রাশিয়ায় কেন হাজারো সেনা ও ড্রোন অপারেটর পাঠাচ্ছে উত্তর কোরিয়া

রাশিয়ায় কেন হাজারো সেনা ও ড্রোন অপারেটর পাঠাচ্ছে উত্তর কোরিয়া

রাশিয়ার সামরিক অভিযানে সহায়তা আরো বাড়াতে নতুন করে সেনা পাঠাচ্ছে উত্তর কোরিয়া। এসব সেনার মধ্যে ড্রোন পরিচালনায় দক্ষ প্রায় ৪০০ সদস্য রয়েছেন, যারা ইউক্রেনের ভেতরে নজরদারি ও হামলায় ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা রাখেন বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা।

বিজ্ঞাপন

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের উপপ্রধান মেজর জেনারেল ভাদিম স্কিবিতস্কির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে। তার দাবি, বর্তমানে রাশিয়ায় প্রায় ৮ হাজার ৫০০ উত্তর কোরীয় সেনা অবস্থান করছেন। তাদের বেশির ভাগই রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। এ বাহিনীতে প্রায় এক হাজার প্রকৌশলী ও মাইন অপসারণকারী সদস্যও রয়েছেন।

স্কিবিতস্কি বলেন, উত্তর কোরীয় সেনাদের নতুন এই দলে থাকা প্রায় ৪০০ ড্রোন অপারেটরের অনেকেই আগের মোতায়েনের সময় কিংবা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ড্রোন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাদের ড্রোন ইউক্রেনের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু পর্যবেক্ষণ ও হামলায় ব্যবহার করা হতে পারে।

আরো ৫০ হাজার সেনা চাওয়ার সম্ভাবনা

ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের ধারণা, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগামী সেপ্টেম্বরে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকে আরো ৫০ হাজার সেনা চাইতে পারেন। তবে কিমের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং এমন দাবিকে ‘ভিত্তিহীন ও মনগড়া’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

স্কিবিতস্কির মতে, উত্তর কোরীয় সেনাদের ইউক্রেনের ভূখণ্ডে সরাসরি যুদ্ধ করার সম্ভাবনা কম। বরং তাদের রাশিয়ার পেছনের সারির অবস্থানগুলো শক্তিশালী করতে ব্যবহার করা হতে পারে। এতে রুশ সেনাদের একটি অংশ ইউক্রেনের সম্মুখভাগে আক্রমণ পরিচালনার জন্য মুক্ত হয়ে যাবে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা রাশিয়ায় মোতায়েন বা পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেছেন বলেও দাবি করেছেন তিনি।

২০২৪ সালে শুরু হয় উত্তর কোরিয়ার সেনা মোতায়েন

ইউক্রেনের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে উত্তর কোরিয়ার প্রথম বড় সেনা মোতায়েন শুরু হয় ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর রাশিয়ার ভূখণ্ডে প্রবেশ ঠেকাতে ওই সেনাদের ব্যবহার করা হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ১০ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হতাহত হন। ইউক্রেনীয় পক্ষের দাবি, রুশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে উত্তর কোরীয় সেনারা ব্যাপকভাবে সম্মুখ আক্রমণ ও উচ্চঝুঁকির কৌশল ব্যবহার করেছিল।

rushia

উত্তর কোরিয়া প্রথমদিকে সেনা পাঠানোর বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি। তবে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে দেশটি প্রথমবারের মতো ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিজেদের সেনাদের অংশগ্রহণের কথা নিশ্চিত করে।

যুদ্ধে আহত উত্তর কোরীয় সেনারা দেশে ফিরে গিয়ে ড্রোন যুদ্ধসহ আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা নিজেদের সহকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন বলেও দাবি করেছেন স্কিবিতস্কি।

ক্ষেপণাস্ত্র সহায়তাও বাড়ছে

শুধু জনবল নয়, রাশিয়াকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েও সহায়তা করছে উত্তর কোরিয়া—এমন দাবি করেছে ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থা। স্কিবিতস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্টের আগে উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে অন্তত ১৫০টি কেনএন-২৩ ও কেনএন-২৪ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছিল। এর বাইরে আরো ১২০টি ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

এসব ক্ষেপণাস্ত্রের কয়েকটি ইউক্রেনের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবহার করা হয়েছে। ইউক্রেনের দাবি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার মতো সক্ষমতা তাদের হাতে সীমিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও চাপের মুখে রয়েছে।

স্কিবিতস্কি আরো দাবি করেন, উত্তর কোরিয়া থেকে সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্রের আধুনিক সংস্করণের পাল্লা প্রায় ৮০০ কিলোমিটার। তবে এগুলো প্রায়ই লক্ষ্যবস্তু থেকে ১৫ থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে গিয়ে আঘাত হানে। ইউক্রেনে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহারকে উত্তর কোরিয়া নিজেদের লক্ষ্যভেদ ও বিস্ফোরক বহনের সক্ষমতা উন্নত করার সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগাচ্ছে বলে তার দাবি।

রাশিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনায় উত্তর কোরীয় সদস্য

ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের দাবি, রাশিয়ার ভোরোনেজ অঞ্চলে প্রায় ৯০ জন উত্তর কোরীয় কর্মী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কার্যক্রমে সহায়তা করছেন। একই সঙ্গে ভোরোনেজ এলাকার বাল্টিমোর বিমানঘাঁটিতে উত্তর কোরিয়া থেকে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্রবাহী অন্তত ১০টি বড় কার্গো বিমান অবতরণ করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

স্কিবিতস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুলাই ডিনিপ্রো অঞ্চলের রাদুশনে এলাকায় একটি হামলায় ব্যবহৃত দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উত্তর কোরিয়ার তৈরি বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ওই হামলায় একই পরিবারের অন্তত চার শিশু নিহত হয় বলে দাবি করেছে ইউক্রেন।

বিনিময়ে রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র চাইছে পিয়ংইয়ং

উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে জনবল ও সামরিক সরঞ্জাম দেওয়ার বিনিময়ে উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি চাইছে বলেও জানিয়েছেন স্কিবিতস্কি। তার দাবি, পিয়ংইয়ং রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়েছে। এরই মধ্যে উত্তর কোরিয়া একটি প্যান্টসির-১ ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা পেয়েছে।

রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতা গত দুই বছরে দ্রুত গভীর হয়েছে। দুই দেশ প্রায় দুই বছর আগে ন্যাটোর মতো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ফলে রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক সহায়তা এখন শুধু সেনা পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি বিনিময়ের দিকেও বিস্তৃত হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমানোর ঘোষণা দেওয়ার পর উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সূত্র: সিএনএন

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন