হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে আবারো সংঘর্ষে জাড়িয়ে পড়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার সকালে হরমুজের একটি জাহাজে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত হানলে আবারো সংঘর্ষের সূত্রাপাতা ঘটে দেশ দুটির মধ্যে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর উপকূলবর্তী সিরিক জেলার তাহরুই গ্রামের কাছে কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এদিকে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর কেশম দ্বীপের একটি গ্রামে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে।
এ পর্যন্ত ইরানের রাজনৈতিক বা সামরিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল সিরিক এবং কেশম দ্বীপ। কেশম দ্বীপে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা, টেলিযোগাযোগ টাওয়ার এবং নজরদারি কেন্দ্র রয়েছে।
এ ঘটনা এমন সময় ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজে অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে। যুক্তরাজ্যের সমুদ্র নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, হামলায় জাহাজটির নিয়ন্ত্রণকক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নাবিকেরা সবাই নিরাপদে আছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর এটি দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিতীয় সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের ঘটনা। ফলে সমঝোতাটির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তি আবারও লঙ্ঘন করায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার সাইটে হামলা চালিয়েছে। মনে হচ্ছে, তারা কখনোই শিক্ষা নেবে না।”
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এমন সময় আসতে পারে, যখন আমাদের আর সংযত থাকার সুযোগ থাকবে না। তখন আমরা সামরিকভাবে অত্যন্ত সফলভাবে শুরু করা কাজটি সম্পূর্ণ করতে বাধ্য হব।
অন্যদিকে, কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ বাহরাইনে কথিত ইরানি ড্রোন হামলাকে দেশটির সার্বভৌমত্বের ‘অবৈধ লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে তিনি দেশটির জনগণের প্রতি কানাডার সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
অনিতা আনন্দ বলেন, বাহরাইনের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে এই কথিত ইরানি ড্রোন হামলা অবৈধ লঙ্ঘনের শামিল।
তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টেকসই সমাধানের আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছে কানাডা।
হামলা চালিয়ে গেলে ইরানও কঠোর অবস্থান নেবে
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে ইরানও আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন নিজেই যে সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে, এখন সেটির শর্ত মানতে আগ্রহী নয়।
আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আহমাদিয়ান বলেন, সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ-চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার ইরানের রয়েছে। তেহরান ওই ধারার ভিত্তিতেই যেসব জাহাজ ইরানের সঙ্গে সমন্বয় না করে চলাচল করছে বলে দাবি করছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘চুক্তিটি ইরানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র সেই সমঝোতার বাইরে ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করতে চাইছে।’
তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি না ইরান থেমে যাবে। বরং যুক্তরাষ্ট্র যদি উত্তেজনা আরও বাড়ায়, তাহলে ইরানও পাল্টা উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে।
ইরানে হামলা ‘যুদ্ধক্ষমতা আইনের লঙ্ঘন: মার্কিন কংগ্রেসম্যানের
মার্কিন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান রো খান্না ইরানে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন হামলার তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, এটি কংগ্রেসে পাস হওয়া ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজুলেশন’ বা যুদ্ধক্ষমতা-সংক্রান্ত প্রস্তাবের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে খান্না বলেন, আমরা যে ওয়ার পাওয়ারস রেজুলেশন পাস করেছি, এই হামলাগুলো তার প্রকাশ্য লঙ্ঘন।
তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পকে এখনই এই যুদ্ধ থামাতে হবে। অন্যথায় তাকে বাধ্য করতে আমরা আদালতের শরণাপন্ন হব।
গত মঙ্গলবার মার্কিন সিনেট একটি প্রস্তাব পাস করে, যাতে বলা হয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হয় ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে, নয়তো পরবর্তী কোনো সামরিক পদক্ষেপের আগে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে। এর আগে জুন মাসেই একই ধরনের প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদেও পাস হয়েছিল।
তেলের দাম বাড়লেই অবস্থান নরম করবেন ট্রাম্প: সাবেক মার্কিন নৌ কর্মকর্তা
মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হারলান উলম্যান বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে হামলার কারণে তেলের দাম বেড়ে গেলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক পদক্ষেপে সংযম দেখাতে বাধ্য হতে পারে।
আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উলম্যান বলেন, “আমার ধারণা, তেলের দাম দ্রুত বাড়বে। কারণ সবাই ধরে নেবে লেবানন ও ইরানের সঙ্গে হওয়া চুক্তিগুলো কার্যকর হবে না।”
তিনি বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ ট্রাম্পকে আবারও আলোচনার পথে ফিরতে বাধ্য করতে পারে, যাতে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়।
উলম্যান আরও সতর্ক করে বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের পাল্টাপাল্টি হামলা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
তার ভাষায়, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তবে আমার ধারণা, তেলের দাম যদি প্রত্যাশামতো বেড়ে যায়, তাহলে সেটিই উভয় পক্ষকে কিছুটা সংযত করতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


