্জ এবং আরারিয়া জেলা।

বিহারের সংখ্যালঘু কমিশনের মতে, সীমান্তের কিষাণগঞ্জে মুসলিম জনসংখ্যা ৬৭ শতাংশ কাটিহারে ৪২ শতাংশ, আরারিয়াতে ৪১ শতাংশ এবং পূর্ণিয়ায় ৩৭ শতাংশ ।

এদের মধ্যে যারা অন্য রাজ্যে পড়াশোনা করতে যায় তারা বছরে একবার ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসে। ছুটির শেষে আবার মাদ্রাসায় ফিরে যায়।

এবারেও বিহারের আরারিয়া ও সুপৌল জেলা এবং উত্তর প্রদেশের বান্দা জেলা থেকে মোট ১৬৩ অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুকিশোর মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার জন্য যাচ্ছিল। এদের সঙ্গে আটজন মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন।

এই নাবালকরা গত ১১ই এপ্রিল সকাল সাতটার কাছাকাছি পাটনা জংশন থেকে পাটনা-পুণে এক্সপ্রেসে চেপে রওয়ানা দেন।

কিস্মতির ছেলে মোহাম্মদ চুন্নি বিবিসিকে বলেন, ‘দুপুর একটার নাগাদ মুঘলসরাইতে আমাদের থামানো হয়। শিক্ষকরা আমাদের আধার কার্ড এবং গ্রামপ্রধানের একটি চিঠিসহ সমস্ত কাগজপত্র দেখান। তারপর আমাদের মুঘলসরাই থেকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।’

‘কিন্তু এরপর কাটনিতে আমাদের আবার থামানো হয়। সেখানেও আমরা আমাদের সমস্ত কাগজপত্র দেখাই, কিন্তু তারপর আমাদের কোথাও যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। সেখান থেকে আমাদের জাগৃতি (শিশুদের জন্য তৈরি একটি আবাস) নামের দুই কামরার এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তারা আমাদের ঠিকমতো খাবারও দেয়নি।’

জিআরপি এবং আরপিএফ-এর এই পদক্ষেপের ভিত্তি ছিল শিশু কল্যাণ কমিটির সদস্য দুর্গেশ মারিয়ার একটি লিখিত অভিযোগ। বাচ্চাদের বিহার থেকে কাজ করানোর জন্য মহারাষ্ট্রের লাতুরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছিল।

এই প্রসঙ্গে দুর্গেশ মারিয়ার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেছেন, ‘আমি জিআরপির কাছ থেকে জানতে পারি যে বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরে মানব পাচারের ঘটনা নয় এটি, তা জানা গেলেও এই শিশুদের এতদূর নিয়ে যাওয়াকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না।’

‘তাদের কাছে কোনো কাগজপত্র ছিল না এবং পরিবারের সদস্যদের মুখের কথার ভিত্তিতে বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তাই তারা কেন যাচ্ছিল সেটা জানার কোনো উপায় ছিল না।’

কাটনি জিআরপির কর্মকর্তা এলপি কাশ্যপ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই নাবালকদের কাজের জন্য মহারাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে- এই তথ্যের ভিত্তিতেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

তার কথায়, ‘বাচ্চাদের পরিবারের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়ার পর সবাইকে বিহারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।’

সাদ্দাম জারজিস লাতুরের একটি মাদ্রাসার শিক্ষক। ঘটনার দিন তিনি ওই নাবালকদের সঙ্গেই ট্রেনে সওয়ার ছিলেন। তিনি অবশ্য অন্য দাবি করেছেন।

তিনি বলেন, ‘শিশুদের আধার কার্ড আমার কাছেই ছিল। ১০০ বাচ্চার জন্য বাগদহরা পঞ্চায়েতের প্রধান কুলসুম তার লেটার প্যাডে যা লিখে দিয়েছিলেন সেটিও আমার কাছে ছিল।’

সাদ্দাম জারজিস যোগ করেছেন, ‘সেখানে লেখা ছিল- দরিদ্রদের কল্যাণের জন্য সাদ্দাম শিশুদের স্কুলে নিয়ে যান। কিন্তু তারপরেও আমাকে আটকানো হয়। আমার সঙ্গে ছয় বছরের সন্তান ও স্ত্রীও ছিল সেদিন।’

তদন্তে যা জানা গেছে

আরারিয়ার ‘জন জাগরণ শক্তি’ নামক সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরেই কৃষক ও শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে কাজ করছে। সংগঠনটি উদ্যোগী হয়ে আরারিয়া প্রশাসন এবং কাটনির স্থানীয় সংগঠনগুলির মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করে।

তারপর এই ১৬৩ জন শিশুর ‘সোশ্যাল ইনভেস্টিগেশান রিপোর্ট’ তৈরি করা হয়। জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ড (কেয়ার অ্যান্ড প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন) আইন অনুযায়ী শিশু সংক্রান্ত যেকোনো মামলার ক্ষেত্রে সোশ্যাল ইনভেস্টিগেশান রিপোর্ট তৈরি করা বাধ্যতামূলক।

রামিজ রেজা পেশায় একজন আইনজীবী এবং তিনি ‘জন জাগরণ শক্তি সংগঠন’-এর সঙ্গে যুক্ত। এই মামলায় আইন সংক্রান্ত বিষয়গুলি তিনি দেখছেন।

রামিজ রেজা বলেছেন, ‘কাটনিতে মানব পাচারের অভিযোগে একটি এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল। কিন্তু সেই এফআইআর-এ অভিভাবকরা জানিয়েছেন বাচ্চাদের তারা স্বেচ্ছায় পাঠিয়ে ছিলেন। তাদের কাছে ওয়ার্ড বা পঞ্চায়েত স্তর থেকে একটি ভেরিফিকেশন লেটার (যাচাই করার জন্য চিঠি) ছিল এবং তারা টিকিট কেটেই ট্রেনে উঠেছিলেন। যে মাদ্রাসায় বাচ্চারা যাচ্ছিল, সেখানকার অনুমোদনপত্রও সঙ্গে ছিল।’

‘এই সমস্ত নথি কাটনি পুলিশের কাছে পেশ করে সেগুলি কোর্ট যাচাই করে এবং তাদের (গন্তব্যের উদ্দেশ্যে) যেতে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু ভারতে মাদ্রাসা, মাদ্রাসার সঙ্গে যুক্ত আন্দোলন, দাড়ি ও টুপি পরা সংখ্যালঘু, কিংবা অন্য সংখ্যালঘুদের নিশানা করা হচ্ছে।’

জন জাগরণ শক্তি সংগঠন লাতুর ভিত্তিক মাদ্রাসা ‘আশরাফিয়া আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়া’র লেটার হেডে জারি করা একটি নথিও দেখিয়েছে। ওই চিঠিতে লেখা আছে যে পাটনা থেকে আসা এই শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি, মারাঠি এবং অঙ্কও শেখানো হবে।

বিবিসি নিউজ হিন্দি টিম লাতুরের সেই মাদ্রাসার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল যেখানে আরারিয়ার শিশুরা পড়াশোনা করে।

মাদ্রাসা ‘আশরাফিয়া আঞ্জুমান-এ-ইসলামিয়া’র পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, ‘আরারিয়া থেকে বাচ্চারা প্রতি বছর আমাদের মাদ্রাসায় আসে। আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে একজন- সাদ্দাম সাহেব সেখানকারই বাসিন্দা। তিনি বাচ্চাদের নিয়ে আসতেন, কিন্তু তাকে এখন ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই বছর থেকে আমরা শিশুদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণও দেওয়ার কথা ভাবছিলাম।’

এই মাদরাসায় এখন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।

অন্য রাজ্য থেকেও এখানে বাচ্চারা আসে কিনা, জানতে চাইলে আজিজুর রহমান বলেন, ‘অন্য রাজ্য থেকেও বাচ্চারা আসে। এমনকি কর্ণাটক থেকেও আসে। কিন্তু সাদ্দামজির জন্য আরারিয়া থেকেই বেশি সংখ্যায় শিক্ষার্থীরা আসত।’

তিনি দাবি করেন যে, এই মাদ্রাসাটি ১৯১৬ সাল থেকে চলছে এবং শিক্ষা প্রদানের কাজও করে আসছে।

নিশানায় কি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়

নির্দিষ্টভাবে কাউকে নিশানা করা হচ্ছে কি না এই প্রশ্নের জবাবে আরারিয়ার শিশু কল্যাণ কমিটির চেয়ারম্যান দীপক কুমার ভার্মা বিবিসি নিউজ হিন্দিকে বলেছেন, ‘শিশুদের সুরক্ষার দায়িত্ব রাজ্যের। শিশুদের সঙ্গে যিনি ছিলেন তিনি সঠিকভাবে উত্তর দিতে পারেননি। আমরা বিষয়টি জানতে পেরে একটি এফআইআর দায়ের করি এবং ২৫শে এপ্রিল ওই বাচ্চাদের তাদের বাবা-মায়ের কাছে হস্তান্তর করে দেওয়া হয়।’

তিনি দাবি করেছেন, ‘বাচ্চাদের নিরাপদ ভ্রমণের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল এবং এতজন বাচ্চা থাকে তাহলে তাদের সঙ্গে কোনো না কোনো অভিভাবকের থাকাও উচিত ছিল। সিডব্লিউসি (চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি) কাটনি-র রিপোর্ট অনুযায়ী, বাচ্চাদের বয়স ৬ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে ছিল। যদি কারো বয়স ১৪ বছর হয়, তবে সে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও পড়াশোনা করেছে এবং তার কাছে সে সংক্রান্ত কাগজপত্র থাকার কথা।’

এই ঘটনায় বিএনএস-এর ১৪৩(৪) ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা শিশু মানব পাচার সংক্রান্ত ধারা। তবে প্রশাসনের তরফে বাচ্চাদের সুরক্ষা নিয়ে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে তা মানতে নারাজ অভিভাবকেরা।

কাটনিতে সমাজবাদী পার্টির জেলা সভাপতি ড. একে খান অভিযোগ করেছেন কিছু না বুঝেই ওই বাচ্চাদের স্টেশনে (কাটনিতে) নামিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

তিনি অভিযোগ করেন, ‘মুসলিম হওয়ার কারণে হয়রান করা হয়েছে, ট্রেন থেকে নামানো হয়েছে। এটি মানব পাচারের ঘটনা এমন কোনো প্রমাণ ছিল না। তবুও প্রায় ১৩ দিন তাদের রাখা হয় এবং পরিবারের লোকেরা যাওয়ার পরই তাদের ছাড়া হয়।’

ভোপাল-ভিত্তিক সামাজিক সংগঠন সর্বধর্ম সদ্ভাবনা মঞ্চ-এর সেক্রেটারি হাজী মোহাম্মদ ইমরান হারুনও বিষয়টিকে সম্পূর্ণ অন্যায় ও বেআইনি বলে মন্তব্য করেছেন।

হাজী ইমরান হারুন বলেন, ‘এই বাচ্চাদের সকলেই তাদের বাবা-মায়ের সম্মতিতেই পাঠানো হয়েছিল। তাই মানব পাচারের মামলা দায়ের করা অন্যায়।’

আরারিয়ার বাসিন্দা কিশোওয়ার জাহানের ছেলে ইরফান মহারাষ্ট্রের এক মাদরাসায় পড়াশোনা করেন। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার মাদরাসায় যাচ্ছিলেন তিনি। এর আগে একটি স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতেন তিনি।

ছয় সন্তানের মা কিশোওয়ার জাহান তার স্বামীকে হারিয়েছেন।

তিনি বিবিসি নিউজ হিন্দিকে বলেন, ‘পুলিশ যদি আমাদের হয়রান করে তাহলে সেটা পুলিশের দোষ। আমাদের দোষ নয়। আমরা যদি আমাদের সন্তানকে পড়াশোনা না করাই, তাহলে কি তারা করবে? আমরা ক্ষতিপূরণ চাই।’

‘আমার বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর মতো টাকা নেই। ফি হিসাবে স্কুলগুলি পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা নেয়। আমরা কোথা থেকে সেই টাকা পাব? কারো বাচ্চাই সরকারি স্কুলে পড়ে না। ওদের বেসরকারি স্কুলে পাঠানোর সামর্থ্য আমাদের নেই, তাই মাদরাসায় পাঠাচ্ছিলাম।’

এই ঘটনার পর ভয়ে রয়েছেন তার ছেলে ইরফান। তার কথায়, ‘পুলিশ আমাদের আটকে দেয়। তাই এবার থেকে ভেবে দেখতে হবে যে বাইরের মাদ্রাসায় যাব কি না।’

‘যদি ওরা আমাদের বাইরে কোথাও যেতে না দেয়, তাহলে এখানেই একটা স্কুল বা মাদ্রাসা তৈরি করে দিক।’

এই বাসিন্দাদের মতো মোহাম্মদ আসিফের ছেলেও গত চার বছর ধরে মহারাষ্ট্রের এক মাদ্রাসায় পড়তে যাচ্ছিলেন।

তিনি বিবিসি নিউজ হিন্দিকে বলেছেন, ‘বাচ্চাদের অবৈধভাবে আটকানো হয়েছিল, কারণ তারা মুসলিম। বাচ্চারা যদি পড়াশোনা করতে না যায়, তাহলে তারা বাড়িতেই থাকবে এবং তাদের জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। এর ক্ষতিপূরণ কে দেবে?’

এই সমস্ত ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের কোনো বিধান আছে কি? বিবিসির এই প্রশ্নের জবাবে আরারিয়া শিশু কল্যাণ কমিটির চেয়ারম্যান দীপক কুমার ভার্মা বলেন, ‘জেজে (জুভেনাইল জাস্টিস) আইনে ক্ষতিপূরণের কোনো বিধান নেই।’

তবে শুধুমাত্র মধ্যপ্রদেশেই নয়, ওড়িশার কটকেও একই ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ। কটকে ৫৯ জন নাবালককেও একইভাবে ট্রেন থেকে নামানো হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।

ওড়িশায় কী হয়েছিল?

আরারিয়া শিশু কল্যাণ কমিটির দীপক কুমার ভার্মা বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন যে, বুধবার পর্যন্ত কটকে আটকে ছিল ৫৯ জন নাবালক এবং তখনো পর্যন্ত তারা নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারেনি।

তবে, তারা দু’-এক দিনের মধ্যেই নিজেদের বাড়িতে ফিরে যেতে পারবেন বলে আশাবাদী তিনি।

রামিজ রেজা এই পুরো মামলার সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত। তার কথায়, ‘প্রায় এক মাস হয়ে গেছে, কিন্তু ওই বাচ্চারা এখনো ফিরতে পারেনি।’

এই ৫৯ জন নাবালক উড়িষ্যার একটি মাদরাসায় যাচ্ছিল। আরারিয়ার রাজোখার বাজারের কাছেই তাদের বাড়ি। গত ১৪ই এপ্রিল থেকে ওড়িশায় আটকা পড়ে আছেন তারা।

সাঁঝাউলি গ্রামের তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাবরিন স্নাতক। বিএ পাশ করেছেন তিনি। তার স্বামী একটি ছোট মুদির দোকান চালান। সাবরিনের সন্তান গ্রামেরই একটি বেসরকারি স্কুলে পড়ত।

সাবরিন বলেন, ‘আমার বাচ্চা স্কুলে পড়ত। ধর্মীয় শিক্ষার জন্য ওকে একটি মাদরাসায় পাঠিয়েছিলাম। ওকে কটক স্টেশন থেকে ধরা হয়েছে। চাইল্ড কেয়ার ক্যাম্পে রাখা হয়েছে।’

‘আরারিয়ার বাচ্চাদের উপর কেন এমন নির্যাতন করা হচ্ছে? বাচ্চার কাছে আধার কার্ড, পঞ্চায়েত প্রধানের লেখা চিঠি এবং স্কুলের টিসি (স্থানান্তর সনদ) আছে। আধার থেকে তো ওর পুরো তথ্য পাওয়া যাবে।’

ওই ওয়ার্ডেরই বাসিন্দা তবরেজ। তিনি পেশায় ট্রাক্টর চালক। তার ছেলেও ওড়িশার এক মাদরাসায় পড়তে গিয়েছিল।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘গতবার যখন গিয়েছিল, তখন সেখান থেকে ভালভাবে পড়াশোনা করে ফিরেছিল। এবারও ছেলেকে পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু ওকে আটকে দিল। আমরা রিজার্ভেশন (ট্রেনে) করেই বাচ্চাকে পাঠিয়েছিলাম। সরকার যদি এখানে একটি ভালো মাদরাসা খোলে, তাহলে বাচ্চা বাইরে যাবে কেন?’

‘কারো কোনো চাপ ছাড়াই আমরা আমাদের সন্তানদের সেখানে পাঠাই।’

কেন অন্য রাজ্যের মাদ্রাসায় বাচ্চারা

এখন প্রশ্ন স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে যে বাচ্চারা কেন অন্য রাজ্যের মাদরাসায় যাচ্ছে?

স্থানীয় মাদরাসার পরিবর্তে অন্য রাজ্যের মাদ্রাসাকে বেছে নেওয়ার কারণ হিসাবে একাধিক বিষয় উঠে এসেছে।

দারিদ্র্য, স্থানীয় মাদ্রাসাগুলিতে আবাসিক সুবিধার অভাব এবং বাচ্চাদের মধ্যে শৃঙ্খলা আনার মতো একাধিক ভাবনাই অভিভাবকদের মধ্যে কাজ করে বলে জানা গিয়েছে।

সীমান্ত লাগোয়া অঞ্চলগুলিই বিহারের সবচেয়ে অনগ্রসর এলাকা। সীমাঞ্চলের তিনটি জেলা-পূর্ণিয়া, কাটিহার এবং আরারিয়া বিহারের সেই ১৩টি জেলার মধ্যে রয়েছে, যেগুলিকে নীতি আয়োগ ‘আকাঙ্ক্ষামূলক জেলা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-২৬ অনুসারে, রাজ্যের ৩৮টি জেলার মধ্যে মাথাপিছু আয়ের নিরিখে আরারিয়া ৩৭তম, কিষাণগঞ্জ ২৮তম, কাটিহার ২৪তম এবং পূর্ণিয়া ২১তম স্থানে রয়েছে। শিক্ষার দিক থেকেও আরারিয়া, পূর্ণিয়া এবং কাটিহার বিহারের পাঁচটি সবচেয়ে অনগ্রসর জেলার তালিকায় আছে।

পেশায় শ্রমিক জালালও তার ছেলেকে মহারাষ্ট্রের একটি মাদরাসায় পাঠিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা শ্রমজীবী মানুষ। ফি (স্কুলের) দেওয়ার মতো টাকা আমাদের নেই। আমরা একটু আধটু পড়ে পাঠাই যাতে বাচ্চা শিক্ষা পায়, নিজের গ্রামের নাম লিখতে পারে। আমরা কোনো চাপ ছাড়াই বাচ্চাকে মৌলানার সঙ্গে পাঠিয়ে দিই।’

মোহাম্মদ আসিফ নামে আরেক বাসিন্দা বাচ্চাদের মধ্যে শৃঙ্খলা আনার বিষয়ও উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘বাচ্চারা বারবার মাদরাসা থেকে পালায়। তারা দশ দিন বা এক মাস পড়াশোনা করে আবার পালিয়ে যায়। এমন হলে আমরা গ্রামের মুফতির সঙ্গে যোগাযোগ করে বাচ্চাদের মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দিই।’

বিহারের মাদরাসা

সাধারণত ঈদের পর এই শিক্ষকরা যে বাচ্চারা মাদরাসায় পড়াশোনা করতে ইচ্ছুক এমন একদল পড়ুয়াদের নিয়ে পাড়ি দেন। যেহেতু এই বাচ্চাদের বাবা-মা আর্থিকভাবে অসচ্ছল, তাই তারা প্রায়শই সন্তানদের এই শিক্ষকদের সঙ্গে অন্য রাজ্যের মাদরাসায় ভর্তির জন্য পাঠিয়ে দেন।

এই মাদরাসাগুলোতে বিনামূল্যে শিক্ষা ও আবাসিক সুবিধা দেওয়া হয়। শুধুমাত্র বাচ্চাদের ট্রেনের টিকিটের খরচ বহন করতে হয় অভিভাবকদের।

বিহার রাজ্য মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, রাজ্যে তিন হাজারেরও বেশি মাদরাসা রয়েছে, যেখানে সাত লক্ষেরও বেশি পড়ুয়া ভর্তি হয়। এই মাদরাসাগুলোতেও বিনামূল্যে পড়ানো হয়।

তাহলে কেন বিহার থেকে শিক্ষার্থীরা অন্য রাজ্যের মাদরাসায় যায়?

বিহারে শিশুশ্রম রুখতে ‘স্টেট চাইল্ড লেবার কমিশন’-এর রাজ্য সাবেক সদস্য এবং মুসলিম শিশুদের শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন মুখতারুল হক।

তিনি বলেছেন, ‘বিহারে তিনভাবে মাদরাসা চলছে। প্রথম হলো মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে থাকা মাদ্রাসাগুলি, যা আবাসিক নয়। দ্বিতীয় হলো, ডে স্কুলের মতো পরিচালিত স্বাধীন মাদরাসা, যাকে মাদ্রাসা মক্তবও বলা হয়।’

‘তৃতীয় হলো স্বাধীনভাবে পরিচালিত সেইসব মাদরাসা যেখানে হাফিজ, আলিম, ফাজিল, মৌলানা, হাদিস পড়ানো হয়। শুধুমাত্র তৃতীয় ক্যাটাগরির অন্তর্গত মাদরাসাগুলোর কয়েকটিতেই আবাসিক সুবিধা পাওয়া যায়।’

সাধারণত আর্থিক দিক থেকে স্বচ্ছল নন এমন অভিভাবকেরা নিজেদের সন্তানদের সেই মাদরাসাতেই পাঠাতে চান যেখানে আবাসিক সুবিধা রয়েছে। এই কারণেই তারা বিহার থেকে বহু কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মাদরাসায় নিজেদের সন্তানদের পাঠাতে দ্বিধা বোধ করেন না।

আরারিয়ার ইমারাত-এ-শরিয়াহ-এর প্রতিনিধি আতিকুল্লাহ রহমানীও বলেন, ‘মাদরাসাগুলোতে জায়গা সীমিত। ধরুন, একটি গ্রামে ৩০০ জন শিশু আছে এবং মাদরাসায় আবাসিক পড়ুয়াদের জন্য ২০০টি আসন রয়েছে। এই অবস্থায় তাদের এক ঘরে তো রাখা যায় না।’

‘তাই অভিভাবকরাও অন্যান্য মাদরাসাখোঁজেন। যখন বাচ্চাদের জন্য আবাসিক সুবিধা পাওয়া যায় না, তখন তাদের বাইরে পাঠিয়ে দিতে হয়। অভিভাবকরা দরিদ্র, এই পরিস্থিতিতে তারা কী করবেন?’

সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে আরারিয়ায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সমাজকর্মী আফাক আনোয়ার বলেন, ‘এটি ভারতের সংবিধানের পরিপন্থি। এটি সম্পূর্ণভাবে ভারতের সংবিধানের পরিপন্থি।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন