মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ

যে কারণে যুদ্ধ শেষ করতে পারছে না ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র

আমার দেশ অনলাইন

যে কারণে যুদ্ধ শেষ করতে পারছে না ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র
ছবি: মিডল ইস্ট আই

২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি ও চীন পারমাণবিক চুক্তি করে। এই চুক্তির আওতায় ইরান ইউরেনিয়াম উৎপাদন সীমিত করে। তবে বারাক ওবামার সময়ে হওয়া ওই চুক্তি নিয়ে বরাবরই বিরোধিতা করে আসছিলেন ট্রাম্প। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের সময় ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় গেলে ওই চুক্তি বাতিল করবেন। সেই ঘোষণা ঠিক রেখে ট্রাম্প ওই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন।

ট্রাম্প অভিযোগ করেন, এই চুক্তির ফলে ইরান ‘বিমান ভর্তি নগদ অর্থ’ পেয়েছে। এখন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শেষ করার ক্ষেত্রে তার সক্ষমতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে তিনি তেহরানকে কতটা অর্থ দিতে রাজি থাকবেন তার ওপর।

বিজ্ঞাপন

ওয়াশিংটন ডিসির মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ভ্যাটাঙ্কা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে যেকোনো সমঝোতার চাবিকাঠি হলো অর্থ।’

কয়েকজন মার্কিন ও আরব কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে জানান, ট্রাম্পের অর্থ প্রদানে অনীহাই দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা স্থবির থাকার এবং সম্ভাব্য ব্যর্থতার আসল কারণ।

জানা গেছে, যুদ্ধ শেষ করতে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য উভয় পক্ষের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু পারমাণবিক বিষয়টি সবচেয়ে বড় বাধা নয় বলে আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার পর উপসাগরীয় ও মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা। তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়ে একটি সমঝোতা নিয়ে সবারই কমবেশি ধারণা আছে, কিন্তু ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। আমি যতদূর জানি, এটি পারমাণবিক বিষয়ের চেয়েও বেশি সংবেদনশীল।’

এর কারণ বোঝা কঠিন নয়।

কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প অর্থনৈতিক যুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে তার ইরান নীতি গড়ে তুলেছিলেন, কিন্তু এই নীতি থেকে সরে আসতে তার অনীহার কারণে হয়তো কখনোই কোনো চুক্তি হবে না।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ভ্যাটাঙ্কা বলেন, ‘শুরু থেকেই ট্রাম্প যেভাবে জয়েন্ট কম্প্রেহেন্সিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) যা ইরান পরমাণু চুক্তি নামে পরিচিত, তাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন, এটি এখন তার জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন করে তুলেছে।’

অর্থনৈতিক কূটনীতি:

জেসিপিওএ চুক্তির আওতায় ইরানকে তার পারমাণবিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের হার ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমিত রাখা এবং দেশটির স্থাপনাগুলোকে জাতিসংঘের কঠোর পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্প একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান এবং ইরানের ওপর মারাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও তিনি ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কোনো আগ্রহ দেখাননি।

পাকিস্তানে দুই পক্ষের বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে, যুক্তরাষ্ট্র একটি চীনা তেল শোধনাগার এবং ইরানের তেল পরিবহনকারী কয়েক ডজন শিপিং সংস্থা ও জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ইসলামাবাদ আলোচনা ভেস্তে যায়।

কোনো কোনো কূটনীতিকের মতে, যুদ্ধের আগের তুলনায় ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থান এখন যদি আরো শক্তিশালী হয়, তাহলে এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ শেষ করা ট্রাম্পের জন্য বিব্রতকর হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালানোর প্রায় এক মাস আগে, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাভোস ইকোনমিক ফোরামে বিজয়োল্লাস করেন। তিনি বর্ণনা করেন, কীভাবে নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের মুদ্রা রিয়াল পতনের মুখে পড়েছিল এবং ইরানি জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছিল।

তিনি বলেন, ‘এটাই অর্থনৈতিক কূটনীতি – কোনো গোলাগুলি ছাড়া।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঠিক যেমন ট্রাম্প আর্থিক যুদ্ধ চালাতে বাধ্য হচ্ছেন, তেমনি ইরানের নেতৃত্বেরও নগদ অর্থের প্রয়োজন।

যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকায় ইরান চড়া দামে তেল বিক্রি করে লাভবান হয়েছে। মার্কিন অবরোধ তেল বিক্রির ওপর প্রভাব ফেলছে, কিন্তু স্বল্প মেয়াদে ইরান পূর্ব এশিয়ায় জাহাজে মজুত রাখা অপরিশোধিত তেল এখনো বিক্রি করতে পারছে।

কিন্তু বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তেল বিক্রি থেকে যেকোনো মুনাফাকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলায় সৃষ্ট প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতির নিরিখে পরিমাপ করতে হবে।

এপ্রিলে ইরানের একটি বাণিজ্য বিষয়ক সংবাদপত্র জানিয়েছিল যে পুনর্গঠনে অন্তত ১২ বছর সময় লাগবে।

পরমাণু ইস্যু হলো বেটাম্যাক্স:

ইরান পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা মার্কিন প্রতিনিধিদলের সাবেক সদস্য অ্যালান আয়ার এমইইকে বলেন, ‘সত্যি বলতে, পরমাণু বিষয়টি এখন ‘বেটাম্যাক্স’। তিনি বর্তমানে অপ্রচলিত ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার বেটাম্যাক্সের কথা উল্লেখ করেন।

তিনি আরো বলেন, ‘সবাই আলোচনা করছে ইরানিরা কী ছাড়তে রাজি। কিন্তু সেটা মূলত নির্ভর করে তারা কী পেতে যাচ্ছে তার ওপর। ইরানিরা যা চায় তা হলো অর্থ।’

আয়ার বলেন, চুক্তির জন্য চারটি উপায় আছে: ইরানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া, টোল আরোপের ক্ষমতার স্বীকৃতি, জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা এবং তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা। এই চারটির মধ্যে, তিনি মনে করেন হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপে ইরানের কর্তৃত্ব স্বীকার করাই হলো চুক্তির জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ।

ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত সম্পদ রয়েছে বলে জানা যায়; যা দেশটির জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান। কিন্তু এই সংখ্যা অস্পষ্ট।

কিছু নগদ অর্থ এসক্রো অ্যাকাউন্টে রাখা হয়, যেমন কাতারে ৬ বিলিয়ন ডলার, অন্যদিকে তেল বিক্রির আয় দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং ইউরোপে রাখা হয়। এপ্রিলে অ্যাক্সিওস প্রতিবেদন করেছিল যে, ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ২০ বিলিয়ন ডলার অবমুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে।

তবে আয়ার বলেন, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের অভিযোগ এবং ‘বিমান ভর্তি নগদ অর্থ’ এই কারণে, ২০২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের জব্দ অর্থ ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা কম।

ইরান নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি চাইলেও ট্রাম্পের দেওয়া যেকোনো চুক্তির ব্যাপারে তারা সতর্ক থাকতে পারে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে সরে আসায় ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

হরমুজ টোলের বিরোধিতা:

আয়ার বলেন, ‘ইরানিদের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বাজে দিকটি হলো এটি আবার দেওয়া যায়। তারা ঠিক এটাই ভয় পায় – এমন কিছুর জন্য নিজেদের অমূল্য সম্পদ বিলিয়ে দেওয়া, যা আবার কেড়ে নেওয়া হতে পারে।’

হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন মিশ্র সংকেত দিয়েছে। প্রথমে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এই আয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ দুই দেশ ভাগ করে নিতে পারে, কিন্তু প্রশাসন পরবর্তীতে সেই অবস্থান থেকে সরে আসে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফক্স নিউজকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে দেবে না।

একজন জ্যেষ্ঠ আরব কূটনীতিক এমইইকে বলেন, টোল আরোপের বিষয়ে ওয়াশিংটনের প্রাথমিক মনোভাব আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং কুয়েতের তীব্র বাধার মুখে পড়ে। তারা ইরানকে এই জলপথের দ্বাররক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ।

আরব কূটনীতিক বলেন, ইরান জানে যে যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, তার প্রতিবেশীরা শেষ পর্যন্ত হরমুজকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য পাইপলাইন তৈরি করবে। উদাহরণস্বরূপ, ইরাক ইতোমধ্যেই ট্রাকযোগে সিরিয়ার উপকূলে তেল পাঠাচ্ছে এবং তুরস্কের সঙ্গে তার পাইপলাইনের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতেই হবে:

কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী সহ-সভাপতি ত্রিতা পারসি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ইরান নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার জন্য দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে টোল আদায়কে ব্যবহার করছে।

পারসি বলেন, ‘আমার মনে হয় না যে টোল আদায় থেকে পাওয়া অর্থ নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার মাধ্যমে পাওয়া অর্থের কাছাকাছিও হবে। ইরানিরা এই আলোচনাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে। এর অর্থ হলো সকল নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।’

ভার্জিনিয়া টেকের ইরানের অর্থনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ জাভাদ সালেহি-ইসফাহানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির আর্থিক দিকগুলো ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইসফাহানি বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে ইরানের অভ্যন্তরে জনগণের চোখে এই সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। কিন্তু এই যুদ্ধ শেষ হলে, যে ত্যাগ স্বীকার করা হয়েছে তার ফল জনগণের জন্য আরো লাভজনক কিছুতে পরিণত করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ইরানের শুধু তেল রপ্তানির সক্ষমতা থাকলেই চলবে না, আন্তর্জাতিক বাজারে কেনাবেচার সক্ষমতাও থাকতে হবে। তাদের উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। ইরানকে একটি স্বাভাবিক অর্থনীতিতে পরিণত করার মাধ্যমেই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে।’

তার বিশ্বাস মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যবসার সুযোগের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা শিথিল করাকে তার সমর্থকদের কাছে একটি বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের পর এটিই হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত হওয়া সবচেয়ে বড় বাজার’। তবে তিনি আরো বলেন, এটি একটি কঠিন লড়াই। কারণ ট্রাম্প যদি নিষেধাজ্ঞা শিলিথ করতেও চান, তা ইসরাইলের তীব্র বিরোধীতার মুখে পড়বে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন