মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু পদত্যাগের ঘটনাটি শুক্রবার বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। রয়টার্স, বিবিসি, আলজাজিরা, ব্লুমবার্গ, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, মানিকন্ট্রোল এবং ডব্লিউআইওএন-এর মতো প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছে।
প্রতিবেদনগুলোতে মূলত স্থান পেয়েছে—মেয়াদ পূর্তির আগেই তার সরে দাঁড়ানো, শারীরিক অসুস্থতার খবর এবং ভারতে পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড।
আলজাজিরার তাদের শিরেোনামে বলেছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ। প্রতিবেদনে, সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় নিজের অটোনমিক নিউরোপ্যাথিরোগ ধরা পড়েছে বলে জানিয়েছেন মো. শাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব প্রকাশিত এক বিবৃতিতে, ওই রোগে আক্রান্ত থাকার কারণে তিনি রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করছেন বলে জানান ।
বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধান অনুযায়ী, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে দেশে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে বলে জানানেো হয়।
রয়টার্স শিরোনাম করেছে স্বাস্থ্যগত কারণে ৭৬ বছর বয়সী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ২০২৩ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব নেওয়া রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। সংস্থাটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশে অন্তর্বর্তী প্রশাসন হয়ে নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদটি প্রধানত অলঙ্কারিক এবং নির্বাহী ক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভা।
বিবিসি ‘শেখ হাসিনা সহযোগী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ’ শিরোনাম দিয়ে সংবাদ করেছে। প্রতিবেদনে এসেছে, হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা জাহির করার পর থেকেই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে সরানোর তাগিদ তৈরি হয়। বিবিসি বাংলার বরাতে বলা হয়, ক্ষমতার মসনদে থাকা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের পক্ষ থেকেই তাঁকে পদ ছাড়তে জোরালো চাপ দেওয়া হচ্ছিল। শারীরিক জটিলতাকে কারণ হিসেবে দেখানো হলেও এর নেপথ্যে মূল ভূমিকা রেখেছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনে প্রায় ১৪০০ প্রাণহানির দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনার কথা জানান, যা রাষ্ট্রপতির পদকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট শিরোনাম করেছে, নির্বাসন থেকে ফেরার আগে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ, কোণঠাসা হাসিনা। বঙ্গভবনের প্রেস সচিব সারওয়ার আলমের বক্তব্য তুলে ধরে জানায়, মূলত শারীরিক অসুস্থতা ও বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তা থেকেই রাষ্ট্রপতির এই প্রস্থান। তবে তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি দাবি করে, শেখ হাসিনার ফেরা নিয়ে আলোচনা শুরুর পরপরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে সরে দাঁড়াতে বলা হয়। এর ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাঁর শেষ উচ্চপর্যায়ের সাংবিধানিক বিশ্বস্ততাকেও হারালেন।
ভারতীয় গণমাধ্যম মানিকন্ট্রোল তাদের বিশ্লেষণে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—শেখ হাসিনার সাথে একটি ফোনালাপই কি রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের রাজনীতির ইতি টেনে দিল? তাদের মতে, শেখ হাসিনার সাথে গোপন যোগাযোগ ও সাম্প্রতিক কথোপকথন প্রকাশ পাওয়াতেই তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি তরান্বিত হয়। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে কঠোর আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রমাণের বার্তা দিতেই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ব্লুমবার্গ ও ডব্লিউআইওএন তুলে ধরেছে যে, ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও ৭৬ বছর বয়সী এই রাষ্ট্রপতির অসময়ে বিদায় নেওয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় এনে দিল। ২০২৪ সালের অভ্যুথান-পরবর্তী সময়ে তিনি ছিলেন পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার সর্বশেষ ধারক।
সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের সংবিধানের নিয়ম উল্লেখ করে জানায়, স্পিকারের কাছে লিখিত পত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কার্যকর হয়। থাইল্যান্ডে চিকিৎসা শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ দেশে ফিরলে তাঁর নিকট পদত্যাগপত্রটি তুলে দেওয়া হয়। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, পদটি খালি হওয়ার ৯০ দিনের ভেতরে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপ্রধান বেছে নিতে হবে। বর্তমানে সংসদে বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তাদের মনোনীত ব্যক্তিই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন।
এমএমআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


