ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে ফিলিস্তিনের বাইরে ইহুদিদের জন্য জাতীয় আবাসভূমি কিংবা পৃথক রাষ্ট্র গড়ে তোলার একাধিক পরিকল্পনা আলোচনায় এসেছিল। ইউরোপীয় জায়নবাদী নেতারা পূর্ব আফ্রিকা, আর্জেন্টিনা, সাইপ্রাস ও মিসরের সিনাই উপদ্বীপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইহুদিদের বসতি স্থাপন কিংবা স্বায়ত্তশাসিত আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বিবেচনা করেছিলেন। এমনকি উনিশ শতকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ইহুদিদের জন্য পৃথক আশ্রয়স্থল প্রতিষ্ঠার একটি প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল।
তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের একটি ভিডিও সিরিজে এসব ঐতিহাসিক উদ্যোগের কয়েকটি তুলে ধরা হয়েছে। সিরিজটির এক পর্বে পূর্ব আফ্রিকার ‘উগান্ডা পরিকল্পনা’, আরেকটিতে আর্জেন্টিনায় ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা এবং শেষ পর্বে নিউইয়র্কের ‘জিউইশ স্টেট অব আরারাত’ প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের সব কটি একই ধরনের ছিল না। কোনোটি ছিল কৃষিভিত্তিক বসতি স্থাপন ও পুনর্বাসন প্রকল্প, কোনোটি ছিল বিকল্প জাতীয় আবাসভূমির প্রস্তাব, আবার কোনোটি ছিল ইহুদিদের আশ্রয় দেওয়ার প্রাথমিক উদ্যোগ।
কেন বিকল্প ভূখণ্ডের সন্ধান?
উনিশ শতকের শেষভাগে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ইহুদিদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, নিপীড়ন ও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে নিরাপদ আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়। এ সময় আধুনিক রাজনৈতিক জায়নবাদের অন্যতম প্রধান নেতা থিওডর হার্জেল ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা সামনে আনেন।
১৮৯৬ সালে প্রকাশিত তার ডার ইয়ুদেনস্টাট বা ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ গ্রন্থে হার্জেল ফিলিস্তিন ও আর্জেন্টিনাকে সম্ভাব্য আবাসভূমি হিসেবে উল্লেখ করেন। আর্জেন্টিনার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ও বসতি স্থাপনের সুযোগ এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় ছিল।
তবে ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে অনুষ্ঠিত প্রথম জায়নবাদী কংগ্রেসে গৃহীত কর্মসূচিতে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ফলে বিকল্প ভূখণ্ড নিয়ে আলোচনা থাকলেও ফিলিস্তিন দ্রুতই মূলধারার জায়নবাদী আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
আর্জেন্টিনা: বসতি থেকে রাষ্ট্রের ধারণা
ফিলিস্তিনের বাইরে বিকল্প আবাসভূমি নিয়ে আলোচনায় আর্জেন্টিনা গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছিল। টিআরটি ওয়ার্ল্ডের ভিডিও প্রতিবেদনে দেশটির মোইসে ভিল শহরকে ঘিরে ইহুদি বসতি স্থাপনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। ইউরোপ থেকে আসা ইহুদিদের জন্য আর্জেন্টিনায় কৃষিভিত্তিক বসতি গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।
এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ধনকুবের ও সমাজসেবী মরিস ডি হির্শ। তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ইহুদি উপনিবেশায়ন সমিতি ইউরোপের নিপীড়নের শিকার ইহুদিদের পুনর্বাসন এবং কৃষিভিত্তিক বসতি স্থাপনে সহায়তা করেছিল।
তবে আর্জেন্টিনায় ইহুদি বসতি স্থাপনের ইতিহাসকে সেখানে একটি স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। পুনর্বাসন প্রকল্প ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছিল আলাদা বিষয়। টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে আর্জেন্টিনাকে বিকল্প রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হলেও দেশটিতে বাস্তব বসতি স্থাপনের উদ্যোগের পটভূমি ছিল আরও বিস্তৃত।
সাইপ্রাস ও সিনাই: ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা
ইহুদিদের জন্য আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার বিকল্প হিসেবে সাইপ্রাস ও মিসরের সিনাই উপদ্বীপ নিয়েও আলোচনা করেছিলেন হার্ৎসল। বিশ শতকের শুরুর দিকে তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এসব অঞ্চলে ইহুদি বসতি স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে যোগাযোগ করেন।
সিনাইয়ের আল-আরিশ এলাকায় বসতি স্থাপনের একটি পরিকল্পনা খতিয়ে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে বসতি গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় পানির জোগান নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। মিসরীয় কর্তৃপক্ষের সমর্থন না পাওয়ায় উদ্যোগটি এগোয়নি। সাইপ্রাসের প্রস্তাবও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেনি।
এসব প্রচেষ্টা থেকে বোঝা যায়, হার্জেল ফিলিস্তিনে জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করার পাশাপাশি অন্যান্য ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনের সম্ভাবনাও যাচাই করেছিলেন। তবে এসব বিকল্প শেষ পর্যন্ত তার আন্দোলনের মূল লক্ষ্যকে প্রতিস্থাপন করতে পারেনি।
পূর্ব আফ্রিকার ‘উগান্ডা পরিকল্পনা’
বিকল্প আবাসভূমির প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ‘উগান্ডা পরিকল্পনা’। ১৯০৩ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সচিব জোসেফ চেম্বারলেইন হার্ৎসলের কাছে পূর্ব আফ্রিকায় ইহুদিদের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত বসতি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন।
পরিকল্পনাটি ‘উগান্ডা পরিকল্পনা’ নামে পরিচিত হলেও প্রস্তাবিত অঞ্চলটি মূলত বর্তমান কেনিয়ার অংশে অবস্থিত ছিল। ব্রিটিশ পূর্ব আফ্রিকার ওই অঞ্চলে ইহুদিদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়েছিল।
রাশিয়ায় ইহুদিদের ওপর সহিংসতা ও নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা এ পরিকল্পনার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হয়ে ওঠে। ১৯০৩ সালের আগস্টে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জায়নবাদী কংগ্রেসে হার্জেল প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। তিনি এটিকে জরুরি পরিস্থিতিতে ইহুদিদের আশ্রয়ের একটি সম্ভাব্য ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে চেয়েছিলেন; তার বক্তব্য অনুযায়ী, এটি ফিলিস্তিনকে ঘিরে জায়নবাদী আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বাতিল করার প্রস্তাব ছিল না।
কিন্তু পরিকল্পনাটি নিয়ে কংগ্রেসে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে আসা প্রতিনিধিদের একটি বড় অংশ এর বিরোধিতা করেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, ফিলিস্তিনের পরিবর্তে অন্য ভূখণ্ড গ্রহণ করলে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিতর্কের পর প্রস্তাবিত অঞ্চলটি সরেজমিনে যাচাই করতে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
১৯০৪ সালে হার্জেলের মৃত্যুর পরও এ বিতর্ক চলতে থাকে। প্রতিনিধিদলের অনুসন্ধান ও প্রতিবেদন বিবেচনার পর ১৯০৫ সালের সপ্তম জায়নবাদী কংগ্রেসে পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করা হয়। এ সিদ্ধান্তের পর মূলধারার জায়নবাদী আন্দোলন ফিলিস্তিনকেন্দ্রিক লক্ষ্যেই অগ্রসর হয়।
পরিকল্পনাটির বিরোধিতা করা এবং ফিলিস্তিনের বাইরে বিকল্প আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকা কিছু নেতা পরে পৃথক ভূখণ্ডবাদী আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাদের কাছে ইহুদিদের নিরাপদ আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি নির্দিষ্ট একটি ভূখণ্ডের পরিবর্তে অন্য কোথাও বাস্তবায়নের সম্ভাবনার সঙ্গেও যুক্ত ছিল।
নিউইয়র্কে ‘জিউইশ স্টেট অব আরারাত’
টিআরটি ওয়ার্ল্ডের ভিডিও সিরিজে আলোচিত আরেকটি উদ্যোগ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ‘জিউইশ স্টেট অব আরারাত’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব। তবে এই প্রকল্পের ইতিহাস উনিশ শতকের শুরুর দিকের, অর্থাৎ আধুনিক রাজনৈতিক জায়নবাদের বিকাশেরও আগে।
১৮২৫ সালে মার্কিন ইহুদি নেতা, সাংবাদিক ও কূটনীতিক মর্ডেকাই ম্যানুয়েল নোয়াহ নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে ইহুদিদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তিনি এর নাম দেন ‘আরারাত’—বাইবেলে উল্লিখিত আরারাত পর্বতের নাম অনুসারে।
নোয়াহর পরিকল্পনায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নিপীড়নের শিকার ইহুদিদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরির ধারণা ছিল। তবে প্রকল্পটি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সমর্থন ও পর্যাপ্ত জনবসতি অর্জন করতে পারেনি। ফলে সেখানে কোনো ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ঐতিহাসিকভাবে এই উদ্যোগকে পরবর্তী জায়নবাদী আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা হিসেবে বর্ণনা করা ঠিক হবে না। বরং এটি ইহুদিদের জন্য পৃথক আশ্রয়স্থল প্রতিষ্ঠার একটি আগের যুগের প্রচেষ্টা, যা পরবর্তী সময়ে বিকল্প আবাসভূমি নিয়ে আলোচনার ইতিহাসের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে উল্লেখ করা হয়।
শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনকেই কেন্দ্র করে আন্দোলন
বিকল্প ভূখণ্ড নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ও উদ্যোগ থাকলেও মূলধারার জায়নবাদী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনকেই ইহুদিদের জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেয়। এ সিদ্ধান্তের পেছনে ফিলিস্তিনের সঙ্গে ইহুদিদের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সম্পর্কের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংগঠন, বসতি স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনের প্রচেষ্টাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণায় ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন জানায়। পরে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শাসনামলে এ প্রশ্ন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়।
তবে এ ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ফিলিস্তিন তখন আরব ফিলিস্তিনিদেরও আবাসভূমি ছিল। সেখানে ইহুদিদের জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন জড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন। ফিলিস্তিনিরা এই ঘটনাকে ‘নাকবা’ বা ‘বিপর্যয়’ হিসেবে স্মরণ করেন।
ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে ফিলিস্তিনের বাইরে বিকল্প আবাসভূমি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল—এটি ঐতিহাসিকভাবে নথিভুক্ত। তবে আর্জেন্টিনার পুনর্বাসন প্রকল্প, পূর্ব আফ্রিকার স্বায়ত্তশাসিত বসতির প্রস্তাব, সাইপ্রাস ও সিনাই নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা এবং নিউইয়র্কের আরারাত প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও প্রকৃতি এক ছিল না। এসব উদ্যোগের কিছু ছিল ইহুদিদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা, কিছু ছিল জাতীয় আবাসভূমির বিকল্প ধারণা। শেষ পর্যন্ত মূলধারার জায়নবাদী আন্দোলন ফিলিস্তিনকেই কেন্দ্র করে এগিয়ে যায়।
তথ্যসূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড, ইসরাইলের পার্লামেন্টের ঐতিহাসিক বিবরণ, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, হাইফা বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় আর্কাইভ, জাতিসংঘের ডিজিটাল গ্রন্থাগার এবং ঐতিহাসিক দলিলসমূহ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


