হ্যাশট্যাগ ‘আলপাইন ডিভোর্স’: জনপ্রিয়তার নেপথ্যে কী

আমার দেশ অনলাইন

হ্যাশট্যাগ ‘আলপাইন ডিভোর্স’: জনপ্রিয়তার নেপথ্যে কী

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোতে ‘আলপাইন ডিভোর্স’ হ্যাশট্যাগটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এতে অনেক নারী তাদের মর্মান্তিক, এমনকি জীবন হুমকির মধ্যে পড়ার মতো অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করছেন।

এই শব্দ দিয়ে হাইকিং বা অন্য কোনো আউটডোর অ্যাডভেঞ্চারের সময় ঘটে যাওয়া ঘটনাকে বোঝানো হয়, যখন পুরুষ তার কম অভিজ্ঞ ও অসহায় সহযাত্রী বা বন্ধুকে কোনো প্রত্যন্ত ও বিপজ্জনক পরিবেশে পরিত্যাগ করে চলে যায়।

বিজ্ঞাপন

এই আলোচনার কারণ হলো চলতি বছরের শুরুতে অস্ট্রিয়ার একটি বহুল আলোচিত ঘটনা। একজন পর্বতারোহী হত্যাকাণ্ডের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। তিনি দেশের সর্বোচ্চ পর্বত গ্রসগ্লকনারে তার প্রেমিকাকে একা ফেলে রেখে যান। তবে ওই ব্যক্তির দাবি, তিনি সাহায্য চাইতে ছুটে গিয়েছিলেন। পরে ঠান্ডায় জমে তার প্রেমিকার মৃত্যু হয়।

প্রসিকিউটররা টমাস পি. নামের ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, ফোনে সিগন্যাল থাকা সত্ত্বেও তিনি উদ্ধারকারী দলের ডাকে সাড়া দেননি এবং সময়মতো বিপদ সংকেত পাঠাতে ব্যর্থ হন। জার্মানির বিল্ড সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিচার চলাকালীন তার সাবেক এক প্রেমিকা সাক্ষ্য দেন যে, ২০২৩ সালে তিনি তাকেও একই পর্বতে পরিত্যাগ করেছিলেন।

বিচার চলাকালীন নারীরা অনলাইনে তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করছিলেন। টিকটকে একটি ক্লিপে এক নারী লিখেছেন, ‘আপনি তার সঙ্গে পাহাড়ে হাইকিং করতে যান, কিন্তু তিনি আপনাকে একা ফেলে চলে যায় এবং আপনি পরে বুঝতে পারেন, তিনি আপনাকে কখনই পছন্দ করতেন না।’

সামাজিকমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে আরেকজন নারী নির্জন প্রান্তরে একা হাঁটার একটি ভিডিও শেয়ার করে লিখেছেন, ‘এটি স্কটিশ হাইল্যান্ডসে আমার হাইকিং করার একটি ভিডিও, যেখানে আমি আমার ভ্রমণটিকে সেরা করে তোলার চেষ্টা করছিলাম। অথচ যার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল, তিনি আমার থেকে বহু দূর এগিয়ে ছিলেন।’ ক্লিপটি ১৯ লাখ ভিউ পায়।

স্কটিশ-কানাডিয়ান লেখক রবার্ট বারের ১৮৯৩ সালের একটি ছোটগল্পে এই শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়, যেখানে এক স্বামী সুইস আল্পসে তার স্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। ‘আলপাইন ডিভোর্স’ শব্দটি আইনগত বা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত নয়। তবে, মনোবিজ্ঞানী জো হেমিংস সিএনএনকে বলেছেন, ‘অপরাধীরা সাধারণত পরিহারমূলক আসক্তি শৈলীর অধিকারী হন। যারা চাপের মধ্যে থাকলে মূল সমস্যার সমাধান না করে বরং আবেগগত ও শারীরিকভাবে অন্যদের থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেন।’

যদিও ‘আলপাইন ডিভোর্স’ সাধারণ অভিজ্ঞতা নাও হতে পারে, হেমিংস বিশ্বাস করেন যে এর অন্তর্নিহিত ধারণাটি অনেক নারীর কাছেই পরিচিত হবে। ‘পাহাড়ি পরিবেশের কারণে নয়, বরং সম্পর্কের মধ্যে আবেগগতভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা এমনকি পরিত্যক্ত হওয়া তুলনামূলকভাবে সাধারণ ঘটনা।’

‘আমার সাহায্য দরকার ছিল’

যদিও এই শব্দটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোমান্টিক সঙ্গীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, তবে এটি এমন ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে, যখন কোনো নারীকে ছেড়ে চলে যায় তার বাবা, ভাই, পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং বন্ধু।

ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা ও পর্বতারোহী লরি সিঙ্গার জানান, দীর্ঘদিনের পুরুষ বন্ধু তার সঙ্গে প্রতারণা করেন। তিনি জানান, পর্বতারোহণের সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েন যা তাকে তার জীবন নিয়ে শঙ্কিত করে তোলে।

Singer

সিঙ্গার জানান, ২০১৬ সালে ৫৬ বছর বয়সে তিনি তার পুরুষ বন্ধু ও সহযাত্রীর সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাডা পর্বতমালায় বিস্তৃত জন মুইর ট্রেইলে যাত্রা শুরু করেন। এই ট্রেইলটি ২২২ মাইল দীর্ঘ এবং একজন সাধারণ পর্বতারোহীর এটি শেষ করতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে।

সিঙ্গারের মতে, তার বন্ধুটি আগেও এই ট্রেকটি করেছিলেন এবং তার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ ছিলেন এবং তিনিই তাকে রাজি করিয়েছিলেন।

অভিযান শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সিঙ্গার অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন। পরে তিনি বুঝতে পারেন যে এটি ছিল উচ্চতাজনিত অসুস্থতা। তা সত্ত্বেও, তার বন্ধু নিজের হাঁটার গতি কমায়নি।

তিনি সিএনএনকে বলেন, ‘তিনি আমাকে রেখে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এবং উচ্চতাজনিত অসুস্থতার কারণে আমি তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলাম না।’

সিঙ্গার আরো জানান, ‘এক রাতে আমরা গভীর রাত পর্যন্ত হাইকিং করছিলাম। তিনি আমার থেকে এতটাই এগিয়ে ছিলেন যে আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম… আমি তার নাম ধরে চিৎকার করছিলাম… কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি।’

প্রায় এক ঘণ্টা আলাদা থাকার পর, সিঙ্গার অবশেষে তার বন্ধুর নাগাল পান। তার বন্ধু তাকে বলেছিলেন, তিনি কতটা টিকে থাকতে পারেন, তা পরীক্ষা করার জন্যই এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

সিঙ্গার একসময় আর হাঁটতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে তার বন্ধু তাকে ফেলে রেখে চলে যায়। সিঙ্গার বলেন, ‘আমি জানতাম না পথ কতটা দীর্ঘ, কিন্তু আমি এটা জানতাম যে আমার সাহায্য দরকার।’

পাথুরে পথে একাই যাত্রা শুরু করে সিঙ্গার ভারসাম্য রাখতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। ‘আমার প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল… আমি শুধু ভাবছিলাম, আমি আমার পরিবারের সঙ্গে আবার দেখা করতে চাই।’

প্রায় আট মাইল হাঁটার পর, তিনি অন্য হাইকারদের দেখা পান, যারা তার খারাপ অবস্থা দেখে তাকে খাবার দেন এবং পথ দেখিয়ে সাহায্য করেন। অবশেষে তিনি নিরাপদে ফিরে আসতে সক্ষম হন, কিন্তু তার সুস্থ হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগেছিল।

Singer 1

হিমিংসের মতে, ‘আলপাইন ডিভোর্স’ পূর্বপরিকল্পিত বিদ্বেষ থেকে এমনকি তাৎক্ষণিক, আবেগতাড়িত সিদ্ধান্তও হতে পারে।

তার এই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার পর সিঙ্গার সবাই পরামর্শ দেন, ‘আপনি যার সঙ্গে হাইকিং করছেন, তাকে আপনি যতই চেনেন বলে মনে করুন না কেন, সব সময় আপনাকে আত্মনির্ভরশীল থাকতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি আমার বন্ধুকে বিশ্বাস করেছিলাম… আমি ভেবেছিলাম আমি তাকে চিনি, কিন্তু স্পষ্টতই, আমি তাকে চিনতে পারিনি।’

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন