বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি, স্পাইওয়্যার এবং নির্বাচনি প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ইসরাইল ধীরে ধীরে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার সরকার ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ মিত্রে পরিণত হয়েছে এমন দাবি উঠে এসেছে এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় কূটনীতি, সাইবার প্রযুক্তি এবং বেসরকারি নজরদারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ইসরাইল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের কৌশলগত প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরাইলের স্পাইওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনএসও গ্রুপ এবং তাদের তৈরি পেগাসাস সফটওয়্যার দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন দেশের সরকার ব্যবহার করে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, বিরোধী রাজনীতিক এমনকি মিত্র দেশগুলোর ব্যক্তিদের ওপরো নজরদারি চালানো হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এনএসও গ্রুপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা শালেভ হুলিও ২০১৩ সালে ইসরাইলের কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করে পানামা সফর করেন এবং সে সময় দেশটির ইসরাইলি দূতাবাসে অবস্থান করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে পানামা সরকারের কাছে পেগাসাস বিক্রির চুক্তি স্বাক্ষরে হুলিও সরাসরি ভূমিকা পালন করেছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে এনএসও গ্রুপসহ ইসরাইলের বিভিন্ন নজরদারি ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কেবল বাণিজ্যিক সংস্থা নয়; বরং তারা ইসরাইলি রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ বাস্তবায়নেও ভূমিকা পালন করে থাকে।
রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এনএসও গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু মোবাইল ডিভাইস থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করে, তাই এসব তথ্য ভবিষ্যতে বিভিন্ন দেশের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ বা কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
গত এক দশকে ইসরাইলি সাইবার প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্ক কমেনি। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে রাশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পেগাসাসের মতো নজরদারি সফটওয়্যার ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু স্পাইওয়্যার নয়, নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আরো বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে।
নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ
প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে, স্কটল্যান্ড, ফ্রান্স, কলম্বিয়া ও হন্ডুরাসসহ বিভিন্ন দেশে ইসরাইলি প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো, বট নেটওয়ার্ক পরিচালনা এবং জনমত প্রভাবিত করার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত। এসব কার্যক্রমের লক্ষ্য হিসেবে ইসরাইল-সমর্থক প্রার্থীদের সুবিধা দেওয়া এবং ফিলিস্তিনপন্থী বা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করার অভিযোগও করা হয়েছে। যা গণতান্ত্রিক নির্বাচন এবং অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
লাতিন আমেরিকায় সক্রিয়তা
প্রতিবেদনে লাতিন আমেরিকাকে ইসরাইল-সমর্থিত রাজনৈতিক তৎপরতার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার এবং হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজের মধ্যে কথিত সমন্বয়ের মাধ্যমে কিছু দেশে বামপন্থী সরকারকে দুর্বল করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া ব্রাজিলের আসন্ন নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রচারণায় নেতানিয়াহুর সমর্থনকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়, নির্বাচনের আগে অনলাইন প্রচারণা ও সাইবার কৌশলের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সমর্থন কমার প্রেক্ষাপট
প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়েছে, গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে চলমান গণহত্যার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের প্রতি জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পরিসরে রাজনৈতিক মিত্র বাড়াতে এবং কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতে ইসরাইল আরো সক্রিয়ভাবে প্রযুক্তি, কূটনীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের সমন্বিত কৌশল ব্যবহার করছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বেশিরভাগই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে ইসরাইল সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সূত্র: মিডলইস্ট আই
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


