কিউবার ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির বর্তমান সরকারের বিকল্প হিসেবে সম্ভাব্য নেতৃত্ব খুঁজছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, হাভানার ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সমঝোতায় ব্যর্থ হলে কিউবার সরকারে পরিবর্তন আনার সম্ভাব্য পথ নিয়েও কাজ করছে ওয়াশিংটন।
তবে এটি সরাসরি ‘সরকার উৎখাতের’ পরিকল্পনার চেয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থার ভেতর থেকেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের একটি কৌশল—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তারা।
মার্কিন প্রশাসন এমন কোনো বর্তমান বা সাবেক কিউবান কর্মকর্তাকে খুঁজছে, যিনি বাস্তববাদী এবং প্রয়োজনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী আটক করার পর দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া দেলসি রদ্রিগেজের মডেল অনুসরণ করেই কিউবার জন্য সম্ভাব্য নেতৃত্ব খোঁজা হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, কিউবার পরিস্থিতি ভেনেজুয়েলার তুলনায় ইরানের সঙ্গে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। দেশটিতে এমন বাস্তববাদী কর্মকর্তা খুব কমই আছেন, যারা হঠাৎ ক্ষমতার পরিবর্তন হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারেন। বরং সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের অনেকেই কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত।
হাভানার কাছে একগুচ্ছ দাবি ওয়াশিংটনের
ট্রাম্প প্রশাসন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিউবার নেতৃত্বের কাছে একাধিক দাবি তুলে ধরেছে। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে অর্থনীতি আরো উন্মুক্ত করা, মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য কিউবার বাজার খুলে দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কেনা এবং দেশটিতে রাশিয়া ও চীনের গোয়েন্দা তৎপরতা কমানো বা বন্ধ করা।
বিনিময়ে কিউবাকে কিছু অর্থনৈতিক ও মানবিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত মানবিক সহায়তা এবং কিউবার অর্থনীতির ওপর আরোপিত কিছু মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ও থাকতে পারে।
তবে হাভানার বর্তমান সরকার এখন পর্যন্ত এসব শর্ত মেনে নেওয়ার মতো কোনো স্পষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। কিউবা সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতের জন্য কিছু সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও, সেগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশার তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প নেতৃত্ব খোঁজার তৎপরতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সম্ভাব্য উত্তরসূরি কারা?
কিউবার ক্ষমতাসীন মহল ফিদেল কাস্ত্রোর পরিবারের সদস্য অস্কার পেরেজ-অলিভা ফ্রাগাকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে সামনে আনছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও সরকারি প্রচারে তার উপস্থিতি বেড়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকেও তিনি বিরল এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য হবেন কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে, রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল গঞ্জালেস রদ্রিগেজ কাস্ত্রো যিনি ‘রাউলিতো’ বা ‘এল কাঁকরেরো’ নামে পরিচিত মার্কিন প্রশাসনের কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি দীর্ঘদিন রাউল কাস্ত্রোর দেহরক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি পদে ছিলেন না। কিউবার বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাজারো আলবের্তো আলভারেজ কাসাসের নামও সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক জন র্যাটক্লিফ চলতি বছর কিউবা সফরের সময় রাউল গঞ্জালেস রদ্রিগেজ কাস্ত্রো ও আলভারেজ কাসাস—দুজনের সঙ্গেই বৈঠক করেছিলেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কিউবা নিয়ে সিআইএর বিশেষ টাস্কফোর্স
কিউবা ইস্যুতে সিআইএ গোপনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে। এর মাধ্যমে কিউবার সরকারের ওপর আরও সমন্বিত চাপ প্রয়োগের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর কার্যত অবরোধসদৃশ চাপ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে দ্বীপদেশটির জ্বালানি সরবরাহ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। তবে কিউবার নেতৃত্ব পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্র কতটা দূর যেতে প্রস্তুত, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র প্রকাশ করেছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে অভিযোগপত্রকে যেভাবে তাকে আটক করার অভিযানের আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটিও কিউবার ক্ষেত্রে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তবে দুই দেশের পরিস্থিতিতে বড় পার্থক্য রয়েছে। মাদুরো ছিলেন ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট। তাকে আটক করার পর দেশটির তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ক্ষমতা গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। বিপরীতে ৯৫ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রো বর্তমানে কোনো সরকারি পদে নেই। ফলে তাকে আটক বা গ্রেপ্তার করলেই কিউবার নেতৃত্বে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন আসবে না।
সম্ভাব্য মার্কিন অভিযানের আশঙ্কায় প্রতিরক্ষা জোরদার
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, মাদুরোকে আটক করার অভিযানের পর থেকে কিউবা সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
বিশেষ করে রাউল কাস্ত্রো কিংবা বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেলকে আটক বা হত্যার উদ্দেশ্যে কোনো অভিযান চালানো হলে সেটি কঠিন করে তুলতে দেশটি বিভিন্ন প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানা গেছে।
কিউবা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে ওয়াশিংটনের একদিকে আলোচনার মাধ্যমে হাভানাকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে রাজি করানোর চেষ্টা, অন্যদিকে বিকল্প নেতৃত্বের সন্ধান—দুই ধরনের তৎপরতাই একসঙ্গে চলছে।
মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সঙ্গে ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করতে প্রস্তুত। তবে তার দাবি, হাভানার বর্তমান সরকারই দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিউবার বর্তমান নেতৃত্ব যদি ওয়াশিংটনের দাবিগুলো মেনে নিতে রাজি না হয়, তাহলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে—তা এখনো অনিশ্চিত। তবে কিউবায় নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাব্য পথ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তাতে দ্বীপদেশটির রাজনৈতিক সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


