সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য ২০২৬ সাল ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট, অর্থনৈতিক চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়েও প্রত্যাশিত সুবিধা না পাওয়ায় চাপে পড়েছে রিয়াদ। একই সঙ্গে দেশটির উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনাও বাধার মুখে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধের প্রভাব সৌদি আরবের সংকট আরো বাড়িয়েছে। দেশটির অর্থনৈতিক ঘাটতি, বিনিয়োগ প্রকল্পে কাটছাঁট এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে যুবরাজের ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
হুথিদের হামলায় নিরাপত্তা সংকট, বাতিল বিনিয়োগ সম্মেলন
সৌদি আরবের সংকটের বড় কারণ হয়ে উঠেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এসব হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ অক্টোবর দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক বিনিয়োগ সম্মেলন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ স্থগিত করা হয়। ‘মরুভূমির দাভোস’ নামে পরিচিত এই সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
রিয়াদ ও সৌদি আরবের অন্যান্য শহরে হুথিদের হামলায় প্রায় ২০ জন নিহত হয়েছেন এবং রাজধানীর বিমানবন্দরও বন্ধ রাখতে হয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক অতিথিদের নিয়ে সম্মেলন আয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ পরিস্থিতি সৌদি আরবকে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে: বিপুল অর্থ ব্যয় করে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরও দেশটি কেন প্রতিপক্ষের হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে?
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির স্বপ্নেও ধাক্কা
সৌদি আরবের অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আনার পরিকল্পনা যুবরাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু আঞ্চলিক সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সেই পরিকল্পনাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
সেমাফরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই সৌদি আরবের বাজেট ঘাটতি বাড়ছিল এবং বড় বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো ছোট করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় তেলের রাজস্বের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে এবং সরকারি ঋণও ঊর্ধ্বমুখী।
বিশেষ করে নিওম নামের বিশাল ভবিষ্যৎ নগর প্রকল্পে ব্যয় ও চুক্তি বাতিলের বিষয়টি সৌদি আরবের উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। ২০৩৪ সালের পুরুষদের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন ঘিরে কিছু পরিকল্পনাও ছোট করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তেলের বাজারে সাময়িক সুবিধা, দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি
হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হামলা এবং বিঘ্নের কারণে তেলের দাম বেড়েছে। এতে কম পরিমাণে তেল রপ্তানি করেও সৌদি আরব কিছুটা বাড়তি আয় পেতে পারে। তবে এই সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে নির্ভরযোগ্যভাবে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বড় আমদানিকারক দেশগুলো বিকল্প উৎস খুঁজবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে তারা। সংঘাত শেষ হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বাজারের অংশীদারত্ব ধরে রাখতে সৌদি আরবকে নতুন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে।
ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থেকেও প্রত্যাশিত সুবিধা মেলেনি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করাও মোহাম্মদ বিন সালমানের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েও ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণে সৌদি আরব প্রত্যাশিত প্রভাব অর্জন করতে পারেনি বলে সেমাফরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে মধ্যস্থতা করেছিল চীন। কিন্তু বর্তমান সংকটে বেইজিং সৌদি আরবকে সহায়তা করতে অনিচ্ছুক, নাকি অক্ষম—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিপুল সামরিক ব্যয়ের পরও হুথিদের হামলা প্রতিরোধে সৌদি বাহিনীর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে।
‘ভিশন ২০৩০’ কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব?
মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’-এর লক্ষ্য হলো অর্থনীতিতে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো, নতুন শিল্প গড়ে তোলা এবং সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা।
কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকেরা দেশটিতে যেতে অনীহা দেখাতে পারেন। প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা একদিকে যেমন বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে তেলবহির্ভূত খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগানও কঠিন করে তুলছে।
সব মিলিয়ে, হুথিদের হামলা, আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রভাব, অর্থনৈতিক চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা—এই চারটি চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে সৌদি যুবরাজকে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে আমূল বদলে দেওয়ার যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা তিনি নিয়েছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য আগের চেয়ে অনেক দূরের বলে মনে হচ্ছে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


