যুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক চাপের মুখে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রাথমিক যুদ্ধ-সমাপ্তিকারী সম্ভাব্য চুক্তিকে নিজেদের কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে ইরান। ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, আলোচনায় তেহরানকে কোনো বড় ধরনের ছাড় দিতে হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকেই আলোচনার পথে আসতে হয়েছে। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক ভাস্কর্যের ছবি পোস্ট করেন, যেখানে রোমান সাম্রাজ্যের এক সম্রাট সাসানীয় সাম্রাজ্যের এক রাজার সামনে নতজানু হয়ে আত্মসমর্পণ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি লেখেন, রোমানদের মনে, রোম ছিল বিশ্বের অবিসংবাদিত কেন্দ্র। ইরানিরা সেই বিভ্রম ভেঙে দিয়েছিল।
রোববার একজন সিনিয়র আমেরিকান কর্মকর্তা জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি প্রাথমিক চুক্তিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। চুক্তিটির আওতায় হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিষ্পত্তিকরণ থাকছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। তবে চুক্তিটি এখনো ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনির অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
চুক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ—পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এখন পর্যন্ত ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বা শীর্ষ নেতারা সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে কোনো প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি।
তবে ইরান আলোচনায় ঠিক কতটা সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছেছে, তা চূড়ান্তভাবে বোঝা যাবে চুক্তির শর্ত প্রকাশের পর। আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, ফলাফলকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরার যথেষ্ট সুযোগ তেহরানের রয়েছে।
মাত্র দুই মাস আগেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত তেহরানের দীর্ঘদিনের অবস্থানই মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ‘ইরান নিউক্লিয়ার মনিটর’-এর বিশ্লেষক ও লেখক এলি গেরানমায়েহ বলেন, ‘নিজেদের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সমর্থকদের কাছে তারা প্রমাণ করেছে যে, তারা দুর্বল পক্ষ হয়েও দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মোকাবিলা করতে সক্ষম।’
তিনি আরো বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার কারণে তারা আগের তুলনায় আরো শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক অবস্থানে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তারা দেখিয়েছে, ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের পারমাণবিক সংকট সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সমাধান করা সম্ভব নয়।’
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লক্ষ্যগুলো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। দেখা গেল, ইরানের শীর্ষ নেতা ও সামরিক কমান্ডারদের হত্যার পরও দেশটির শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। এছাড়া সম্ভাব্য প্রাথমিক চুক্তিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্র মিলিশিয়াদের বিষয়ে কোনো শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সমৃদ্ধ ইউরোনিয়াম নিয়েও স্পষ্ট কোনো বক্তব্য আসেনি।
আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম আমওয়াজ মিডিয়ার সম্পাদক ও বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলী শাবানি বলেন, ‘কিছু দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য বিজয় দাবি করা সহজ, কারণ বিজয়ের সংজ্ঞাগুলো খুবই একপেশে।’ তার মতে, ইরানের নতুন নেতৃত্ব দেখিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে গিয়েও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে না গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
শাবানির মতে, বহু বছর ধরে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ওয়াশিংটনের মুখোমুখি হতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে চলমান যুদ্ধে ইরানের নতুন নেতৃত্ব এমন এক আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করেছে, যা খামেনি বরাবরই উপেক্ষা করতেন। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যদিও এতে নিজেদের জাহাজ চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি তারা উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোতেও হামলা চালায়—যারা আমেরিকার ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্র এবং যাদের সঙ্গে তেহরান আগে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছিল।
শাবানি বলেন, ইরানের নতুন নেতৃত্ব ‘আগের সেই পূর্বানুমানযোগ্য আচরণ থেকে সরে এসেছে।’
তবে এসবের মধ্যেও ইরানের সামনে থাকা গুরুতর সংকটগুলো অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
দেশটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। সামরিক ও বেসামরিক—উভয় খাতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকারখানাগুলো ব্যাপক হামলার শিকার হয়েছে। ইস্পাত কারখানা থেকে শুরু করে পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট পর্যন্ত বহু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যদি আলোচনার ফলে তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল হয় বা বিদেশে থাকা ইরানের কিছু সম্পদ অবমুক্ত করা হয়, তাহলে তেহরান সেটিকেও বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরবে।
আন্তর্জাতিক সংকট পর্যবেক্ষণ গোষ্ঠীর ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, এই সমঝোতা কেবল যুদ্ধবিরতির পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে রূপ নেবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তার ভাষায়, এটিকে শুধু আমেরিকার পরাজয় বা ইরানের বিজয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বাস্তবে এটি উভয় পক্ষের জন্যই ক্ষয়ক্ষতির পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ইন্টারনেট পরিষেবা পুনরায় চালুর নির্দেশ ইরানি প্রেসিডেন্টের
যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত দাবির কাছে নতি স্বীকার করবে না ইরান