আসন্ন বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজকে সামনে রেখে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে রাশিয়া। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সতর্ক থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের ফাইনান্সিয়াল টাইমস এবং রাশিয়ার ইম্পরট্যান্ট স্টোরিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফাঁস হওয়া একটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা নথিতে দাবি করা হয়েছে, গুপ্তহত্যা বা অভ্যুত্থানের ভয়ে পুতিন প্রায়ই বাঙ্কারে নিরাপদে আশ্রয়ে সময় কাটাচ্ছেন।
গোয়েন্দা তথ্যমতে, পুতিনের চারপাশের নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে; এর মধ্যে রয়েছে তল্লাশিতে কড়াকড়ি, কম সংখ্যক সহযোগী, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং সীমিত যোগাযোগ। পুতিন ড্রোন হামলার শিকার হলে পশ্চিমা বিশ্বের অনেকেই, বিশেষ করে ইউক্রেনের নাগরিকরা খুশি হবেন।
কিন্তু এই কল্পনা বাস্তবে পরিণত হওয়া কঠিন। যে শাসক কম সংখ্যক কক্ষ, কম সংখ্যক ফোন এবং কম সংখ্যক সহযোগীকে বিশ্বাস করেন। রাশিয়ার মাফিয়া-রাজনীতির অদ্ভুত ব্যবস্থাটি একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, আর তিনি হলেন পুতিন। যে মুহূর্তে সেই ব্যক্তি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাবেন, পরিস্থিতিটি সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।
পুতিনের গড়া রাষ্ট্র
পুতিন পঁচিশ বছর ধরে নিজেকে রুশ ব্যবস্থার রেফারি, পৃষ্ঠপোষক এবং চূড়ান্ত আপিল আদালত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি অভিজাত গোষ্ঠীগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন, যাতে তারা তার অনুগ্রহ লাভের জন্য প্রতিযোগিতা করে-যা আধুনিক রাশিয়ায় সম্পদ ও সাফল্যের চাবিকাঠি। তার প্রকাশ্য বা মৌন অনুমোদন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাজনৈতিক ঘটনাই ঘটে না।
পুতিন তার এই বিশাল ব্যক্তিগত ক্ষমতা গড়ে তুলেছেন, একই সাথে তার চারপাশের প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের প্রভাবকে যথেষ্ট পরিমাণে কমিয়ে এনেছেন। তিনি রুশ রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দু এবং তার পতন একটি কৃষ্ণগহ্বর তৈরি করবে, যার মধ্যে বাকি সবকিছু হারিয়ে যাবে।
ইউক্রেন নিঃসন্দেহে পুতিনের জন্য একটি গুরুতর হুমকি। কিন্তু পুতিনের জন্য সবচেয়ে গুরুতর হুমকি সম্ভবত তার নিজের তৈরি রাষ্ট্রের ভেতর থেকেই আসছে। অর্থনীতির শোচনীয় অবস্থা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যর্থ ব্যবস্থাপনার সুযোগে সুবিধা ও সুযোগের জানালা—দুটোই খুঁজে পাচ্ছে সুযোগসন্ধানী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতিদ্বন্দ্বী।
পুতিনবাদের নতুন রূপ
গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুসারে, রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে, যার মধ্যে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের গুপ্তঘাতকদের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখা নিয়ে বিরোধও রয়েছে।
একই প্রতিবেদনে সের্গেই শোইগুর নেটওয়ার্ক নিয়ে উদ্বেগ এবং পুতিনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের ঝুঁকির সঙ্গে ২০২৬ সালের মার্চে সাবেক উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী রুসলান সালিকভের গ্রেপ্তারের যোগসূত্র স্থাপন করা হয়েছে।
শোইগুকে ২০২৪ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের সচিব করা হয়েছিল।
সময় এলে যারা স্বভাবগতভাবে বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পুতিনের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার আশা করতে পারেন, এমন নাম খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সম্ভবত আলেক্সেই দিউমিন, যিনি পুতিনের একজন সাবেক দেহরক্ষী এবং প্রেসিডেন্টের সহযোগী ছিলেন। অথবা সের্গেই কিরিয়েনকো, ক্রেমলিনের সেই কর্মকর্তা যিনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, প্রচার এবং নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের তত্ত্বাবধান করেন।
এমনকি দিমিত্রি পাত্রুশেভও হতে পারেন, যিনি একজন উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং পুতিনের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহযোগী নিকোলাই পাত্রুশেভের পুত্র।
কিন্তু এই নামগুলোর কোনোটিই এই ব্যবস্থার মূল সমস্যার সমাধান করে না, যা হলো এর কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পুতিনের অপরিহার্য ভূমিকা। প্রধানমন্ত্রী বর্তমান মিখাইল মিশুস্তিন, পুতিনের মৃত্যু হলে সংবিধান অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তা হলেও অভিজাত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রুশ রাষ্ট্রের জন্য এক তুমুল লড়াই শুরু হবে।
যেকোনো ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের প্রতি অভিজাতদের গ্রহণযোগ্যতা অনিশ্চিত হতে পারে। কারণ রাশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল এবং প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্ব অস্বাভাবিকভাবে কেন্দ্রীভূত। যিনি অন্যদের সবচেয়ে ভালোভাবে ভয় দেখাতে সক্ষম, তারই টিকে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
এর বিপরীত যুক্তিটিও যথাযথ: পুতিনের আকস্মিক বিদায় এমন একজন উত্তরসূরির জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে যিনি নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি, যুদ্ধক্ষেত্রে সাময়িক স্বস্তি অথবা পশ্চিমাদের সাথে কম ধ্বংসাত্মক সম্পর্ক চান। এসব ক্ষেত্রে প্রচুর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাটি পরবর্তী পর্যায়ের, যখন কেউ প্রথম তোলপাড়টি সামলে উঠবে।
পুতিনের উত্তরসূরির জন্য তাৎক্ষণিক পরীক্ষাটি সংযম বা আত্মসমালোচনামূলক হবে না। বরং পরীক্ষাটি হবে জবরদস্তিমূলক প্রতিষ্ঠান, অভিজাতদের অর্থ, যুদ্ধক্ষেত্রের নেতৃত্ব এবং রাশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে একটি অতি-জাতীয়তাবাদী আখ্যানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। সহজ কথায় এটি হবে ভিন্ন চেহারার নতুন পুতিনবাদ।
একটি সমাধান, সমস্যা অনেক
পশ্চিমারা পুতিনের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে আগে থেকেই ভালোভাবে অবগত, যদিও তার সৃষ্ট হুমকি মোকাবিলায় তারা ধীরগতি দেখিয়েছে। সহস্রাব্দের শুরু থেকেই তারা তার সাথে কাজ করে আসছেন। তারা বোঝেন যে পুতিন কেবল কঠোর শক্তিকেই সম্মান করেন।
পুতিন না থাকলে রাশিয়া-ন্যাটো পরিস্থিতি কম সংঘাতপূর্ণ হতো কি না অথবা পুতিনকে ছাড়া ইউক্রেনে শান্তি চুক্তি করা সহজ হতো কি না? হয়তো হতো। কিন্তু পুতিন যেমনই হোক, মিত্ররা তাকে ভালোভাবেই চেনে।
পুতিনের আকস্মিক মৃত্যু তার শাসনের অবসান ঘটাবে, কিন্তু তার তৈরি করা ব্যবস্থার অবসান ঘটাবে না। পুতিনের মৃত্যু হয়তো একটি সমস্যার সমাধান করতে পারে। কিন্তু এটি আরো অনেক নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে।
আরএ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



ট্রাম্পের সফরের আগে চীনে মার্কিন সিনেটরদের তোড়জোড়
‘হরমুজ থাকবে ইরানের হাতেই, ছাড়তে হবে বিদেশিদের’