যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলকে পেছনে ফেলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে দলটি। এতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণে বড় ধরনের রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে যাচ্ছে হোয়াইট হাউস।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলে সিনেটে অন্তত ৫৩টি আসন নিশ্চিত করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে, প্রতিনিধি পরিষদে ২২৪টি আসনে জয় পেয়েছে। ফলে চার বছর পর আবারও নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। দলটির নেতা হাকিম জেফরিস স্পিকার নির্বাচিত হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার।
সিনেটে বড় পালাবদল
১০০ সদস্যের মার্কিন সিনেটে এবার নির্বাচন হয়েছে ৩৫টি আসনে। এর মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত ও দুটি বিশেষ নির্বাচন। ভোটের আগে রিপাবলিকানদের দখলে ছিল ৫৩টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে জোটবদ্ধ দুই স্বতন্ত্র সিনেটরসহ বিরোধী জোটের আসন ছিল ৪৭টি।
টেক্সাসে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে হারিয়ে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকো। দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বোন ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। কানসাসে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে হারিয়েছেন অ্যাডাম হ্যামিল্টন।
নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট রয় কুপার। ওহাইওতে রিপাবলিকান জন হাস্টেডকে হারিয়ে সিনেটে ফিরেছেন সাবেক ডেমোক্র্যাট সিনেটর শেরড ব্রাউন। আইওয়ায় অ্যাশলি হিনসনকে পরাজিত করেছেন জশ টুরেক। মেইনেও গুরুত্বপূর্ণ জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। কারণ, বিচারপতি ও কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন অনুমোদনের ক্ষেত্রে সিনেটের ভূমিকা রয়েছে। এ ছাড়া প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত, শুনানি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগও বাড়বে ডেমোক্র্যাটদের।
টেক্সাসে গভর্নর পদেও ডেমোক্র্যাটদের জয়
কংগ্রেসের দুই কক্ষের পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যগুলোর গভর্নর নির্বাচনেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসে তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল রিপাবলিকান অঙ্গরাজ্যটিতে এই জয়কে দলটির বড় রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওহাইয়োতে রিপাবলিকান প্রার্থী বিবেক রামাস্বামীকে হারিয়ে গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট অ্যামি অ্যাক্টন। ২০০৬ সালের পর এই প্রথম অঙ্গরাজ্যটিতে গভর্নর পদে জয় পেলেন কোনো ডেমোক্র্যাট। জর্জিয়ায় জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হতে যাচ্ছেন।
কংগ্রেসে যাচ্ছেন গাজায় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হামাওয়ি
নির্বাচনে নতুন প্রজন্মের বেশ কয়েকজন প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটও জয় পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মিসরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন চিকিৎসক আদম হামাওয়ি। নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়েছেন তিনি। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে গাজায় চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে আলোচনায় আসেন এই সাবেক সেনা চিকিৎসক।
নিউইয়র্কের বিভিন্ন আসনেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট ও প্রগতিশীল ধারার প্রার্থীরা। তাঁদের নির্বাচনী প্রচারে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
পরাজয়ের দায় এড়ালেন ট্রাম্প, ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গ
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ট্রাম্প। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমি ব্যালটে ছিলাম না। থাকলে আমরা ভূমিধস জয় পেতাম।’ অর্থাৎ নির্বাচনে নিজে প্রার্থী না থাকায় দল প্রত্যাশিত ফল পায়নি বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরান যুদ্ধ নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের একটি কারণ কি না, জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান এর একটি অংশ ছিল।’ তবে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমি নিঃসন্দেহে ওই ফলাফল মেনে নিতে প্রস্তুত।’ ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দুই দল সম্ভবত কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে।
ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে ভোটারদের রায়?
মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের প্রথম দুই বছরের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হয়। এবারও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ভোটারদের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের অক্টোবরের এক জরিপে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন প্রতি ১০ জন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে মাত্র তিনজন। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে অর্থনৈতিক উদ্বেগ ও প্রশাসনের নীতির প্রতি অসন্তোষ বড় ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এবারের নির্বাচনী প্রচারেও রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাড ইমপ্যাক্টের হিসাবে, ২০২৬ সালের নির্বাচনী চক্রে বিজ্ঞাপন বাবদ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৬০ কোটি ডলার।
নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হবে আগামী বছরের ৩ জানুয়ারি। ১২০তম কংগ্রেসের অধিবেশন শুরুর পর ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা দুই কক্ষের মুখোমুখি হতে হবে ট্রাম্প প্রশাসনকে। ফলে বাজেট, আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন নীতির বাস্তবায়নে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া এগোনো কঠিন হতে পারে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন বিবিসি, সিবিএস নিউজ, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, মিডল ইস্ট আই ও পিউ রিসার্চ সেন্টার
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

