কয়েক বছরের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বিধ্বংসী ক্রান্তীয় ঝড় বা ট্রপিক্যাল স্টর্মের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে চীন ও তাইওয়ান। বৃহস্পতিবার তাইওয়ানের দক্ষিণ-পূর্বে শক্তিশালী টাইফুন ‘বাভি’ ঘনীভূত হওয়ার পর দেশ দুটি এখন সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। ঝড়ের কেন্দ্রে বাতাসের গতিবেগ এখন ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার (১২৪ মাইল)। এই পরিস্থিতি এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে যখন চীনের কিছু অংশ মাত্র কয়েকদিন আগের টাইফুন ‘মাইসাক’-এর ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
তাইওয়ানের আবহাওয়া দফতর পূর্বাভাস দিয়েছে যে, রাজধানী তাইপেইয়ের চারপাশের উত্তরের পাহাড়ি এলাকায় ১ মিটার (৩.৩ ফুট) পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। ২০২৪ সালের টাইফুন ‘কোং-রে’ (যার আঘাতে ৩ জন নিহত হয়েছিল)-এর পর এটিই দ্বীপাঞ্চলে আঘাত হানতে যাওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী টাইফুন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রায় ২৯,০০০ সেনাসদস্যকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
চীনের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, টাইফুন বাভি বর্তমানে প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যা আকারে প্রায় পুরো ফ্রান্সের সমান। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এটি তাইওয়ানের উত্তর দিক ঘেঁষে অগ্রসর হয়ে শনিবার সন্ধ্যায় চীনের পূর্বাঞ্চলীয় ফুজিয়ান প্রদেশে আঘাত হানতে পারে। তাইওয়ানের সেন্ট্রাল ওয়েদার অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের পূর্বাভাসক জেসন চ্যাং রয়টার্সকে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই আকারের ঝড় বেশ বিরল। ১৯৮৭ সালের পর এটিই হতে যাচ্ছে আকার বা আয়তনের দিক থেকে এই দ্বীপে আঘাত হানা সবচেয়ে বড় ঝড়।
চীনের উদ্ধারকর্মীরা এখনো টাইফুন মাইসাকের রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি চালাচ্ছেন। স্থানীয় কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, চলতি সপ্তাহের শুরুতে দক্ষিণ-পশ্চিমের গুয়াংশি অঞ্চলে মাইসাকের আঘাতে অন্তত ৩৯ জন নিহত হয়েছেন এবং পুরো অঞ্চলে এখনো ৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চীন, জাপান এবং তাইওয়ানের মতো দেশগুলো ক্রান্তীয় ঝড়ের মতো মারাত্মক আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। এ বছর এল নিনোর আবির্ভাবের কারণে তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ঘন ঘন এবং আরও শক্তিশালী টাইফুন তৈরিতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।
নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষ ও থমকে যাওয়া জনজীবন
তাইওয়ান:
তাইওয়ানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর নগরী সুয়াওয়ের শত শত মাছ ধরার নৌকা আসন্ন ঝড় থেকে বাঁচতে বন্দরে আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বালির বস্তার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন এবং কৃষকরা আবহাওয়া খারাপ হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে ধান কাটার কাজ শেষ করছেন। ৬০ বছর বয়সী এক মাছ ধরার নৌকার ক্যাপ্টেন চেন মিং-হুই বলেন, ‘‘এখনকার শান্ত ও সুন্দর আবহাওয়া দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। এই ধরনের ঝড়ই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে।’’
জাপান:
সুয়াও থেকে প্রায় ১১১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে জাপানের ওকিনাওয়া প্রিফেকচারে দেশটির আবহাওয়া সংস্থা বাসিন্দাদের শুক্রবার ও শনিবার প্রচণ্ড বাতাস, ভূমিধস, বন্যা এবং জলোচ্ছ্বাসের জন্য উচ্চ সতর্কতায় থাকার পরামর্শ দিয়েছে। ঝড়ের কারণে ‘জাপান এয়ারলাইন্স’ এবং ‘অল নিপ্পন এয়ারওয়েজ’ শুক্রবার ও শনিবারের জন্য ওকিনাওয়াগামী ও অভ্যন্তরীণ প্রায় শতাধিক ফ্লাইট বাতিল করেছে, যার ফলে হাজার হাজার যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
চীন:
টাইফুন মাইসাকের প্রভাবে চীনের কেন্দ্রীয় হুবেই প্রদেশে অন্তত দুটি টর্নেডো এবং ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। গুয়াংশি অঞ্চলের বন্যাদুর্গত বাসিন্দারা দ্বিতীয় তলার জানালা দিয়ে উদ্ধারকর্মীদের পিঠে চড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরছেন। দুর্গম এলাকাগুলোতে ড্রোন দিয়ে জরুরি সাহায্য পাঠানো হচ্ছে। বিনিয়াং কাউন্টির একটি খামারে বন্যায় ডুবে মারা যাওয়া শত শত শূকরের মরদেহ ভেসে উঠেছে। এছাড়া গুইগাং চিড়িয়াখানায় বন্যার পানিতে ডুবে তিনটি সিংহের মৃত্যু হয়েছে এবং জেব্রা, শজারু, টিয়া পাখিসহ প্রায় ১০০টি প্রাণী এখনো নিখোঁজ রয়েছে।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় গবেষক শিয়াংবো ফেং সতর্ক করে বলেন, ‘‘বাভি প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ জলভাগ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি ও প্রচুর জলীয় বাষ্প সঞ্চয় করেছে। এটি যখন স্থলভাগে আঘাত হানবে, তখন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিপর্যয়কর হতে পারে।’’
সূত্র: রয়টার্স
এসআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


