দিল্লির বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য শহরেও, ব্যাপক ধরপাকড়

দিল্লির বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য শহরেও, ব্যাপক ধরপাকড়

ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং বিতর্কিত এই প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে রাজধানী নয়াদিল্লিসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ করছেন বিরোধী দল, শিক্ষার্থী ও নাগরিক অধিকারকর্মীরা।

ভারতের নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোটার তালিকা থেকে মৃত ব্যক্তি, একই ব্যক্তির একাধিক নিবন্ধন এবং অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দিতেই এই সংশোধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে বিরোধী দল ও সমালোচকদের অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক জীবিত ও বৈধ ভোটারের নামও বাদ পড়েছে। বিশেষ করে মুসলিম, নিম্নবর্ণের মানুষ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিক্ষোভে ধরপাকড়, দিল্লিতে কড়া নিরাপত্তা

বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধন এবং জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নয়াদিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সড়কে ব্যারিকেড বসানো, বিভিন্ন স্থানে চলাচলে বিধিনিষেধ এবং বিক্ষোভকারীদের আটক করার ঘটনা ঘটেছে।

গত শনিবারের একটি বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় ২৪৫টি ট্রেন চলাচল বাতিল করা হয়, ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয় এবং রাজধানীর কেন্দ্রীয় কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা হয়। কয়েকজন আন্দোলনকারীকে বাড়িতে আটকে রাখার অভিযোগও উঠেছে।

বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থী, কর্মী ও সাংবাদিকদের আটক এবং পুলিশের হাতে হেনস্তার ঘটনাও সামনে এসেছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও তার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রাকে ঘিরেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের উত্তেজনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীকেও মুম্বাইয়ে একটি বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আগে পুলিশ সরিয়ে নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক কর্মী যোগেন্দ্র যাদব বলেছেন, বিক্ষোভ মোকাবিলায় এমন প্রস্তুতি তিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খুব কমই দেখেছেন। তবে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও দিল্লির বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট প্রতিবাদ কর্মসূচি চলেছে।

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক নতুন করে জোরালো হয় দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর। ওই প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি ভোটার তালিকা, নিবন্ধনপদ্ধতি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থায় পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন বলে দাবি করা হয়।

এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার প্রকাশ্যে কোনো জবাব দেননি। তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা বলেছেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের বর্তমান প্রক্রিয়া অতীতের চর্চা থেকে আলাদা। তার মতে, ভারতের নির্বাচন কমিশন ঐতিহাসিকভাবে ভোট দেওয়ার যোগ্য প্রত্যেক নাগরিককে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু নতুন প্রক্রিয়ায় সাধারণ ভোটারদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে।

সমালোচকদের অভিযোগ, এই সংশোধন কার্যক্রমের ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিরোধী দলগুলোর দাবি, ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ভোটার তালিকা সংশোধন করা হচ্ছে। তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ

ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও জবাবদিহি চেয়েছে। আদালত সরকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে সংশোধন কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে।

এদিকে বিরোধী দলগুলোর নেতারা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করেছেন। কেরালাম রাজ্যের বিধানসভাও জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে একটি প্রস্তাব পাস করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ বা অপসারণ, এসআইআর প্রক্রিয়া প্রত্যাহার এবং নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগসংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইন পুনর্বিবেচনা। সমালোচকদের মতে, ওই আইনে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের প্রভাব এবং দায়িত্ব পালনের সময় তাদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

অন্যদিকে বিজেপির মুখপাত্র রবিশঙ্কর প্রসাদ বিরোধীদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিক্ষোভকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশ পরিচালিত হবে সংসদের মাধ্যমে, রাস্তায় আন্দোলনের মাধ্যমে নয়।

ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—বাদ পড়া নামগুলোর মধ্যে কতজন মৃত বা অযোগ্য ব্যক্তি, আর কতজন জীবিত ও ভোট দেওয়ার যোগ্য নাগরিক। নির্বাচন কমিশন বলছে, তালিকা পরিচ্ছন্ন করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, ভুলভাবে নাম বাদ পড়লে বহু মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হারাতে পারেন।

দিল্লির পাশাপাশি ভারতের অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে চান। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক এখন শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, নাগরিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন