যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেস ও অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভায় কারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন স্বতন্ত্র ভোটাররা। দেশটিতে রাজনৈতিকভাবে স্বতন্ত্র পরিচয় দেওয়া ভোটারের সংখ্যা এখন রেকর্ড পর্যায়ে। প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক নিজেদের স্বতন্ত্র ভোটার হিসেবে পরিচয় দেন। তাদের সমর্থন পেতে তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—দুই প্রধান দল।
তবে ভোটারদের মধ্যে স্বতন্ত্র পরিচয়ের বিস্তার থাকলেও নির্বাচনে স্বতন্ত্র বা তৃতীয় দলের প্রার্থীদের জয় খুব কম। কয়েক প্রজন্ম ধরেই অঙ্গরাজ্যের আইনসভা, কংগ্রেস ও প্রেসিডেন্টের পদে আধিপত্য ধরে রেখেছে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান পার্টি।
মেইন অঙ্গরাজ্যের সাবেক রিপাবলিকান পার্টির চেয়ারম্যান রিক বেনেট বলেন, ‘পুরো নির্বাচনি ব্যবস্থাই ভোটারদের স্বতন্ত্র অবস্থানকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য তৈরি।’
তিনি নিজেও মেইনের গভর্নর নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। জয়ী হলে অঙ্গরাজ্যটির ইতিহাসে তৃতীয় স্বতন্ত্র গভর্নর হবেন তিনি।
বেনেটের প্রার্থিতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির একটি বড় বৈপরীত্য সামনে এনেছে। লাখ লাখ ভোটার ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান পরিচয় প্রত্যাখ্যান করলেও তাদের তুলনায় অনেক কম ভোটার স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোট দেন।
রাজনীতিবিজ্ঞানী এ জে সিমন্স বলেন, কয়েক দশক ধরে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দলের বাইরে থাকা প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেতে লড়াই করছেন। তবে তার মতে, ২০২৬ সাল সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য অন্যতম শক্তিশালী নির্বাচনী বছর হতে যাচ্ছে।
স্বতন্ত্র ভোটার কারা, ভোট দেবেন কাকে
পিউ রিসার্চ সেন্টারের বার্ষিক ন্যাশনাল পাবলিক ওপিনিয়ন রেফারেন্স সার্ভে অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নিজেদের রাজনৈতিকভাবে স্বতন্ত্র মনে করেন। ডেমোক্র্যাট পরিচয় দেন ২৯ শতাংশ এবং রিপাবলিকান ২৮ শতাংশ।
তবে এখানে একটি বিষয় রয়েছে। নিজেদের স্বতন্ত্র বললেও তাদের বেশির ভাগের ঝোঁক দুই প্রধান দলের যেকোনো একটির দিকে। কোনো দলের প্রতি একেবারেই পক্ষপাত নেই—এমন প্রকৃত স্বতন্ত্র ভোটার মোট ভোটারের মাত্র ৭ থেকে ১০ শতাংশ।
নির্বাচনে এই ভোটারদের গুরুত্ব বেশি। কারণ, তারা প্রার্থীদের বক্তব্য ও অবস্থানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন। বিভক্ত ও দলীয় মেরুকরণে জর্জরিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তারাই মূলত ‘সুইং ভোট’ বা দোদুল্যমান ভোটার হিসেবে বিবেচিত হন।
জরিপ সংস্থা মারিস্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—এমন স্বতন্ত্র ভোটারদের ৫২ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করছেন। রিপাবলিকানদের পক্ষে রয়েছেন ৩৯ শতাংশ।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষও এবারের নির্বাচনি পরিবেশে প্রভাব ফেলছে। স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে যারা ভোট দিচ্ছেন, তাদের ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার কথা বলার প্রবণতা অন্যদের তুলনায় তিন গুণের বেশি। তাদের ২৮ শতাংশ বলেছেন, তারা পরিবর্তনের জন্য ভোট দিচ্ছেন।
কেন দুই দলের আধিপত্য
যুক্তরাষ্ট্রে আইন করে নির্বাচনে দুই দলের অংশগ্রহণ সীমাবদ্ধ করা হয়নি। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক জনপ্রতিনিধি কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তবে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল এবং অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের নির্বাচনে প্রচলিত পদ্ধতি স্বতন্ত্র ও ছোট দলের প্রার্থীদের জন্য বাধা তৈরি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে সাধারণত যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই জয়ী হন। কংগ্রেসের প্রতিটি আসনে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। ফলে ছোট দলের প্রার্থীরা কোনো আসনে উল্লেখযোগ্য ভোট পেলেও তা আসন জয়ের জন্য যথেষ্ট হয় না। কারণ, তাদের সমর্থন সাধারণত একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় কেন্দ্রীভূত থাকে না।
ভোটারদের আচরণও দুই দলের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে। জরিপ ও তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, স্বতন্ত্র পরিচয় দেওয়া বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পছন্দ করা অনেক ভোটার শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান দলের এমন প্রার্থীকে ভোট দেন, যার জয়ের সম্ভাবনা বেশি বলে তারা মনে করেন। ভোট ভাগ হয়ে দুই প্রধান দলের কোনো একটির প্রার্থীকে হারানোর আশঙ্কা থেকেও তারা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন করতে চান না।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রধান বাধা অর্থ
তৃতীয় দলের প্রার্থীদের নিয়ে গবেষণা করেন ভালদোস্তা স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতিবিজ্ঞানী বার্নার্ড তামাস। তার মতে, তৃতীয় দলের প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথে আইনি বাধাকে প্রায়ই দায়ী করা হয়। কিন্তু এসব আইনি বাধা তাদের প্রার্থিতাকে দুর্বল করছে—এমন প্রমাণ খুব কম।
তামাসের মতে, প্রকৃত বাধা হলো অর্থ। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফেডারেল পর্যায়ের নির্বাচনে মোট ১৪৮০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনেই ব্যয় ১১৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনি প্রচারে ডেমোক্রেটিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি প্রায় ২৫ কোটি ২৩ লাখ ডলার সংগ্রহ করেছে। অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি পেয়েছে প্রায় ৩৪ কোটি ১০ লাখ ডলার।
তামাস বলেন, অন্য অনেক গণতান্ত্রিক দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সরকারি সহায়তা বা অর্থায়নের ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। নির্বাচনি প্রচারের ব্যয়ের ওপরও কোনো সীমা নেই। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা খুব কম অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন। ভোটারদের কাছেও তারা তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত থাকেন।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ লেসলি শেড আলজাজিরাকে বলেন, স্বতন্ত্র পরিচয় দেওয়া ভোটারের সংখ্যা বাড়লেও তাদের অনেকেই আসলে দুই প্রধান দলের কোনো একটির সমর্থক।
তার ভাষায়, কেউ নিজেকে স্বতন্ত্র বললেও তিনি আসলে রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট হতে পারেন। তবে দলের সব বিষয়ে একমত নন। আবার কেউ কেউ ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ বলে পরিচিত হতে চান না।
রাজনীতিবিজ্ঞানী এ জে সিমন্স বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আসল পরীক্ষা হলো আমেরিকানদের তাদের ভোট দিতে রাজি করানো। শুধু প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে ভোট পেলেই চলবে না। কারণ, ভোটারদের অনেকেই মনে করেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দিলে তাদের ভোট নষ্ট হতে পারে। তাদের চোখে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রার্থীরা সাধারণত ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান দলের।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সহায়তায় অবশ্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাবেক ডেমোক্র্যাট ও বর্তমানে স্বতন্ত্র সিনেটর জো মানচিন গত জুলাইয়ে ‘ইন্ডিপেনডেন্ট লিডারশিপ কাউন্সিল’ গঠন করেন। সংগঠনটি স্বতন্ত্র কংগ্রেস প্রার্থীদের অর্থদাতা ও নির্বাচনি প্রচারের প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করে। এ পর্যন্ত সংগঠনটি ১ কোটি ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ মেয়াদে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সামনে বড় পরীক্ষা হলো একাধিক আসন ও একাধিক নির্বাচনে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সক্ষমতা ধরে রাখা।
এবারের নির্বাচনে প্রভাব কোথায়
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে একজন এবং সিনেটে দুজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন। কোনো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদে স্বতন্ত্র কেউ নেই।
মেইনের গভর্নর পদে লড়ছেন রিক বেনেট। রাজনীতিবিজ্ঞানী সিমন্সের হিসাবে, গভর্নর ও সিনেটের আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মাত্র ১১ জন স্বতন্ত্র বা তৃতীয় দলের প্রার্থী ৫ শতাংশ ভোট পাওয়ার সীমা অতিক্রম করতে পারেন। নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সক্ষমতা যাচাইয়ে প্রায়ই এই সীমা ব্যবহার করা হয়।
সিমন্স মনে করেন, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে স্বতন্ত্র কংগ্রেস প্রার্থীরা বিশেষ করে নেব্রাস্কা ও মন্টানার নির্বাচনি হিসাব পাল্টে দিতে পারেন।
নেব্রাস্কার স্বতন্ত্র সিনেট প্রার্থী ড্যান অসবর্নকে তিনি দেশজুড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে জয়ের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন। ৫১ বছর বয়সি অসবর্ন নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য। নির্বাচনি বিশ্লেষণবিষয়ক ওয়েবসাইট রিয়েলক্লিয়ারপোলিংয়ে নেব্রাস্কার সিনেট আসনের লড়াইকে হাড্ডাহাড্ডি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী সরে দাঁড়ানোর পর দলটি তার জায়গায় নতুন কাউকে মনোনয়ন দেয়নি। ফলে রিপাবলিকান প্রার্থী পিট রিকেটসের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন অসবর্ন।
মন্টানাতেও স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য সুযোগ দেখছেন সিমন্স। তবে সেখানে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অঙ্গরাজ্যটির সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি ও সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য শেঠ বডনার সিনেট আসনে রিপাবলিকান প্রার্থী কার্ট আলমের বিরুদ্ধে লড়ছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সহায়তাকারী ইন্ডিপেনডেন্ট লিডারশিপ কাউন্সিল তাকে সমর্থন দিচ্ছে।
একই সংগঠন ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেস সদস্য কেভিন কিলিকেও সমর্থন দিচ্ছে। রিপাবলিকান পার্টি ছেড়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পুনর্নির্বাচনে লড়ছেন।
মন্টানায় ডেমোক্রেটিক সিনেট প্রার্থী আলানি ব্যাংকহেডও রয়েছেন। বডনারের মতো তিনিও মধ্য-বামপন্থি ও রিপাবলিকানবিরোধী ভোটারদের সমর্থন পেতে পারেন। এতে একই ধরনের ভোটারদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে তিন প্রার্থীর লড়াইয়ে রিপাবলিকান প্রার্থী সুবিধা পেতে পারেন।
সিমন্স বলেন, ‘মন্টানা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।’ এমনটি ঘটলে রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাতটি অত্যন্ত খারাপ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আইডাহো ও সাউথ ডাকোটায় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তবে তাদের কারণে রিপাবলিকানদের নিরাপদ বলে বিবেচিত আসনগুলোতেও প্রচারে অর্থ, সময় ও মনোযোগ দিতে হতে পারে। আগে যেসব আসনকে রিপাবলিকানরা নিশ্চিত বলে ধরে নিতে পারতেন, সেগুলো রক্ষায় বাড়তি প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
তবে সিমন্সের মতে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সবচেয়ে বড় প্রভাব সব সময় নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অতীতে তারা ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই প্রধান দলকেই নতুন নীতি গ্রহণ করতে বা আরো কার্যকরভাবে সরকার পরিচালনা করতে চাপ দিয়েছেন।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

