যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এবার রেকর্ডসংখ্যক মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। প্রাথমিক ফল অনুযায়ী কংগ্রেস, রাজ্য আইনসভা ও স্থানীয় পর্যায়ে অন্তত ৩৬ জন মুসলিম প্রার্থী জয় পেয়েছেন। এছাড়া এবারের ভোটে রেকর্ডসংখ্যক হিজাব পরিহিত নারী নির্বাচিত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের এই বিস্তার মার্কিন রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াবে। একই সঙ্গে দেশটিতে ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলায়ও ভূমিকা রাখবে।
প্রাথমিক ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, কংগ্রেসে জয় পেয়েছেন আটজন মুসলিম প্রার্থী—তাদের মধ্যে একজন সিনেটর এবং বাকি সাতজন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য। এছাড়া বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় বেশ কয়েকজন মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন অথবা এগিয়ে রয়েছেন। বিচার বিভাগ ও কাউন্টি পর্যায়ে জয় পেয়েছেন আরো দুই প্রার্থী। খবর রয়টার্স, আনাদোলু এজেন্সি ও মুসলিম নেটওয়ার্ক টিভির।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা মিশিগানে আবদুল আল-সাইয়েদের সিনেটর নির্বাচিত হওয়া। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে তিনি রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেটর নির্বাচিত হলেন মিসরীয় বংশোদ্ভূত এই রাজনীতিক।
প্রতিনিধি পরিষদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন মিনেসোটার ইলহান ওমর, মিশিগানের রাশিদা তালাইব, ইন্ডিয়ানার আন্দ্রে কারসন এবং ক্যালিফোর্নিয়ার লতিফা সাইমন। অন্যদিকে, নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে জয় পেয়েছেন অ্যাডাম হামাউই। এর মধ্য দিয়ে তিনি অঙ্গরাজ্যটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সদস্য হলেন। নিউ ইয়র্কের ১৩তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে বিজয়ীদের তালিকায় রয়েছেন দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের।
গত আগস্টে বিশেষ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রতিনিধি পরিষদে আসা আইশা ওয়াহিব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নির্বাচনে জয় পেয়েছেন।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে অঙ্গরাজ্যগুলোয় আইনসভার নির্বাচনে বেশ কয়েকজন মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। মিশিগানের আইনসভার বিভিন্ন আসনে আব্বাস আলাউইয়েহ, আলাবাস ফারহাত ও জালাল আবদুল্লাহ এগিয়ে ছিলেন। ওহাইওর প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে নিজ নিজ আসনে জয় পেয়েছেন মুনিরা আবদুল্লাহি ও ইসমাইল মোহাম্মদ।
ইলিনয়ের অঙ্গরাজ্য সিনেটের ২৬তম ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসনটি নিজেদের দখলে নিয়েছেন নাবিলা সৈয়দ। তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত সিনেটর ডারবি হিলসকে পরাজিত করেন। অন্যদিকে, ইলিনয় প্রতিনিধি পরিষদে নিজের আসন ধরে রাখতে যাচ্ছেন আবদেলনাসের রশিদ। এছাড়া মিশিগান কোর্ট অব আপিলসের নির্বাচনে এগিয়ে রয়েছেন মারিয়াম সাদ বাজ্জি।
মিনেসোটায় অঙ্গরাজ্য আইনসভার নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ওমর ফাতেহ ও জয়নাব মোহাম্মদ। অন্যদিকে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজ নিজ আসনে জয় নিশ্চিত করেছেন মোহামুদ নুর ও সামাকাব হুসেইন।
ওরেগনে অঙ্গরাজ্য সিনেটর কেইসে জামা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজের আসন ধরে রেখেছেন। তবে ওয়াশিংটন কাউন্টির চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে নাফিসা ফাই পাম ট্রিসের চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। ওই সময় পর্যন্ত সেখানে অতিরিক্ত ব্যালট গণনা চলছিল। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের ৪৮তম ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধি পরিষদের আসনে নির্বাচনে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন ওসমান সালাহউদ্দিন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিউ ইয়র্কের অঙ্গরাজ্য সিনেটের ১২তম ডিস্ট্রিক্টে জয়ী হয়েছেন আবের কাওয়াস। অন্যদিকে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজের আসন ধরে রেখেছেন বর্তমান সিনেটর রবার্ট জ্যাকসন।
কানেকটিকাটের আইনপ্রণেতা মেরিয়াম খান ও সৌদ আনোয়ারও নিজ নিজ অঙ্গরাজ্য সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। তবে অঙ্গরাজ্যটির চতুর্থ সিনেট ডিস্ট্রিক্টে পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে থাকা এমডি রহমানের ফল তখনো পাওয়া যায়নি। এদিকে, ডেলাওয়্যারে মদিনাহ উইলসন-অ্যান্টন এবং পেনসিলভানিয়ায় তারিক খান নিজ নিজ আইনসভা আসন ধরে রেখেছেন।
দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতেও মুসলিম প্রার্থীদের সাফল্য দেখা গেছে। জর্জিয়ার সপ্তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টে জয় পেয়েছেন রুয়া রোমান। একই অঙ্গরাজ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন শেখ রহমান। রিপাবলিকানদের দখলে চলে যাওয়া নিজের পুরোনো আসন পুনরুদ্ধার করেছেন ফারুক মুগল।
টেক্সাসে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন সালমান ভোজানি ও সুলেমান লালানি। হ্যারিস কাউন্টির বিচারক পদে জয় পেয়েছেন লেটিশিয়া প্লামার। এর মধ্য দিয়ে তিনি টেক্সাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্বাচিত মুসলিম নারী জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। নর্থ ক্যারোলাইনায় নিজের আসন ধরে রেখেছেন স্টেট সিনেটর মুজতবা মোহাম্মদ। অন্যদিকে, কলোরাডোর ২৯তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ইমান জোদেহ। টেনেসিতে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ইউসুফ হাকিম।
তবে সব মুসলিম প্রার্থী জয় পাননি। ফ্লোরিডার ১০৩তম হাউস ডিস্ট্রিক্টে হেরেছেন ইমতিয়াজ মোহাম্মদ। মিনেসোটার হেনেপিন কাউন্টি কমিশনার নির্বাচনে শ্যারন এল-আমিনও বর্তমান কমিশনার আইরিন ফার্নান্দোর চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। এছাড়া কয়েকটি নির্বাচনি এলাকায় ভোট গণনা চলায় ফলাফল এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
রেকর্ডসংখ্যক হিজাবি নারীর জয়
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এবার রেকর্ডসংখ্যক হিজাব পরিহিত নারী জয়ী হয়েছেন। চার নারী অঙ্গরাজ্য সিনেটর এবং একজন কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দেশটির নির্বাচনি ইতিহাসে এমন ঘটনা নজিরবিহীন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ও হুমকি বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হিজাব পরিহিত নারীদের এই জয় বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
ইলহান ওমর ছাড়াও এই দলে রয়েছেন নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্য সিনেট সদস্য আবের কাওয়াস, কলোরাডোর ইমান জোদেহ, জর্জিয়ার রুয়া রোমান এবং ইলিনয় রাজ্যের সিনেট সদস্য নাবিলা সৈয়দ।
গণমাধ্যম, রিপাবলিকান নেতা ও অনলাইনে ট্রলকারিরা তাদের বিদ্রুপ করেছে। গত সপ্তাহে মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল (এমপ্যাক) যুক্তরাষ্ট্রে উগ্র ডানপন্থি ও ইসলামবিদ্বেষী উসকানিদাতাদের তৎপরতা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানায়। সংস্থাটির আশঙ্কা, এ ধরনের তৎপরতা মুসলিম আমেরিকানদের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে। এর মধ্যেই হিজাব পরিহিত কয়েকজন তরুণী নির্বাচিত পদে জয়ী হয়ে নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছেন।
মার্কিন রাজনীতিতে বাড়ছে মুসলিমদের অংশগ্রহণ
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিমদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বিষয়টি এবারের নির্বাচনে বিশেষভাবে সামনে এসেছে। কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের (সিএআইআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনে স্থানীয়, অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ১৬০ জনের বেশি মুসলিম প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ২০২২ সালের নির্বাচনে এ সংখ্যা ছিল ১৪৫।
অর্থাৎ, আগের নির্বাচনের তুলনায় এবার মুসলিম প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। শুধু প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধিই নয়, গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাদের জয়ও মার্কিন রাজনীতিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

