ফ্রান্সের পাহাড় ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের অধিকার নিয়েও এবার বর্ণবাদ ও ইসলামোফোবিয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি টিকটক ভিডিওকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। ভিডিওতে ফ্রান্সের পাহাড়ি অঞ্চলকে শ্বেতাঙ্গদের জন্য ‘নিরাপদ’ ও বৈচিত্র্যহীন স্থান হিসেবে তুলে ধরা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ, আরব ও মুসলিম তরুণ-তরুণীরা ‘ওয়াল্লাহ, আমরা আসছি’ স্লোগানে পাহাড়, বন ও প্রকৃতিতে নিজেদের উপস্থিতির ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছেন।
আগস্টে প্রকাশিত ওই ভিডিওতে আলপস পর্বতমালার দৃশ্যের সঙ্গে একটি মন্তব্য জুড়ে দেওয়া হয়। সেখানে পাহাড়কে ফ্রান্সের এমন একটি বিরল স্থান হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যেখানে ‘ওয়াল্লাহ’ ও ‘গুচি ক্যাপ’ পরা মানুষ নেই এবং যেখানে নিজেকে নিরাপদ মনে করা যায়। ‘ওয়াল্লাহ’ আরবি ‘আল্লাহর কসম’ অর্থবোধক একটি শব্দ, যা ফরাসি কথ্য ভাষাতেও ব্যবহৃত হয়। ভিডিওটি পরে মুছে ফেলা হলেও এর স্ক্রিনশট ও বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওটি প্রকাশের পর প্রথমে একদল ব্যবহারকারীর কাছ থেকে বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্য আসে। এসব মন্তব্যে ফ্রান্সের শহরতলির শ্রমজীবী ও জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময় এলাকাগুলোতে বসবাসকারী মানুষদের সেখানেই থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। কেউ কেউ তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘নিজেদের জায়গায় থাকো।’ প্রকৃতি দূষিত করা, ময়লা ফেলা কিংবা কথিত অসভ্য আচরণের অভিযোগও তোলা হয়।
এরপরই শুরু হয় ভিন্নধারার এক প্রতিক্রিয়া। ‘ওয়াল্লাহ, আমরা আসছি’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে তরুণ-তরুণীরা পাহাড়, বন, ঘোড়ার পিঠ ও হাইকিং ট্রেইল থেকে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করতে থাকেন। তাদের বক্তব্য—প্রকৃতি কোনো নির্দিষ্ট বর্ণ বা জনগোষ্ঠীর জন্য নয়; তারাও এসব জায়গায় যাওয়ার সমান অধিকার রাখেন।
এই আন্দোলনে অংশ নেন জেনাব আলাব্বার। তিনি কামাক নামে একটি পরিমিত পোশাকের স্পোর্টস ব্র্যান্ডের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর। হিজাব পরা আলাব্বার নিজের বন্ধুদের সঙ্গে পাহাড়ি পথে হাঁটার ভিডিও প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরাও প্রকৃতিকে ভালোবাসি।’ তার মতে, ফ্রান্সে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে প্রায়ই সমাজে একীভূত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়, অথচ একই সঙ্গে এমন কিছু জায়গা ও কর্মকাণ্ড থেকে তাদের দূরে রাখার প্রবণতাও দেখা যায়, যা সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ার কথা।
আলাব্বার বর্তমানে সুইজারল্যান্ডে বসবাস করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে পাহাড়ি এলাকায় হিজাব পরা অবস্থায় তিনি বর্ণবাদী মন্তব্যের মুখোমুখি হননি। কিন্তু ফ্রান্সে গেলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন টের পান বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষায়, সেখানে অনেক সময় মনে হয় তিনি স্বাগত নন।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন প্যারিসের দক্ষিণের এসোন বিভাগের ৩৮ বছর বয়সী জুমিয়া আলাউই। তিনি হিজাব পরা বন্ধুদের সঙ্গে প্রায়ই ফঁতেনব্লো বনে হাঁটতে যান। তার দাবি, কিছু মানুষ তাদের এমনভাবে তাকান, যেন তারা সেখানে থাকার অধিকার রাখেন না। একবার একজন ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, শরীর পুরোপুরি ঢাকা থাকলে তার গরম লাগে কি না।
আলাউই মনে করেন, পাহাড়ে আরবদের উপস্থিতি না চাওয়ার ওই ভিডিও এবং তাতে সমর্থনকারী মন্তব্যগুলো ফ্রান্সের সমাজে বাড়তে থাকা বৈষম্যের একটি উদাহরণ। তিনি বলেন, পরিস্থিতি প্রতিরোধ করা না হলে ভবিষ্যতে হিজাব পরা নারীদের আরো বেশি সামাজিক বিধিনিষেধের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
ফ্রান্সের রাজনীতিতেও হিজাব নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রসঙ্গ এসেছে। ন্যাশনাল র্যালি পার্টি ক্ষমতায় এলে জনসমাগমস্থলে হিজাব নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া ২০২৩ সালে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোকে হিজাব নিষিদ্ধ করার সুযোগ দেওয়ার একটি সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
তবে ফ্রান্সের পাহাড়ে বৈষম্যের অভিযোগ শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্কেই সীমাবদ্ধ নয়। জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের শিক্ষক লেয়া সালেনাভ আলপাইন অঞ্চলে বৈষম্য ও সামাজিক আধিপত্য নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার মতে, পাহাড়কেন্দ্রিক বিনোদন ও ক্রীড়া সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মানদণ্ড দ্বারা গড়ে উঠেছে। ফলে অন্য জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সেখানে নিজেদের ‘বহিরাগত’ মনে হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সালেনাভের গবেষণায় আলপাইন স্কি রিসোর্টগুলোর প্রচারণামূলক ছবিতেও বৈচিত্র্যের ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২০ সালে গ্রেনোবলের একটি পৌর কর্মসূচি নিয়ে করা গবেষণায় তিনি শহরতলির তরুণদের প্রকৃতি ও বহিরাঙ্গন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ তাকে বলেছেন, তারা যত ওপরে উঠেছেন, তত বেশি শ্বেতাঙ্গ মানুষের দেখা পেয়েছেন।
তার মতে, পাহাড় সমাজের বাইরে কোনো আলাদা জগত নয়। সমাজে যদি বর্ণবাদ, শ্রেণিবৈষম্য ও লিঙ্গবৈষম্য থাকে, তাহলে পাহাড়ি এলাকাতেও তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন সেইন-সাঁ-দেনি এলাকার ‘আপার্ট’ নামের একটি বেসরকারি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সামির সুয়াদজি। সংগঠনটি সমস্যায় থাকা তরুণদের পর্বতারোহণ, রক ক্লাইম্বিং ও অন্যান্য বহিরাঙ্গন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সামাজিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করে। সুয়াদজির দাবি, পাহাড়ে তরুণদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি কখনো অবজ্ঞা ও বর্ণবাদী মন্তব্যের মুখোমুখি হয়েছেন।
একবার পাহাড় থেকে ফেরার সময় তার সঙ্গে থাকা তরুণদের উদ্দেশে একজন পথচারী কটূক্তি করে বলেন, ‘এখানে তোমরা তোমাদের কাউন্সিল এস্টেটে নেই।’ অন্য একটি ঘটনায় দুজন পথচারী হাসতে হাসতে জানতে চান, ওই এলাকায় কোনো ‘আফ্রিকান কংগ্রেস’ হচ্ছে কি না।
প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী নাসিরা গেনিফ-সুইলামাসের মতে, এ ধরনের আচরণের পেছনে জাতীয়তাবাদী ও বর্জনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করতে পারে। তার মতে, কিছু মানুষ এমনভাবে আচরণ করেন যেন পাহাড়ের প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের ওপর তাদেরই একচেটিয়া অধিকার রয়েছে।
তার ভাষায়, কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্যমান বর্ণবাদী ধারণা তাদের প্রকৃতি উপভোগের মতো মৌলিক অধিকার থেকেও দূরে ঠেলে দিতে পারে। ফলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষকে নিজেদের আচরণ নিয়ে বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়, যেন তারা প্রমাণ করতে পারেন যে তারা পরিবেশের প্রতি অসম্মানজনক বা ‘বিপজ্জনক’ নন।
সুয়াদজিও স্বীকার করেন, পাহাড়ে তরুণদের আচরণ নিয়ে তিনি নিজেও কঠোর থাকেন। তবে তার উদ্দেশ্য হলো প্রচলিত নেতিবাচক ধারণার পরিবর্তন ঘটানো। তার ভাষ্য, মানুষ ও প্রকৃতির প্রতি সম্মান দেখানো গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্সের বাইরে নেপাল, কিরগিজস্তান, বলিভিয়া ও নরওয়েতেও তরুণদের নিয়ে পর্বতারোহণের আয়োজন করেছেন সুয়াদজি। তার দাবি, অন্য দেশগুলোতে এমন বৈরিতার অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম; ফ্রান্সেই তিনি এ ধরনের পরিস্থিতি বেশি দেখেছেন।
ফরাসি-আলজেরীয় লেখক নাদির দানদুনও মনে করেন, পাহাড়ি ক্রীড়ায় পরিচয় ও বর্ণের ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করার প্রবণতার সঙ্গে ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সম্পর্ক রয়েছে। ২০০৮ সালে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই তিনি এভারেস্ট জয় করেন এবং চূড়ায় উঠে সেইন-সাঁ-দেনি বিভাগের নম্বর ‘৯৩’ লেখা একটি সাইন স্থাপন করেন। পরে এ অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বই লেখেন, যা পরবর্তীতে চলচ্চিত্রেও রূপ নেয়।
ফ্রান্সের পাহাড়কে ঘিরে সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্ক তাই শুধু একটি টিকটক ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অনলাইন প্রতিক্রিয়া নয়। এটি প্রকৃতি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, অভিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অবস্থান এবং ফ্রান্সের পরিচয়-রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককেও সামনে এনেছে। ‘ওয়াল্লাহ, আমরা আসছি’ আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বার্তা হলো—পাহাড়, বন ও প্রকৃতি কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম বা বর্ণের সম্পত্তি নয়; এগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

