অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরাইলি আগ্রাসন শুরুর পর গত ১৫ মাসে এখানে বসবাসরত ফিলিস্তিনির সংখ্যা আগের চেয়ে প্রায় ছয় শতাংশ বা এক লাখ ৬০ হাজার কমেছে। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ ফিলিস্তিনি গাজা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে এবং নিহত হয়েছে হাজার মানুষ। এর বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এ ছাড়া নিখোঁজ রয়েছে ১১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি, যারা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময় পূর্ব জেরুজালেমসহ অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রায় এক হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইল। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রিত পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক জনগণের ওপর হামলা, শিশুদের হত্যা করা, ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, সম্পদ চুরি করাসহ ইসরায়েলি সেনাদের বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধের ভয়াবহ বর্ণনা উঠে এসেছে বিবিসির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান গণহত্যায় অংশ নেওয়া ইসরায়েলি সেনাদের একটি অংশ যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা দেখে ও যুদ্ধাপরাধের অনুতাপ থেকে তাদের নাম প্রত্যাহার করেছেন। গাজায় যেতে অস্বীকৃতি জানানো এসব সেনার বর্ণনায় উঠে এসেছে, সেখানে ১৪ মাস ধরে চলা ইসরাইলি গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের ভয়াবহতা।
গাজায় ইসরাইলের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বেই নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে গণহত্যা শুরুর পর থেকেই। গণহত্যার অভিযোগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। এই পরিস্থিতিতে ইসরাইল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দেশে দেশে সমর্থন ও সহানুভূতি বেড়েছে ফিলিস্তিনিদের প্রতি। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে গাজা যুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে ও বিশ্ব জনমতকে নিজেদের পক্ষে আনতে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালাতে এ খাতে মোটা অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে ইসরাইল সরকার।
গাজা উপত্যকায় চলমান গণহত্যা নিয়ে বিশ্ব জনমতকে প্রভাবিত করতে প্রচারণা খাতে ২০২৫ সালের বাজেটে ১৫ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ অনুমোদন করেছে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেট। সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ খাতে এবারের এই বরাদ্দের পরিমাণ আগের তুলনায় ২০ গুণ বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের এ বছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ এত বেশি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কয়েকটি কারণে। এগুলোর মধ্যে আছে, গাজায় হামলা চালানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরে নিজেদের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করা, একইসঙ্গে ফিলিস্তিনিদের ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ হিসেবে চিত্রিত করা।
বিশ্ববাসীর সামনে এটা প্রমাণ করা যে, হামাসসহ ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো ‘নাৎসি’ সন্ত্রাসবাদের মতো ইহুদিদের নির্মূল করতে চায়। তারা জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। এ ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিনিদের প্রতি যে সমর্থন ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা কমিয়ে আনা এবং গাজায় যে গণহত্যা চালানো হচ্ছে, সেটাকে যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করা। ইসরাইলের আরও লক্ষ্য হচ্ছে নানামুখী প্রচারণার মাধ্যমে ইউরোপের দেশগুলোয় ইসলামফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষকে আরও চাঙ্গা করা।
গাজায় গণহত্যার পক্ষে ও একইসঙ্গে ফিলিস্তিনবিরোধী প্রচারণায় বরাদ্দের পরিমাণ আগের চেয়ে এত বেশি বাড়ানোর ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সা’র। তিনি বলেছেন, ‘ইসরায়েলের পক্ষে প্রচারণা ও বিবেক জাগ্রত করার যুদ্ধের জন্য কয়েক দশক ধরে যে সম্পদ ও সরঞ্জাম প্রয়োজন ছিল, তা এতদিন পাওয়া যায়নি। আমি এই অবস্থার পরিবর্তন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ খাতে বরাদ্দ করা প্রতিটি শেকেল হচ্ছে বিনিয়োগ, ব্যয় নয়। এই বিনিয়োগ বিশ্বে ইসরায়েলের অবস্থানকে জোরদার করবে।’
২০২৩ সালের অক্টোবরে সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমা দেশগুলোর জনমতকে নিজেদের পক্ষে আনার টার্গেট করে ইসরায়েল এক্স ও ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক বিজ্ঞাপন প্রদানসহ নানা ধরনের প্রচারণা শুরু করে। এজন্য কেবল ইউটিউবে বিজ্ঞাপন প্রচার বাবদই ৭১ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। সাংবাদিক সোফিয়া স্মিথ তার এক্স অ্যাকাইন্টে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেনসহ ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশের জনমতকে প্রভাবিত করতে ইউটিউবকে বেছে নেওয়া হয়। ৭ থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত ১২ দিনে ৮৮টি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় ইউটিউবে।
বিশ্বব্যাপী নিজেদের পক্ষে ও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে কেবল যে ইসরায়েলই মাঠে নেমেছে, তা কিন্তু নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোড়া হিসেবে পরিচিত ইহুদি বর্ণবাদী এই দেশটির পক্ষে ময়দানে নেমে পড়েন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ধনকুবেররাও। গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই তাদের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোটি কোটি ডলার অনুদান দেওয়া হচ্ছে ইসরাইলের পক্ষে ও ফিলিস্তিনবিরোধী প্রচারণা জোরদার করতে।
মিডিয়া, ফিন্যান্স, প্রযুক্তি খাত ও রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন খাতের বড় বড় এসব কোম্পানি এ ব্যাপারে অকাতরে অর্থ ঢালছে এক বছরের বেশি সময় ধরে। নিউজ ওয়েবসাইট সীমাফোরের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর প্রকাশিত এক রিপোর্টে এ কথা জানিয়েছিল আল জাজিরা।
আল জাজিরার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়নেয়ার এক রিয়েল এস্টেট টাইকুন ইসরায়েলের পক্ষে জনসমর্থন বাড়াতে এবং বিশ্ববাসীর সামনে হামাসকে দানব হিসেবে তুলে ধরতে মিডিয়ায় প্রচারণা যুদ্ধ শুরু করেন। ইসরাইলি আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে ও ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সারাবিশ্বে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসার পরই এই ধনকুবের ইসরায়েলের পক্ষে মাঠে নামেন।
‘ফ্যাক্টস ফর পিস’ নামে শুরু করা এই প্রচারণা যুদ্ধে অনুদান দিতে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় মিডিয়া হাউস থেকে শুরু করে ফিন্যান্স, প্রযুক্তি ও রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ জানিয়ে ইমেইল করেন। সীমাফোর ওয়েবসাইট ওই বিলিয়নেয়ারের পরিচয় প্রকাশ করেনি। তবে তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, গুগলের সাবেক সিইও এরিক স্মিথ, ডেলের সিইও মাইকেল ডেল ও বিনিয়োগকারী মাইকেল মিলক্যানসহ অন্তত ৫০ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ও বিত্তশালী ব্যবসায়ীর কাছে ইমেইল পাঠিয়ে ইসরাইলের পক্ষে প্রচারণা যুদ্ধে অনুদান প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়।
বিনিয়োগকারী বিল অ্যাকম্যানসহ তাদের কয়েকজন ফিলিস্তিনিদের পক্ষে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের নাম কালো তালিকাভুক্ত করার হুমকি দিয়েছেন প্রকাশ্যেই। বিল অ্যাকম্যান তার এক্স অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, গাজায় ইসরায়েলের অনুসৃত নীতির সমালোচনা করে যেসব সংগঠন সংবাদপত্রে খোলা চিঠি দিয়েছে, সেগুলোর নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থীদের নাম প্রকাশ করা উচিত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।
২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার বদলা নিতে ইসরায়েল গাজায় বর্বর হামলা ও গণহত্যা শুরু করার পরপরই ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়। সে সময় ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ তার মতামত পোস্ট করে বলেছেন, ‘ইসরাইলের আত্মরক্ষা করার অধিকার আছে আজ ও আগামী দিনে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরাইলের পাশে দাঁড়িয়েছে।’
গাজায় গণহত্যার জন্য ইসরায়েল হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) দোষী প্রমাণিত হয়েছে এবং এর নেতাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) অভিযুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। তবুও ইইউ তার ‘হরাইজন’ প্রকল্পের অধীনে গবেষণা ও উদ্ভাবনের নামে ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানকে অর্থ দিচ্ছে এবং তাদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব অব্যাহত রেখেছে।
ইউরোপীয় কমিশনের সংগৃহীত ও আল জাজিরার বিশ্লেষণ করা তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইইউ গবেষণা ও উদ্ভাবনের নামে ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২৩ কোটি ৮০ লাখ ইউরো (২৫ কোটি ডলার) দিয়েছে। এর মধ্যে ছয় কোটি ৪০ লাখ ইউরো ইসরায়েলি অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজকে (আইএআই) দেওয়া হয়েছে। তারা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে যুদ্ধবিমান সরবরাহ করে।
ইইউ দাবি করে, ‘হরাইজন’ প্রকল্পের অধীনে শুধু বেসামরিক গবেষণায় অর্থায়ন করা হয়। কিন্তু গত বছর জুলাই মাসে যখন গাজায় ইসরাইলের গণহত্যার শিকার হয়ে প্রায় ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হন, তখন দুই হাজারের বেশি ইউরোপীয় শিক্ষাবিদ এবং ৪৫টি সংস্থা ইইউকে ইসরাইলি প্রতিষ্ঠানগুলোয় সব ধরনের তহবিল বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, ইইউ’র ‘হরাইজন’ প্রকল্প ইসরায়েলি সামরিক প্রযুক্তির অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ইউরোপের বিভিন্ন দেশের এসব বিশিষ্ট ব্যক্তির আহ্বানে কোনো সাড়া দেয়নি ইইউ কর্তৃপক্ষ।
মিডল ইস্ট মনিটর ও আল জাজিরা থেকে ভাষান্তর মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

