পার্সেলে ‘উপহারে’ বিপর্যস্ত ইনফ্লুয়েন্সার

পার্সেলে ‘উপহারে’ বিপর্যস্ত ইনফ্লুয়েন্সার

দক্ষিণ ভারতের এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারের বাড়িতে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি পর্যন্ত পার্সেল পৌঁছাচ্ছে। আইফোন, টেলিভিশন, ফ্রিজ থেকে শুরু করে ২০ কেজি বিরিয়ানি—কী নেই সেই তালিকায়! কিন্তু এসব উপহারই এখন তার পরিবারের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ের বাসিন্দা শান্মুগানাথন ভীরামণি ইনস্টাগ্রামে নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ করেন। তার অনুসারীর সংখ্যা লাখের বেশি। সম্প্রতি তার নামে একের পর এক পার্সেল পাঠানো হচ্ছে। এসব পার্সেলের বেশির ভাগই ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ পদ্ধতিতে পাঠানো। অর্থাৎ, পার্সেল গ্রহণ করতে হলে পণ্যের দাম পরিশোধ করতে হবে। আর অর্ডার না করা এসব পণ্যের টাকা দিতে রাজি না হলে পার্সেল ফেরত পাঠাতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ভীরামণির স্ত্রী সুমঙ্গলী জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছে যে বাড়িওয়ালা ও প্রতিবেশীরাও বিরক্ত। প্রতিদিন ডেলিভারির জন্য লোকজন দরজার ঘণ্টা বাজাচ্ছেন। এতে পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি পার্সেল পৌঁছে দেওয়া কর্মীদের বোঝানোও কঠিন হয়ে পড়েছে যে তারা কোনো পণ্য অর্ডার করেননি।

সুমঙ্গলীর ভাষ্য, তার স্বামী এখনো মাদুরাইয়ে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন। পরিবারের আয়ের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে নিজের নামে আর কোনো পার্সেল না পাঠানোর অনুরোধ জানান ভীরামণি।

যেভাবে শুরু বিপত্তি

গত মাসে কেরালা ভ্রমণের জন্য অনুসারীদের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন ভীরামণি। ওই ভিডিওতে নিজের ফোন নম্বরও দিয়েছিলেন তিনি। পরে আরেকটি ভিডিওতে দাবি করেন, এভাবে তিনি ছয় হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছিলেন।

এরপর এক অনুসারী তাকে উপহার পাঠানোর আগ্রহ দেখিয়ে বাড়ির ঠিকানা চান। ভীরামণি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ঠিকানা প্রকাশ করেন। তার স্ত্রী জানান, এরপর থেকেই বাড়িতে নানা ধরনের পণ্য আসতে শুরু করে।

এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে আইফোন ১৭, টেলিভিশন, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, আসবাবপত্র, পোশাক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। এমনকি কেউ ক্যাশ অন ডেলিভারিতে ২০ কেজি বিরিয়ানিও পাঠিয়েছেন।

ভীরামণি ভিডিওতে বলেন, একের পর এক পার্সেল আসায় তিনি বিপাকে পড়েছেন। ডেলিভারি কর্মীদের বোঝানোও কঠিন হয়ে উঠেছে। তার নামে যেন আর কোনো পণ্য পাঠানো না হয়, সে জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

আরেকটি ভিডিওতে তিনি অভিযোগ করেন, কেউ তার ফোন নম্বর কিডনি দানের জন্যও তালিকাভুক্ত করে দিয়েছেন। পরিস্থিতির কারণে অন্যত্র চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

পড়ে আছে শতাধিক পার্সেল

ভীরামণির অনুরোধের পরও পার্সেল আসা বন্ধ হয়নি। সুমঙ্গলী জানিয়েছেন, তার স্বামী এখনো বাড়ি ফেরেননি। ডেলিভারি কর্মীরা তার কাছে পার্সেল গ্রহণের জন্য এককালীন পাসওয়ার্ড বা ওটিপি চান। কিন্তু কে পণ্যগুলো পাঠাচ্ছেন, তা তারাও জানেন না।

কেউ তাদের কথা বুঝলেও অনেকে রেগে গিয়ে তর্কে জড়ান। এ কারণে বাড়ির বাইরে যেতেও ভয় পাচ্ছেন সুমঙ্গলী। তিনি জানান, তার স্বামী আগে মাদুরাইয়ের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। বর্তমানে তিনি বেকার। পরিবারের পরিকল্পনা, শিগগিরই ওই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া।

একটি বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের কর্মী অরুণ (ছদ্মনাম) জানিয়েছেন, ভীরামণির নামে ১০০টিরও বেশি পার্সেল এখনো সরবরাহ করা হয়নি। তার ভাষ্য, ক্যাশ অন ডেলিভারির পণ্য ফেরত গেলে কর্মীদের কাজের ওপর প্রভাব পড়ে। এতে সময়, শ্রম ও গাড়ির জ্বালানি নষ্ট হয়। একই ঠিকানায় প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি পণ্য পৌঁছে দিতে হলে অনেক কর্মীই সেখানে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন।

ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ঝুঁকি

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী বালু বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি বাড়াতে গিয়ে অনেকে না বুঝেই ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করেন। অথচ অনলাইনে সামান্য তথ্য প্রকাশও কখনো কখনো বড় ধরনের অপরাধের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তার মতে, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং তা ফাঁস হওয়ার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতার অভাবেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। কারও নামে বারবার বিপুল মূল্যের পণ্য ক্যাশ অন ডেলিভারিতে পাঠানো মানসিক হয়রানির শামিল। এ বিষয়ে পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা যেতে পারে। এতে পণ্য পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে, যদিও এ ধরনের অর্ডার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হতে পারে।

অনলাইনে তথ্য যাচাইয়ের কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞ মুরলিকৃষ্ণন চিন্নাদুরাইও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়ির ঠিকানা ও ফোন নম্বর প্রকাশ করলে আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব তথ্য ব্যবহার করে জাল পরিচয়পত্র তৈরির মতো অপরাধও ঘটতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, অনলাইনে কার সঙ্গে কী তথ্য ভাগ করা হচ্ছে এবং সেই তথ্য কী কাজে ব্যবহৃত হতে পারে, তা বিবেচনা করা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করে সচেতনভাবে তথ্য শেয়ার করাই নিরাপদ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন