ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেছিলেন, রাজনৈতিক আন্দোলনে তার চেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে পরিবারের সদস্যদের। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) মুম্বাইয়ে এক আলোচনায় এ কথা বলেছিলেন তিনি। এর ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে মহারাষ্ট্রের হিঙ্গোলি জেলার গ্রামের বাড়িতে মারা যান তার ৮৫ বছর বয়সী দাদি সাবিত্রীবাই শঙ্কর দীপকে। পরদিন শনিবার দিল্লিতে বিক্ষোভে যোগ দিতে গিয়ে বিমানবন্দরেই আটক হন অভিজিৎ।
মারাঠি সংবাদপত্র ‘লোকসত্তা’র আয়োজনে ‘লোকসংবাদ’ শীর্ষক এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে নিজের রাজনৈতিক আন্দোলন ও পারিবারিক জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।
অভিজিৎ জানান, গত জুলাইয়ে দিল্লির যন্তরমন্তরে সিজেপির বিক্ষোভ চলাকালে তার বাবা ও মা দুজনকেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টি তিনি প্রকাশ্যে আনেননি। তার ভাষ্য, মানুষের সহানুভূতি আদায় করতে চাননি তিনি। একই সঙ্গে বাবা-মাকে দেখতে বাড়ি ফিরে গেলে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোর অভিযোগ উঠতে পারে—এমন আশঙ্কাও ছিল তার।
শনিবার হিঙ্গোলি জেলার সান্তুক পিম্পরি গ্রামে মারা যান অভিজিতের দাদি সাবিত্রীবাই শঙ্কর দীপকে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। দাদির মৃত্যুর খবর পেয়ে অভিজিতের বাবা ভগবান দীপকে ও মা অনিতা গ্রামের উদ্দেশে রওনা হন। অন্যদিকে, দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ থেকে আটক করা হয় অভিজিৎকে। দাদির শেষকৃত্যে অংশ নিতে তাকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে তখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
গ্রামের মানুষের জীবন বদলায়নি, বলেছিলেন অভিজিৎ
নিজের শিকড়ের প্রসঙ্গ উঠলেই বারবার সান্তুক পিম্পরি গ্রামের কথা বলেন অভিজিৎ। তার বাবা প্রকৌশলী হওয়ার পর পরিবারকে নিয়ে ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে চলে যান। সেখানে একটি কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেন অভিজিৎ। পরে পুনে হয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।
কিন্তু তার পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবনযাত্রা খুব একটা বদলায়নি। গ্রামের আত্মীয়দের কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ কৃষিশ্রমিক, আবার কেউ গাড়িচালক হিসেবে কাজ করেন। তার এক ফুফুও এখনো মাঠে দিনমজুরের কাজ করেন বলে জানান তিনি।
অভিজিতের ভাষায়, একই পরিবার ও রক্তের সম্পর্কের মানুষ হয়েও তাদের জীবনযাপনে রয়েছে বড় ব্যবধান। তার বাবা পড়াশোনা করে প্রকৌশলী হয়েছেন, তিনি নিজেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরেছেন; কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষের বাস্তব অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি।
তিনি বলেন, তাদের পরিবারের উন্নতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি আগের মতোই রয়ে গেছে।
গ্রাম ও আদিবাসী শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নই আন্দোলনের প্রেরণা
ছুটির সময়গুলো গ্রামেই কাটত অভিজিতের। সেখানকার মানুষের জীবনসংগ্রাম কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তাকে গ্রামীণ ও আদিবাসী এলাকার বিদ্যালয়গুলোর উন্নয়নে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে। সিজেপির প্রচার-আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার পেছনেও এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানান তিনি।
রাজনীতিতে আসার আগে তার স্বপ্নও ছিল তুলনামূলক ছোট পরিসরের। একসময় পরিবারের সদস্যদের বলতেন, গ্রামের সরপঞ্চ বা পঞ্চায়েতপ্রধান হতে চান তিনি। কিন্তু তার এই ইচ্ছার কথা শুনে পরিবারের সদস্যরা নীরব থাকতেন এবং তাকে গ্রামেই থেকে যাওয়ার পরামর্শ দিতেন।
গ্রেপ্তারের আশঙ্কা নিয়েই ফিরেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে
গত জুলাইয়ে যন্তরমন্তরে সিজেপির প্রথম বিক্ষোভে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ফিরেছিলেন অভিজিৎ। তখন থেকেই গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা করছিলেন তিনি।
এমনকি কারাগারে যেতে হতে পারে—এই ধারণা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাত্র একটি ছোট ব্যাগ নিয়ে এসেছিলেন বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, জেলে গেলে তিনটি বড় ব্যাগের প্রয়োজন হবে না ভেবেছিলেন। বাকি ব্যাগগুলো এখনো যুক্তরাষ্ট্রেই পড়ে আছে।
শনিবার সকালে দিল্লিগামী উড়োজাহাজের ভেতর থেকে ধারণ করা একটি ভিডিওতেও তাঁকে পুলিশকে বলতে শোনা যায়, গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা নিয়েই তিনি দিল্লিতে এসেছেন এবং পুলিশ চাইলে তাকে আটক করতে পারে।
এদিকে, ছেলেকে আটকের পর তার বাবা ভগবান দীপকে প্রশ্ন তোলেন, কোন আইনে অভিজিৎকে আটক রাখা হয়েছে। তার মা অনিতাও ছেলের আন্দোলনের প্রতি পরিবারের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।
দাদির মৃত্যুর খবর, পরিবারের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক আন্দোলন ঘিরে আটকের ঘটনা—সব মিলিয়ে অভিজিৎ দীপকের ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন বাস্তবতা নতুন করে সামনে এসেছে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


