রেখায়-রঙে সামাজিক অসংগতির নিপুণ কথক

ফরিদপুরে জন্ম কলকাতায় মৃত্যু, না ফেরার দেশে কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী

ফরিদপুরে জন্ম কলকাতায় মৃত্যু, না ফেরার দেশে কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী

আধুনিক ভারতীয় চিত্রশিল্পের এক বর্ণময় ও দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। রোববার সকালে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী ও প্রাক্তন সাংসদ যোগেন চৌধুরী। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। দীর্ঘ ১৪ মাস ধরে তিনি মাইলোপ্রলিফেরেটিভ নিওপ্লাজ্ম নামক এক বিরল ব্লাড ক্যানসারে ভুগছিলেন। চিকিৎসকদের সব রকম চেষ্টা সত্ত্বেও তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন থেকে তার শারীরিক অবস্থার চূড়ান্ত অবনতি হতে শুরু করে। কেমোথেরাপি চলাকালীন সংক্রমণের জেরে দেখা দেয় সেপসিসের উপসর্গ। অবস্থার অবনতি হলে শনিবার তাকে ভেন্টিলেশনে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত রোববার সকালে চিরতরে থেমে যায় শিল্পীর রং-তুলির যাত্রা।

বিজ্ঞাপন

১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর জেলার দাহারপাড়া গ্রামে জন্ম যোগেন চৌধুরীর। তার পিতা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন স্থানীয় জমিদার। তবে যোগেনের শিল্পীসত্তার বীজ রোপিত হয়েছিল তার মায়ের হাত ধরে। গ্রামীণ বাংলার প্রাত্যহিক জীবনে মায়ের নিপুণ হাতে আঁকা আল্পনা শৈশবেই তার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। এরপর আসে চল্লিশের দশকের উত্তাল সময়। দেশভাগের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি তাদের পরিবারকে ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য করে। সপরিবার কলকাতায় চলে আসেন তারা। ছিন্নমূল জীবনের রুক্ষ বাস্তবতা, আর্থ-সামাজিক টানাপোড়েন এবং সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত মহানগরের কঠোর পরিস্থিতি তার দৃষ্টিভঙ্গিকে আমূল বদলে দেয়। বাস্তুচ্যুত হওয়ার গভীর যন্ত্রণা তার ক্যানভাসে তৈরি করে এক নতুন ভাষা। দেশভাগের সেই অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পকে যেমন মাটির কাছাকাছি রেখেছে, তেমনই দিয়েছে তীব্র প্রতিবাদী চরিত্র।

কলকাতাতেই শুরু হয় তার প্রথাগত শিল্পশিক্ষা। গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফ্ট থেকে তিনি শিল্পকলার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগে তাকে পেরোতে হয়েছে কঠিন জীবনসংগ্রামের পথ। কর্মজীবনের শুরুতে হাওড়া জেলা স্কুলে অঙ্কন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন তিনি। ১৯৬২ সালে কলকাতার হ্যান্ডলুম বোর্ডে ডিজাইনার পদে যোগ দেন। এই পর্ব তার শিল্পভাবনায় বুনন ও টেক্সচারের এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

এরপর ১৯৬৫ সালে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ফ্রান্সের প্যারিসে পাড়ি দেন যোগেন চৌধুরী। সেখানে ইউরোপীয় শিল্প আন্দোলনের আধুনিক ধারার সঙ্গে তার সরাসরি পরিচয় ঘটে। তবে ইউরোপীয় আধুনিকতার অন্ধ অনুকরণ করেননি তিনি। বরং প্যারিস থেকে ফিরে ভারতীয় লোকশিল্পের সাবলীলতা এবং ইউরোপীয় আধুনিকতার মধ্যে এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটান নিজের ক্যানভাসে। এই নিজস্ব শিল্পভাষাই তাকে আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার জগতে স্বতন্ত্র পরিচিতি এনে দেয়।

যোগেন চৌধুরীর শিল্পের অন্যতম আকর্ষণ ছিল রাজনীতি ও সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে তার ব্যঙ্গাত্মক ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারিতে কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ক্ষমতার অন্দরমহলকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান তিনি। ক্ষমতাবানদের দ্বিমুখী চরিত্র, রাজনীতির অন্তর্লীন বাস্তবতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তাঁর পর্যবেক্ষণে উঠে আসে। তার তুলি ও কালির আঁচড়ে এই চরিত্রগুলি ফুটে উঠেছে অদ্ভুত বিকৃত বা ‘ডিসটর্টেড’ রূপে।

মোটা ও সর্পিল রেখার বুননে তিনি তুলে ধরেছেন মানুষের অন্তর্নিহিত লোভ, লালসা, কপটতা এবং অসহায়তা। তার আঁকা নারী-পুরুষের শরীর কখনও স্থূল, কখনও শিথিল। এই শারীরিক গঠনের মধ্য দিয়েই যেন প্রকাশ পেয়েছে সমাজের নীতিবোধের শিথিলতা ও সামগ্রিক অবক্ষয়ের ছবি। তার শিল্পে তাই কেবল মানুষের অবয়ব নয়, ধরা পড়েছে সমাজের অন্তর্লীন সংকটও।

উচ্চমানের অ্যাকাডেমিক শিল্পী হয়েও সাধারণ মানুষের উৎসব ও উদ্‌যাপন থেকে নিজেকে কখনও বিচ্ছিন্ন রাখেননি যোগেন চৌধুরী। বাঙালির অন্যতম প্রধান উৎসব দুর্গাপুজোর সঙ্গে তার ছিল নিবিড় সম্পর্ক। শিল্পের অভিজাত বিভাজনরেখায় বিশ্বাস করতেন না তিনি। ২০১৭ সালে বেহালা নূতন দল পুজোর প্রতিমার স্কেচ করেন তিনি। তার পরের বছর, ২০১৮ সালে, ঠাকুরপুকুর স্টেট ব্যাঙ্ক পার্ক সর্বজনীনের প্রতিমার চালচিত্রের নকশাও তৈরি করেন তিনি।

এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন, শিল্প কেবল গ্যালারির চার দেওয়াল কিংবা বিত্তবানদের ড্রয়িংরুমে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাপন ও গণ-উৎসবেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে পারে শিল্প। তার এই উদ্যোগ কলকাতা তথা বাংলার জনপরিসরে শিল্পচর্চা ও শিল্পচেতনার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করে।

শিল্পের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা তাকে প্রত্যক্ষ রাজনীতির আঙিনাতেও নিয়ে আসে। ২০১৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হন যোগেন চৌধুরী। ২০২০ সাল পর্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও নিজের নিরপেক্ষ শিল্পীসত্তাকে কখনও ম্লান হতে দেননি। সংসদের অলিন্দে থেকেও সমাজের বিভিন্ন স্তরকে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করেছেন। দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত এই শিল্পী আজীবন নিজের শিকড়ের প্রতি দায়বদ্ধ থেকেছেন।

ব্লাড ক্যানসার ও মূত্রনালির সংক্রমণের মতো যন্ত্রণাদায়ক অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে জীবনাবসান হল তার। তবে তার রেখে যাওয়া শিল্পকর্ম কালের সীমানা পেরিয়ে অমর হয়ে থাকবে। অবিভক্ত বাংলার একটি ছোট্ট গ্রাম থেকে প্যারিসের আর্ট স্টুডিয়ো এবং দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত তার দীর্ঘ যাত্রা ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলার ইতিহাসে এক অমূল্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।

তার আঁকা সর্পিল রেখাগুলি যেন বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একেকটি জীবন্ত দলিল। দেশভাগের যন্ত্রণা, সামাজিক অবক্ষয় এবং ক্ষমতার আস্ফালনের বিরুদ্ধে তার ক্যানভাস আজীবন কথা বলবে। শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও তার শিল্পকর্ম আগামী প্রজন্মের কাছে তীক্ষ্ণ, ব্যঙ্গাত্মক ও বাস্তববাদী এক আয়না হয়ে থাকবে। রেখা ও রঙের মধ্য দিয়ে সামাজিক অসংগতিকে যেভাবে তুলে ধরেছেন যোগেন চৌধুরী, তা তাঁকে আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে স্মরণীয় করে রাখবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...