বিভক্ত বিশ্বে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন রূপরেখা দিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী

বিভক্ত বিশ্বে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন রূপরেখা দিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী

বিভক্ত বিশ্বে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন কাঠামোর রূপরেখা তুলে ধরেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি বলেছেন, বিশ্ব এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা এক শতাব্দীতে এক বা দুবার আসে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কারণে বিশ্বব্যবস্থায় যে ‘বড় ধরনের ভাঙন’ তৈরি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের অভিন্ন স্বার্থ রক্ষায় দেশগুলোকে নতুন ধরনের সহযোগিতার পথে এগোতে হবে।

মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে গিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে কার্নি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, সামনে যে পথ রয়েছে, সেটি কেবল বর্তমান ব্যবস্থাকে ধরে রাখার জন্য ‘ইচ্ছানির্ভর বহুপাক্ষিকতা’ হতে পারে না। আবার বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার মতো ‘ঠান্ডা বাস্তবনীতি’র পথও গ্রহণযোগ্য নয়।

বিজ্ঞাপন

কার্নির প্রস্তাবিত বিকল্পকে তিনি ‘মূল্যবোধভিত্তিক বাস্তববাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, এটি একই সঙ্গে নীতিনির্ভর ও বাস্তবসম্মত একটি পদ্ধতি।

গত জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক আলোচিত ভাষণে কার্নি বিশ্বের ‘মধ্যম শক্তি’ বা মিডল পাওয়ার দেশগুলোকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে তখন এ ধরনের সহযোগিতা কীভাবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।

এবার নিউইয়র্কে কার্নি তার পরিকল্পনার কিছুটা বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, ‘পার্টনার্স ফর মাল্টিল্যাটারালিজম’ নামে একটি উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তার ভাষায়, এটি কোনো জোট বা আমলাতান্ত্রিক কাঠামো নয়; বরং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বাস্তবভিত্তিক জোট এবং সরকারের বাইরের বিভিন্ন সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আস্থা তৈরি ও দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর একটি নতুন ফোরাম।

কার্নি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে হয় পুরোপুরি সংরক্ষণ করতে হবে, নয়তো তা পরিত্যাগ করতে হবে—বিষয়টি এমন নয়। বরং বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণে নমনীয় জোট গড়ে তোলাই হতে পারে কার্যকর পথ।

তিনি বলেন, এসব জোট ভৌগোলিক অবস্থান বা দেশের আকারের ভিত্তিতে নয়, নির্দিষ্ট সমস্যা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে গঠিত হবে। কোনো দেশের সদস্যপদ স্থায়ী না-ও হতে পারে। তার মতে, এটি বহুপাক্ষিকতার বিকল্প নয়, বরং বহুপাক্ষিকতাকে কার্যকর করার একটি উপায়।

কার্নি এ ধরনের সহযোগিতার উদাহরণ হিসেবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিষয়ে কানাডা, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের যৌথ উদ্যোগ এবং সমুদ্র পরিবেশ সংরক্ষণে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কানাডার সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, এ ধরনের ছোট পরিসরের উদ্যোগগুলো পরে জাতিসংঘের মতো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গিয়ে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করা যেতে পারে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে কানাডা ও তার ঐতিহ্যগত মিত্রদের ভিন্ন মতাদর্শের দেশগুলোর সঙ্গেও বাস্তবভিত্তিকভাবে কাজ করতে হবে। তার ভাষায়, কানাডাকে নিজেদের মূল্যবোধের সঙ্গে অভিন্ন দেশগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকতে হবে, একই সঙ্গে যেসব দেশের মূল্যবোধ ভিন্ন, তাদের সঙ্গেও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

এর আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যেও কার্নি কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি নতুন চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের সময়ে কানাডার সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা আরও সুরক্ষিত করতে এ ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

কার্নির এবারের নিউইয়র্ক সফরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তার বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল না। সময়সূচির জটিলতার কারণে তিনি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেবেন না। তবে নিউইয়র্কে কয়েক দিন অবস্থান করে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। কানাডার সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, কার্নির সঙ্গে বৈঠকের জন্য এত বেশি অনুরোধ এসেছে যে তার সময়সূচিতে সবগুলো বৈঠক রাখা সম্ভব হয়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কার্নি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, যখন নিউইয়র্কে ১৬০ জন নেতা আসেন, তখন সাধারণত যাদের সঙ্গে দেখা হয় না, তাদের সঙ্গে বৈঠক করাই বেশি মূল্যবান। ট্রাম্পের জাতিসংঘের ভাষণে ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি প্রসঙ্গে কার্নি বলেন, ‘একটি যুদ্ধ চলছে এবং তিনি যুদ্ধের ভাষায় কথা বলছেন।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন