কানাডাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য না করেও এমন একটি বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছে, যাতে দেশটি কার্যত ইইউর সদস্য রাষ্ট্রের মতো গভীরভাবে যুক্ত থাকতে পারে। ইউরোপিয়ান পলিসি সেন্টারের প্রধান নির্বাহী ফ্যাবিয়ান জুলিগ সম্প্রতি প্রকাশিত এক নিবন্ধে ‘ইন্টিগ্রেটেড পার্টনারশিপ’ নামে এমন একটি নতুন কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছেন।
ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চাওয়া দেশগুলোর সামনে বর্তমানে মূলত দুটি পথ রয়েছে—পূর্ণ সদস্যপদ গ্রহণ অথবা বাইরে থাকা। কিন্তু এ দুই বিকল্পের মাঝামাঝি আরো গভীর ও নমনীয় একটি সম্পর্কের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। শুধু বাণিজ্য বা একক বাজারে প্রবেশাধিকারকে কেন্দ্র করে নয়; বরং প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিকেও এর আওতায় আনা দরকার।
এই নতুন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হবে ভৌগোলিক অবস্থান নয়, বরং অভিন্ন রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। ইইউর সদস্য হতে আগ্রহী না হলেও কোনো দেশ ‘ইন্টিগ্রেটেড পার্টনার’ হতে পারবে। আইসল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও নরওয়ের পাশাপাশি কানাডা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও সম্ভাব্য অংশীদার।
এই অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নির্দিষ্ট নীতিক্ষেত্রে ইইউর সঙ্গে নিজেদের সার্বভৌম ক্ষমতার কিছু অংশ সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করতে পারে। সময়ের সঙ্গে সম্পর্কটি এমন পর্যায়ে যেতে পারে, যা অনেকটা ‘কোয়াসি-মেম্বারশিপ’ বা কার্যত সদস্যপদের কাছাকাছি হবে। তবে এর বিনিময়ে অংশীদার দেশগুলোকেও ইইউর নীতিগত সুবিধার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব ও ব্যয় বহন করতে হবে।
একই সঙ্গে ইইউর বর্তমান সদস্যপদপ্রত্যাশী দেশগুলোর বিষয়েও সতর্ক করেছেন। বর্তমানে পূর্ণ সদস্যপদের জন্য অপেক্ষমাণ দেশের সংখ্যা ৯। রাজনৈতিক প্রতিরোধ, অভ্যন্তরীণ সংস্কার, বাজেট ও সদস্যপদ আলোচনার জটিলতার কারণে তাদের কয়েকটি দেশকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। ইউক্রেন ও পশ্চিম বলকানের দেশগুলোর জন্য নতুন অংশীদারত্ব ব্যবস্থা একটি অন্তর্বর্তী সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে এটি যেন সদস্যপদের বিকল্প হয়ে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
এই ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার প্রধান শর্ত হিসেবে ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি প্রকৃত অভিন্নতা’র কথা উল্লেখযোগ্য। উদার গণতন্ত্র, আইনের শাসন, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার থাকতে হবে অংশীদার দেশগুলোর।
কানাডা এই নতুন ব্যবস্থার অন্যতম প্রথম প্রার্থী। আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় ইইউ-কানাডা শীর্ষ সম্মেলনকে শুধু প্রচলিত সহযোগিতার তালিকায় সীমাবদ্ধ না রেখে কানাডার জন্য একটি বিশেষ মর্যাদা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও ইইউর সঙ্গে একটি ‘ইউনিক অ্যালায়েন্স’ বা অনন্য জোট গঠনের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
বিশ্বব্যবস্থায় কর্তৃত্ববাদী শক্তির চাপ বাড়ছে এবং মধ্যম শক্তির দেশগুলো একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ অবস্থায় অভিন্ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দেশগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। ‘ইন্টিগ্রেটেড পার্টনারশিপ’ এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে, যেখানে এসব দেশ নিজেদের সম্মিলিত শক্তি ব্যবহার করতে পারবে।
তবে ইইউর ভবিষ্যৎ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঝুঁকি রয়েছে। ভবিষ্যতে ইইউর কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশে উদার গণতন্ত্র ও ইউরোপীয় একীকরণের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইইউর সদস্য দেশ ও ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের নিয়ে একটি বিস্তৃত গণতান্ত্রিক নেটওয়ার্ক সম্মিলিত পদক্ষেপ বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
গভীর আন্তর্জাতিক সংহতির একমাত্র পথ পূর্ণ ইইউ সদস্যপদ হওয়া উচিত নয়। কোনো নির্দিষ্ট চূড়ান্ত সদস্যপদের প্রতিশ্রুতি ছাড়াই সর্বোচ্চ পর্যায়ের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত একীভূতকরণের সুযোগ থাকবে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইউরোপের জন্য ভৌগোলিক সীমার চেয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে কারা একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

