যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর কেমন যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের ওপর। আগামী মঙ্গলবার দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই নির্বাচন। এতে শুধু প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই লড়াই হবে না, নির্ধারিত হবে আগামী দিনগুলোতে মার্কিন রাজনীতিতে ট্রাম্প কতটা প্রভাব ধরে রাখতে পারবেন, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের হাজার হাজার পদে এদিন ভোট গ্রহণ করা হবে। তবে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হবে কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। বর্তমানে উভয় কক্ষই রিপাবলিকান পার্টির দখলে। কিন্তু জনসমর্থনে পিছিয়ে পড়া ট্রাম্পের জন্য এবারের নির্বাচন কঠিন পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জনমত জরিপ, গুরুত্বপূর্ণ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোটারদের অগ্রাধিকার এবং নির্বাচনী প্রচারে দুই দলের ব্যয়ের হিসাব—সব মিলিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সামনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
জনসমর্থনে পতন, চাপে ট্রাম্প
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে তাঁর কমে যাওয়া জনসমর্থন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে তাঁর প্রতি সমর্থন ছিল ৫০ শতাংশের কিছু বেশি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা কমতে কমতে ৪০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
জনমত জরিপবিষয়ক ওয়েবসাইট সিলভার বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ বিমান হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ট্রাম্পের জনসমর্থন ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ। এর কিছুদিন পরই তা আরও কমে যায়। বর্তমানে তাঁর প্রতি সমর্থন প্রায় ৩৭ শতাংশ।
তাঁর প্রথম মেয়াদের একই সময়ে জনসমর্থন ছিল ৪৩ শতাংশ। অন্যদিকে, জো বাইডেনের প্রেসিডেন্ট থাকার সময় একই পর্যায়ে তাঁর জনসমর্থন ছিল ৪০ শতাংশ। ওই দুই প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেই মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল ক্ষমতাসীন দল। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল তারা।
এবার ট্রাম্পের জনসমর্থন তুলনামূলকভাবে আরও কম হওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা আশাবাদী হয়ে উঠেছে। শুধু নিজেদের শক্তিশালী এলাকাগুলো নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিপাবলিকানদের প্রাধান্য থাকা কয়েকটি রাজ্যেও জয়ের সম্ভাবনা দেখছে তারা।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত নাজুক। বর্তমানে দলটির ২১৮ জন প্রতিনিধি রয়েছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় আসনসংখ্যা এটিই। পাশাপাশি একজন স্বতন্ত্র সদস্যও সাধারণত রিপাবলিকানদের পক্ষে ভোট দেন।
প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন। ফলে এবারের নির্বাচনে ৪৩৫টি আসনের সব কটিতেই ভোট হবে।
তবে সব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সমান তীব্র নয়। অধিকাংশ নির্বাচনী এলাকায় কোনো একটি দলের সমর্থন এতটাই শক্তিশালী যে সেখানে ফলাফল অনেকটাই অনুমান করা যায়। কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবার মাত্র ১৮টি আসনে দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ১৮টি আসনের মধ্যে ১৪টিই বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে। বাকি চারটি ডেমোক্র্যাটদের।
তবে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে এই ১৮টি আসনের সব কটিতে জয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। দলটির অনুকূলে রয়েছে, এমন আসনগুলোর মধ্যে ৩৬টিতে জয় নিশ্চিত করতে পারলেও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে।
ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানও ডেমোক্র্যাটদের আশাবাদী করে তুলছে। সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারায়। ১৯৩৪ সাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল গড়ে ২৭টি আসন হারিয়েছে। ওই সময়ের ২৩টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে মাত্র তিনটিতে ক্ষমতাসীন দল আসন বাড়াতে পেরেছে।
সিনেটের লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটদের কঠিন সমীকরণ
প্রতিনিধি পরিষদের তুলনায় সিনেটে রিপাবলিকানদের অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী। ১০০ সদস্যের এই কক্ষে দলটির আসন ৫৩টি। এ ছাড়া তাদের সঙ্গে ভোট দেওয়া দুজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের আসন ৪৫টি।
সিনেট সদস্যরা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তাই প্রতি দুই বছর পরপর এই কক্ষের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবারের নির্বাচনে ৩৫টি আসনে ভোট হবে। তবে কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের হিসাবে, এর মধ্যে মাত্র সাতটি আসনে ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এই সাতটি আসনের ছয়টিই বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে, অন্যটি ডেমোক্র্যাটদের।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের ৫১টি আসনে পৌঁছাতে হবে। সে ক্ষেত্রে অনিশ্চিত সাতটি আসনের মধ্যে অন্তত চারটিতে জয় পাওয়ার পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটদের অনুকূলে থাকা আরও চারটি আসনে জিততে হবে।
তবে এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। মিশিগানে নিজেদের আসন ধরে রাখাই ডেমোক্র্যাটদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সেখানে দলটির প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের সঙ্গে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ জমে উঠেছে। রজার্স ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং সাবেক এফবিআই কর্মকর্তা।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন—এমন আলাস্কা, আইওয়া ও ওহাইওর মতো রাজ্যেও সিনেটের আসন জিততে হবে ডেমোক্র্যাটদের।
তবে জনমত জরিপে দলটির জন্য কিছু সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি টেক্সাসেও জয়ের আশা করছে তারা। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সাবেক শিক্ষক জেমস টালারিকো রিপাবলিকান প্রার্থী, বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে লড়ছেন। টালারিকো জয়ী হলে ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো টেক্সাসে সিনেটের আসন পাবে ডেমোক্র্যাটরা।
জীবনযাত্রার ব্যয়, ইরান যুদ্ধ ও অভিবাসন
নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের জন্য জীবনযাত্রা সাশ্রয়ী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ রাজ্যে প্রতি গ্যালন জ্বালানির দাম ২ দশমিক ৩০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। কিন্তু এর মাত্র চার দিন পর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এর প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও। জ্বালানির দাম বেড়ে প্রতি গ্যালন প্রায় চার ডলারে পৌঁছে যায়।
ইরান যুদ্ধ ক্রমেই মার্কিন জনগণের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ব্যয়ভারেও চাপ তৈরি করেছে। গত আগস্টে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসনও ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশের সংখ্যা কমিয়ে আনাকে নিজেদের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। তবে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা স্বাস্থ্যসেবার উচ্চ ব্যয় এবং ট্রাম্প প্রশাসনের আইনের কারণে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ কতটা সংকুচিত হচ্ছে, সে বিষয়গুলো সামনে আনছেন।
অর্থ ও প্রচারে এগিয়ে রিপাবলিকানরা
জনসমর্থনে পিছিয়ে থাকলেও নির্বাচনী তহবিলের দিক থেকে রিপাবলিকানরা এগিয়ে রয়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর হাতে নগদ অর্থ ছিল প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে ডেমোক্র্যাটদের হাতে ছিল ২৩০ মিলিয়ন ডলারের কিছু কম।
এর বাইরে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ আন্দোলনের তহবিল সংগ্রহ ও ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত সংগঠন মাগা ইনকরপোরেটেডের কাছেও রিপাবলিকানদের ১৬০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে এই আর্থিক সুবিধা কাজে লাগাচ্ছে দলটি। গবেষণা সংস্থা অ্যাডইমপ্যাক্টের তথ্য অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের উদ্দেশে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে। এতে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় করেছে। বিশেষ করে অনিশ্চিত সিনেট আসনগুলোতে বিজ্ঞাপন প্রচারে তাদের ব্যয় ছিল বেশি।
ট্রাম্প ও তাঁর দল আশা করছে, শেষ মুহূর্তের ব্যাপক প্রচার রিপাবলিকান ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে উৎসাহিত করবে। এর ফলে ভোটার উপস্থিতি বাড়বে এবং নির্বাচনে সম্ভাব্য ক্ষতি সীমিত রাখা সম্ভব হবে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে?
সামগ্রিক পরিস্থিতি ডেমোক্র্যাটদের জন্য ইতিবাচক মনে হলেও নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। অতীতেও জনমত জরিপের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের।
এবারও নির্বাচনী তহবিল, প্রচারের ব্যাপকতা এবং নিজেদের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করার আশা করছে রিপাবলিকানরা।
তবে কংগ্রেসের কোনো একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়নে ডেমোক্র্যাটদের বাধার মুখে পড়তে হবে তাঁকে। অন্যদিকে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে ডেমোক্র্যাটরাও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির ওপর আরও কার্যকর নজরদারির সুযোগ পাবে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়েও আলোচনা জোরালো হবে। সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কারণে ট্রাম্প তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। ফলে ডেমোক্র্যাটদের জন্যও এবারের নির্বাচন ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণের লড়াই নয়; এটি ট্রাম্পের নেতৃত্ব, তাঁর নীতির প্রতি জনগণের আস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণেরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

