সিএনএনের বিশ্লেষণ

ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে কী ঘটতে পারে

ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে কী ঘটতে পারে
ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের যেকোনো একটির নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটরা ফিরে পেলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের ক্ষমতার ওপর নতুন করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাবে দলটি। সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের তদন্ত, ব্যয় বরাদ্দে প্রভাব বিস্তার এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির বিরোধিতা করার সুযোগ বাড়বে তাদের। তবে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনা সহজ হবে না।

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের অগ্রাধিকার তুলে ধরতে বিভিন্ন বিল পাসের চেষ্টা করতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ আইন কার্যকর করতে সিনেটে রিপাবলিকানদের সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। ট্রাম্পও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতায় আগ্রহী হবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তিনি বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা সমঝোতা করতে এলে তিনি সবকিছুতে ভেটো দেবেন।

বিজ্ঞাপন

জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো

জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হতে পারে। আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর উপায় খুঁজতে প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটরা পৃথক কার্যকরী দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন।

তবে ট্রাম্পের শুল্কনীতি পরিবর্তন বা ইরান যুদ্ধ বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নিতে হলে তাদের রিপাবলিকানদের সমর্থন প্রয়োজন হবে। প্রেসিডেন্টের ভেটো অতিক্রম করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা ডেমোক্র্যাটদের জন্য কঠিন হতে পারে।

সরকারি ব্যয় হবে দর-কষাকষির প্রধান হাতিয়ার

সরকারি অর্থ বরাদ্দের ওপর প্রভাব বিস্তার হবে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। সরকারের কার্যক্রম চালু রাখতে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হওয়ায় ব্যয় বরাদ্দ নিয়ে দর-কষাকষির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে চাইবে দলটি।

অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের অর্থায়ন কমানো কিংবা ওয়াশিংটন ডিসিতে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে তারা। এসব প্রকল্পের মধ্যে বিজয়তোরণ ও গলফ কোর্স নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

২০২৭ সালে ঋণসীমা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হতে পারে। তবে ট্রাম্পের বড় করছাড় ও ব্যয়সংক্রান্ত আইনে করা পরিবর্তনগুলো উল্টে দিতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় এ ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদেরও বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

স্বাস্থ্যসেবা

সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইন বা ‘অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট’-এর আওতায় বিমা গ্রহীতাদের জন্য বাড়তি প্রিমিয়াম ভর্তুকি পুনর্বহাল করা ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে। ২০২৫ সালের শেষে এ সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর চলতি বছরে অনেকের বিমার প্রিমিয়াম বেড়েছে এবং কয়েক মিলিয়ন মানুষ স্বাস্থ্যবিমা ছেড়েছেন।

তবে ১০ বছরের জন্য ভর্তুকি স্থায়ীভাবে চালু রাখতে প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের হিসাব। মেডিকেইডে রিপাবলিকানদের আনা বড় ধরনের কাটছাঁটও পর্যালোচনা করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। বিশেষ করে কর্মসংস্থানসংক্রান্ত নতুন শর্তের কারণে যারা স্বাস্থ্যসেবা হারাতে পারেন, তাদের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

এছাড়া ওষুধ প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের করা চুক্তি, ওষুধের দাম এবং হাসপাতাল ও অঙ্গরাজ্যগুলোর ওপর নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে তদন্ত হতে পারে। তবে আগামী কংগ্রেসে ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা কম।

তদন্ত ও নজরদারি বাড়বে

কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেই ডেমোক্র্যাটরা তদন্ত কমিটি গঠন, শুনানি আয়োজন এবং সাক্ষীদের তলব করার ক্ষমতা পাবে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়ানো হবে তাদের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকারগুলোর একটি।

ইলন মাস্কের নেতৃত্বে গঠিত সরকারি দক্ষতা বিভাগ (ডিওজিই), মাস্কের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরকারি চুক্তি এবং ইউএসএআইডি, কনজ্যুমার ফাইন্যান্সিয়াল প্রোটেকশন ব্যুরো ও শিক্ষা বিভাগের কার্যক্রম সংকুচিত করার উদ্যোগ তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

প্রেসিডেন্টের পরিবারের সদস্যদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতে ট্রাম্পের স্বার্থ এবং ইরান যুদ্ধ, গণহারে অভিবাসী বহিষ্কার ও শুল্কনীতিও তদন্তের মুখে পড়তে পারে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের প্রধান মার্কওয়েন মুলিনসহ বিভিন্ন মন্ত্রীর কংগ্রেসে শুনানিতে অংশ নেওয়ার চাপ বাড়বে।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে চাপ

ইরান যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে কংগ্রেসে দ্বিদলীয় সমর্থন তৈরি হতে পারে। তবে প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করা জটিল হবে। সামরিক অভিযানের বিষয়ে কংগ্রেসের ক্ষমতা থাকলেও ট্রাম্পের ভেটো অতিক্রম করতে সিনেটে ৬৭টি ভোট প্রয়োজন, যার জন্য রিপাবলিকানদের সমর্থন লাগবে।

যুদ্ধের ব্যয় অনুমোদন এবং প্রতিরক্ষা খাতের অর্থ বরাদ্দের শর্ত নিয়ে নতুন বিতর্ক দেখা দিতে পারে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত বাড়লে কংগ্রেসের চাপও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর বাড়বে।

খাদ্যসহায়তা কর্মসূচি

স্বল্প আয়ের মানুষের খাদ্যসহায়তা কর্মসূচি বা ফুড স্ট্যাম্পে রিপাবলিকানদের আনা কাটছাঁটের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করবে ডেমোক্র্যাটরা। নতুন নিয়মে যেসব অঙ্গরাজ্যে সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে ভুলের হার বেশি, সেসব রাজ্যকে কর্মসূচির ব্যয়ের একটি অংশ বহন করতে হবে।

ডেমোক্র্যাটরা নিয়মটি কার্যকর করার সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে। তাদের আশঙ্কা, অঙ্গরাজ্যগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হলে আবেদন ও নবায়নের প্রক্রিয়া কঠোর হবে এবং আরও মানুষ খাদ্যসহায়তা হারাবেন।

উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষাঋণ

স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ফেডারেল ঋণসীমা কমানো এবং শিক্ষাঋণ পরিশোধের সুবিধা সীমিত করার মতো রিপাবলিকান নীতির বিরোধিতা করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা।

নার্স, চিকিৎসা সহকারী ও ফিজিও থেরাপিস্টদের মতো স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের জন্য শিক্ষাঋণ সীমা নির্ধারণকারী নিয়ম পরিবর্তনের উদ্যোগও আসতে পারে। এ বিষয়ে রিপাবলিকানদের একাংশের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা বিভাগকে ভেঙে অন্য সংস্থার সঙ্গে এর দায়িত্ব একীভূত করার উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়েও শুনানি হতে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তা ও মেডিকেয়ার

সামাজিক নিরাপত্তা ও মেডিকেয়ারের তহবিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা কিছু প্রস্তাব সামনে আনতে পারে। এসব তহবিল ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিকে আর্থিক সংকটে পড়তে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে উচ্চ আয়ের মানুষের অবদান বাড়ানো, ন্যূনতম সুবিধা বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব আসতে পারে। মেডিকেয়ারে দাঁত, চোখ ও শ্রবণসংক্রান্ত সুবিধা যুক্ত করা এবং বেসরকারি মেডিকেয়ার অ্যাডভান্টেজ বিমা কোম্পানিগুলোর অর্থপ্রদানের নিয়ম সংশোধনের বিষয়ও আলোচনায় থাকতে পারে। তবে বড় ধরনের সংস্কারের সম্ভাবনা আপাতত সীমিত।

যেসব বিষয়ে সমঝোতা হতে পারে

আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো কিছু বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিসের সঙ্গে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের আলোচনায় আবাসন ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা সংস্কারের বিষয় উঠে এসেছে।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গেও আবাসন ও অবকাঠামো নিয়ে আলোচনা করেছেন ট্রাম্প। তার প্রথম মেয়াদে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের সমর্থনে পাস হওয়া ‘ফার্স্ট স্টেপ অ্যাক্ট’ ছিল উল্লেখযোগ্য দ্বিদলীয় উদ্যোগ।

সব মিলিয়ে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয় নিয়ে দর-কষাকষির ক্ষমতা অর্জন। তবে স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, যুদ্ধনীতি কিংবা করব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে হলে রিপাবলিকানদের সমর্থন, দলীয় ঐক্য এবং প্রেসিডেন্টের ভেটো মোকাবিলার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...