দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার পক্ষে বরাবরই জোরালো অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ২৭ অক্টোবরের ইসরাইলের নির্বাচন সামনে রেখে এবার নেতানিয়াহুকে সরাসরি সমর্থন দেওয়া এড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। জনসমর্থন কমছে নেতানিয়াহুর, আর যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেও তাকে নিয়ে মতভেদ বাড়ছে। তাহলে কি বদলে যাচ্ছে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কের সমীকরণ?
২০১৭ সালে প্রথমবার হোয়াইট হাউসে যাওয়ার পর থেকে ট্রাম্প ইসরাইলের ডানপন্থিদের বহু প্রত্যাশা পূরণ করেছেন। তার পররাষ্ট্রনীতিও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে। বিনিময়ে নেতানিয়াহু নিজেকে ইসরাইলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্কের যোগ্য ব্যবস্থাপক হিসেবে তুলে ধরেছেন। ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমালোচনা ও অসন্তোষের কিছু খবর সামনে এলেও তাতে বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তন হয়নি।
তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তার নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি জোট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছেন ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট এবং তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠার অপেক্ষায় থাকা বিরোধী জোট।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের রাজনীতিতে পরিবর্তন এবং ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কের নতুন সমীকরণ থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই প্রকাশ্য নির্লিপ্ততার ব্যাখ্যা খুঁজছেন বিশ্লেষকেরা।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক আরব সেন্টারের প্যালেস্টাইন-ইসরাইল কর্মসূচির প্রধান ইউসেফ মুনায়ার আল-জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের অতীতের অবস্থান, ডানপন্থি মিত্রদের প্রতি তার সমর্থন এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিবেচনায় নিলে এবার তার দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি লক্ষণীয়।
সম্প্রতি টাইম সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহুকে সরাসরি সমর্থন করার প্রশ্ন তিনবার এড়িয়ে যান ট্রাম্প। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইসরাইলে হামলার আগে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের পক্ষে কথা বলেন তিনি। নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকট সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তার বিরুদ্ধে খারাপ কিছু শুনিনি।’
কথার চেয়ে কাজে বেশি সমর্থন
নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন তার বক্তব্যের চেয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপে বেশি স্পষ্ট হয়েছে।
২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তর করেন। গোলান মালভূমিতে ইসরাইলের দখলকে স্বীকৃতি দেন। ২০১৫ সালের ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। পাশাপাশি, ফিলিস্তিন ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একাধিক চুক্তিতে নেতৃত্ব দেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া দ্বিতীয় মেয়াদেও ইসরাইলের প্রতি তার সমর্থন অব্যাহত থাকে। গাজায় ইসরাইলের ভয়াবহ সামরিক অভিযান চলার সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশটিতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহ করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিরুদ্ধে চাপও বাড়ান ট্রাম্প। এর মধ্যে ইরানের সঙ্গে এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়ে।
এ ছাড়া দুর্নীতির মামলায় বিচারাধীন নেতানিয়াহুকে ক্ষমা করার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। গত বছর হোয়াইট হাউসে ফেরার পর নেতানিয়াহুকে অন্তত সাতবার আতিথ্য দিয়েছেন তিনি। অন্য কোনো বিশ্বনেতাকে এতবার হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানাননি ট্রাম্প।
গাজায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের উদ্যোগে নেতানিয়াহুর বাধা দেওয়া নিয়ে দুই নেতার মধ্যে মতবিরোধের ইঙ্গিত মাঝেমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। তবে এসব মতবিরোধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ডনের ইসরাইল-ফিলিস্তিনবিষয়ক পরিচালক মাইকেল ওমের-ম্যান বলেন, দুই নেতার সম্পর্ক জনসমক্ষে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, তা তারা সতর্কভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন। ট্রাম্পের ইচ্ছাতেই তাদের মতবিরোধের কিছু তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
তবে নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে নেতানিয়াহুকে সুবিধা দিতে ট্রাম্প বড় কোনো পদক্ষেপ নেবেন না, এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।
ওমের-ম্যান আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমার মনে হয় না, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ছেড়ে দিয়েছেন। তবে তিনি বাস্তববাদীও। বিভিন্ন দেশে তার পছন্দের প্রার্থীদের নির্বাচনে জিততে ও হারতে তিনি দেখেছেন।’
তার মতে, এই নির্বাচনে ট্রাম্পের স্বার্থ হয়তো খুব বেশি জড়িত নয়। আইজেনকট নেতানিয়াহুর তুলনায় অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থি নীতি অনুসরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিশেষ করে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন তিনি।
তবে আইজেনকটের এসব প্রতিশ্রুতির লক্ষ্য মূলত ইউরোপের সরকার ও আন্তর্জাতিক জনমতের কাছে ইসরাইলের ভাবমূর্তি উন্নত করা। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক এমনিতেই বেশ অনুকূল। ফলে আইজেনকট ক্ষমতায় এলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বড় পরিবর্তন হবে না বলে মনে করেন ওমের-ম্যান।
তিনি বলেন, আইজেনকটের সরকার পশ্চিম তীরের প্রতিটি পাহাড়ের চূড়া দখলের চেষ্টা বন্ধ করতে পারে। গাজায় আরও বেশি ত্রাণ প্রবেশের সুযোগও দিতে পারে। কিন্তু ইতোমধ্যে নেওয়া পদক্ষেপগুলো উল্টে দেওয়ার সম্ভাবনা কম।
ইরান যুদ্ধ ও রিপাবলিকানদের মতভেদ
আন্তর্জাতিক সংকটবিষয়ক গবেষণা সংস্থার ইসরাইলবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মাইরাভ জোনসেইনও ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
তার মতে, নেতানিয়াহুকে প্রকাশ্যে সমর্থন করতে ট্রাম্পের অনীহার পেছনে তার প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেও ইসরাইল ও নেতানিয়াহুকে নিয়ে মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
জোনসেইন বলেন, ‘সম্ভবত এর পেছনে ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের বিভক্তি—দুটিই কাজ করছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের মতো ব্যক্তিরা ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পক্ষে নেতানিয়াহুর ভূমিকার তীব্র বিরোধিতা করেছেন।’
জনমত জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকানদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন এখনো বেশি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সমর্থন কিছুটা কমেছে। নেতানিয়াহুর ওপর আস্থাও দলটির মধ্যে হ্রাস পেয়েছে।
ইসরাইলেও ট্রাম্পের প্রভাব সম্পর্কে ধারণা বদলেছে। লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযান নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নেতানিয়াহুর সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন।
তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে ইসরাইলের অভিযান সীমিত হওয়ায় জুনে হওয়া একটি সমঝোতা স্মারক ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। ওই সমঝোতার আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান যুদ্ধ সাময়িকভাবে থেমেছিল।
ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জুনে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, ইহুদি ইসরাইলিদের মাত্র ৪৪ শতাংশ মনে করেন, ট্রাম্পের কাছে ইসরাইলের নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। মার্চে এই হার ছিল ৬১ শতাংশ। মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা শুরু করার কিছুদিন পর ওই জরিপ করা হয়েছিল।
নেতানিয়াহুর প্রচারেও বদল
জোনসেইনের মতে, এবারের নির্বাচনি প্রচারে নেতানিয়াহুর কৌশলেও পরিবর্তন এসেছে। আগের নির্বাচনের মতো ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে বিলবোর্ড দেননি তিনি। বরং ইসরাইলের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে যাদের দেখেন, তাদের সামনে এনেছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাঈম কাসেম, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান এবং নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি।
জোনসেইনের ভাষায়, নেতানিয়াহু এবার তার ‘বন্ধুদের’ বদলে ‘শত্রুদের’ সামনে তুলে ধরছেন।
দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের এই সতর্ক অবস্থান দুই নেতার সম্পর্কের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তনও তুলে ধরছে। তবে নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর পক্ষে কোনো বড় পদক্ষেপ নেন কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

