ভবিষ্যতের কৌশলগত শক্তির ভিত্তি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হাতিয়ার

ভবিষ্যতের কৌশলগত শক্তির ভিত্তি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হাতিয়ার

একুশ শতকের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নতুন ধরনের কৌশলগত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, গ্রাফাইট, বিরল মৃত্তিকা, তামাসহ বিভিন্ন খনিজ এখন বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ফলে এসব সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতের বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গবেষক অনুভা মিশ্র ৩১ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেলস: দ্য নিউ অয়েল অভ দ্য টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি?’ শীর্ষক এক নিবন্ধে লিখেছেন, বিশ শতকে তেল যেমন শিল্প, পরিবহন ও সামরিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি ছিল; একুশ শতকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলো তেমন ভূমিকা নিতে পারে। তবে এসব খনিজ সরাসরি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। এগুলোর বিশেষ ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারণে আধুনিক প্রযুক্তিতে এগুলোর গুরুত্ব বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

লিথিয়াম ও গ্রাফাইট ব্যাটারি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র ও উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতার চুম্বক তৈরিতে বিরল মৃত্তিকা প্রয়োজন। ব্যাটারির বিভিন্ন প্রযুক্তিতে কোবাল্ট ও নিকেল ব্যবহৃত হয়। বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা, মোটর, ডেটা সেন্টার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য তামা অপরিহার্য। গ্যালিয়াম ও জার্মেনিয়ামের মতো খনিজ সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত ইলেকট্রনিকসেও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বজুড়ে পরিবহন ব্যবস্থা বিদ্যুতায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব খনিজের চাহিদাও দ্রুত বাড়বে । ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি খনিজ সম্পদের ওপর নতুন ধরনের নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে খনিজ নিরাপত্তাকেও যুক্ত করে দেখতে হবে।

তবে শুধু কোনো দেশে খনিজের মজুত থাকলেই সেই দেশ কৌশলগতভাবে শক্তিশালী হয়ে যায় না। খনিজ উত্তোলনের পর তা প্রক্রিয়াজাতকরণ, পৃথকীকরণ, পরিশোধন, যন্ত্রাংশ তৈরি এবং পুনর্ব্যবহারের সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশ কাঁচামালের মালিক হলেও যদি পরিশোধন বা প্রযুক্তির জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে তার সরবরাহ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকতে পারে।

এ ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। গত কয়েক দশকে চীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের খনি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিশোধন ও উৎপাদন সক্ষমতায় বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। বিশেষ করে বিরল মৃত্তিকা প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যাটারি উপকরণের ক্ষেত্রে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। নির্বাচিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজের রপ্তানিতে সাম্প্রতিক বিধিনিষেধও দেখিয়েছে, কীভাবে সরবরাহব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ভারতের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন, টেলিযোগাযোগ ও উন্নত শিল্পে ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে আগামী কয়েক দশকে বিপুল পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ খনিজের প্রয়োজন হবে। ফলে তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আবার যদি লিথিয়াম, কোবাল্ট, বিরল মৃত্তিকা বা প্রক্রিয়াজাত ব্যাটারি উপকরণের জন্য অন্য দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে হয়, তাহলে কৌশলগত নির্ভরতা পুরোপুরি কমবে না।

ভারত ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের তালিকা তৈরি, অনুসন্ধান বাড়ানো, নির্বাচিত খনিজের বাণিজ্যিক খনন উন্মুক্ত করা এবং বিদেশ থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ মিশন গঠনও এই কৌশলের অংশ। তবে শুধু খনিজ উত্তোলন করলেই হবে না; অনুসন্ধান প্রযুক্তি, পরিশোধন, উন্নত উপকরণ, ব্যাটারি উৎপাদন, স্থায়ী চুম্বক, পুনর্ব্যবহার ও গবেষণায়ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একক দেশের পক্ষেই প্রয়োজনীয় সব খনিজ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ খনিজসমৃদ্ধ দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং ইন্দো-প্যাসিফিকসহ বিভিন্ন অঞ্চলের নির্ভরযোগ্য অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগকে ভবিষ্যতে ‘মিনারেল ডিপ্লোমেসি’ বা খনিজ কূটনীতির অংশ হিসেবে দেখা হতে পারে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করা নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে। খনন কার্যক্রম বন, পানি, ভূমি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পরিবেশ সুরক্ষা, স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে খনিজ নীতি গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।

পুনর্ব্যবহারও ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে। ব্যাটারি, ইলেকট্রনিক যন্ত্র, বৈদ্যুতিক মোটরসহ বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহৃত খনিজকে বর্জ্য হিসেবে না দেখে ‘শহুরে সম্পদ’ হিসেবে পুনরুদ্ধার করা গেলে নতুন খনির ওপর চাপ কমবে এবং সরবরাহ নিরাপত্তা বাড়বে। একই সঙ্গে পুনর্ব্যবহারভিত্তিক নতুন শিল্পও গড়ে উঠতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশও সরবরাহব্যবস্থা বহুমুখীকরণ, নিজস্ব প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এর ফলে সরবরাহব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হতে পারে। তবে একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী জোট ও বাণিজ্যিক বাধা তৈরির ঝুঁকিও রয়েছে।

তেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজও ভবিষ্যতে পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে কোন খনিজ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে, তা প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে বদলাতেও পারে। তাই শুধু নতুন খনি খোঁজার পরিবর্তে বিকল্প উপকরণ, নতুন ব্যাটারি প্রযুক্তি, দক্ষতার সঙ্গে খনিজ ব্যবহার এবং পুনর্ব্যবহারে গবেষণার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

ভবিষ্যতের শিল্প ও প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ শুধু তেল বা গ্যাসের মজুতের ওপর নির্ভর করবে না। গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহব্যবস্থা, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি এবং এসব খনিজ থেকে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির সক্ষমতাও বৈশ্বিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু খনিজের মজুত নিশ্চিত করা নয়; বরং এর সঙ্গে প্রযুক্তি, শিল্প, কর্মসংস্থান ও কৌশলগত স্বনির্ভরতাও অর্জন করা।

সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন