যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে ইউক্রেনকে: জেলেনস্কি

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে ইউক্রেনকে: জেলেনস্কি
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে হবে ইউক্রেনকে। একই সঙ্গে দেশটির জন্য সামরিক ও আর্থিক সহায়তা বাড়াতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন করে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন কিয়েভের প্রধান অগ্রাধিকার।

বৃহস্পতিবার সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার পর নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের কৌশল নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

স্পেনে অনুষ্ঠিত আইবেরো-আমেরিকান সম্মেলনের ফাঁকে ইউক্রেনের টেলিভিশন চ্যানেল টিএসএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংলাপের ধরনও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

ওয়াশিংটনের কাছে ১৬ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দাবি

জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইউক্রেনের আরও সামরিক ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। এ জন্য নতুন সহায়তা প্যাকেজের পাশাপাশি ওয়াশিংটন যে ১৬ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটিও আদায় করতে চায় কিয়েভ।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের বিষয়টি বুঝে দুই দলের সঙ্গেই সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। ইউক্রেনকে দ্রুত নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে কাজ করতে হবে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সমর্থন ধরে রাখতে পারলে ইউক্রেনের জন্য আরো সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

জেলেনস্কি বলেন, ‘আমাদের দ্রুত এগোতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পরিবর্তন বুঝে সঠিক উপায়ে সংলাপ গড়ে তুলতে হবে। আমার বিশ্বাস, সমর্থন বাড়ানোর সুযোগ আমাদের রয়েছে।’

প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রই এখন প্রধান অগ্রাধিকার

রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা এখন সবচেয়ে জরুরি বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

জেলেনস্কির ভাষায়, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট সমাধান করা না গেলে ইউক্রেনের পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এ সমস্যা সমাধানে ইউরোপ, ইউরোপের বাইরের কয়েকটি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে এটিই আমাদের এক নম্বর অগ্রাধিকার।’

সম্প্রতি ইউক্রেনের জন্য ২১০ কোটি ডলার মূল্যের ৫০০টি প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ পেতে ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।

গত ৩০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এ বিক্রির অনুমোদনের কথা জানায়। কানাডা, জার্মানি ও নরওয়ের অর্থায়নে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কর্মসূচির আওতায় ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থ ব্যয় হচ্ছে না।

এর আগে ইউক্রেন অভিযোগ করেছিল, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এসব অস্ত্র সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে। জেলেনস্কি সতর্ক করেছিলেন, রুশ হামলা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে।

ফলে বিক্রির অনুমোদন পাওয়া গেলেও দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র হাতে না পাওয়ায় কিয়েভের উদ্বেগ কাটছে না।

আগামী পাঁচ-ছয় মাসের জন্য এফ-১৬ যুদ্ধবিমান চায় কিয়েভ

প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি আগামী পাঁচ থেকে ছয় মাসের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক সচল এফ-১৬ যুদ্ধবিমান নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে ইউক্রেন।

জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়ার বিমান হামলা মোকাবিলা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করতে এসব যুদ্ধবিমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই আগামী কয়েক মাসের জন্য প্রয়োজনীয় যুদ্ধবিমান সচল রাখার ব্যবস্থা করতে কাজ করছে তার সরকার।

এদিকে, রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে। সামনে আরেকটি শীত মৌসুম আসায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

জেলেনস্কি বলেছেন, রুশ হামলার কারণে রাজধানী কিয়েভের পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় রয়েছে। শীতের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।

ইউরোপের সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা

যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আলোচনা করছেন বলেও জানিয়েছেন জেলেনস্কি।

চলতি সপ্তাহে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কীভাবে কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতিও হয়েছে বলে জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এসব আলোচনাকে ফলপ্রসূ ও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।

এদিকে, ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আলোচনা আগামী সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে আবার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির সম্পর্ক গত কয়েক বছরে নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে দুই নেতার বৈঠকে ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সহায়তা ও জেলেনস্কির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

এরপর থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার পর সেই প্রচেষ্টায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। জেলেনস্কির মতে, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুই দলের সঙ্গেই যোগাযোগ বাড়াতে হবে।

অন্যদিকে, ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহাও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তার সুযোগ তৈরির আশা প্রকাশ করেছেন। তবে তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটানো বাস্তবসম্মত নয়। পাশাপাশি ইউরোপেরও আরও কার্যকর ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে রাশিয়ার অব্যাহত হামলা, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি, জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নতুন কৌশল সাজাতে চাইছে কিয়েভ।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, স্ট্রীট ইনসাইডার ও দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন