মুরসি পরবর্তী মিসরকে কেমন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ছেন আল-সিসি

মুরসি পরবর্তী মিসরকে কেমন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ছেন আল-সিসি

মিসরের সাম্প্রতিক ইতিহাসে মোহাম্মদ মুরসি ও আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি কেবল দুই শাসকের নাম নন; তারা দেশটির রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন-দর্শনের দুটি ভিন্ন অধ্যায়ের প্রতীক। ২০১২ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা মুরসি মিসরকে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক পরিচয় ও নির্বাচনী বৈধতার ভিত্তিতে পরিচালনার চেষ্টা করেছিলেন। অন্যদিকে ২০১৩ সালের সামরিক হস্তক্ষেপের পর ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসা আলসিসি নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বিনিয়োগ ও আধুনিকায়নকে তার শাসনদর্শনের প্রধান ভিত্তি করেছেন।

কিন্তু আলসিসি আসলে কেমন মিসর গড়তে চান? তার উন্নয়ন পরিকল্পনায় সাধারণ মানুষের জীবনমান কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? নতুন রাজধানী, মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর ও বৃহৎ নগর প্রকল্প কি মিসরকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করছে, নাকি ঋণ ও ব্যয়ের নতুন চাপ তৈরি করছে? মুরসির স্বল্প মেয়াদের শাসন, আল-সিসির দীর্ঘ শাসন এবং তাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছাড়া এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন।

বিজ্ঞাপন

মুরসির শাসনকাল ছিল প্রায় এক বছর, ২০১২ সালের জুন থেকে ২০১৩ সালের জুলাই। আলসিসি ২০১৪ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন এবং পরবর্তী সময়ে আরো মেয়াদে ক্ষমতায় থাকেন। ফলে দুজনের শাসনামলের অর্থনৈতিক ফলাফল সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধান ও রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনা করতে হবে। মুরসির এক বছরের অভিজ্ঞতা দিয়ে তার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সম্ভাব্য ফল নির্ধারণ করা যায় না; একইভাবে আলসিসির দীর্ঘ শাসনের সব অর্জন বা সংকটকে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল বলাও যথার্থ হবে না।

মুরসির স্বপ্ন: নির্বাচনী বৈধতা ও রাজনৈতিক ইসলাম

২০১১ সালের আরব বসন্তে দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পতনের পর মিসরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। ২০১২ সালের নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড-সমর্থিত ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি জয়ী হন। ৩০ জুন তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেশটির ইতিহাসে তিনিই প্রথম নির্বাচিত বেসামরিক প্রেসিডেন্ট, যিনি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলেন।

মুরসির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ইসলামি মূল্যবোধ, নির্বাচনী বৈধতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক চিন্তাধারা। তবে তাকে শুধু ইসলামপন্থি নেতা হিসেবে দেখলে তার রাজনৈতিক অবস্থান ও শাসনকালের জটিলতা বোঝা যাবে না। তিনি এমন একটি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, যেখানে সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র, পুরোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং মোবারক আমলের ক্ষমতাকাঠামোর প্রভাব তখনো প্রবল ছিল।

মুরসি দায়িত্ব নেওয়ার সময় মিসরের অর্থনীতি আগে থেকেই সংকটে ছিল। ২০১১ সালের বিপ্লবের পর পর্যটন, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বেকারত্ব বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে এবং বাজেট ঘাটতি বড় হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের ২০১৩ সালের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১০ সালে বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ২ শতাংশ; ২০১২ সালে তা বেড়ে ১২ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছায়। একই সময়ে বাজেট ঘাটতিও জিডিপির ৭ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ মুরসি যখন ক্ষমতায় আসেন, তখনই অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় ছিল।

মুরসি সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে ৪৮০ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা নিয়ে আলোচনা করেছিল। কিন্তু ভর্তুকি সংস্কার, কর বৃদ্ধি ও অন্যান্য শর্তের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কের কারণে চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়নি। সরকার জ্বালানি ভর্তুকি কমাতে অনীহা দেখায় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক ব্যয় বজায় রাখার চেষ্টা করে। ২০১৩ সালের শুরুতে শিল্প খাতে জ্বালানি ভর্তুকি পর্যায়ক্রমে কমানো, সম্পত্তিকর সংস্কার এবং সামাজিক সুরক্ষার কিছু উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও বিরোধের কারণে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

মুরসির শাসনকালের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয় ২০১২ সালের ২২ নভেম্বরের সাংবিধানিক ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। ওই ঘোষণার মাধ্যমে তার সিদ্ধান্তকে বিচারিক পর্যালোচনার বাইরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিরোধীরা এটিকে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা হিসেবে দেখেন। ইউরোপীয় কমিশনের ২০১৩ সালের মূল্যায়নেও বলা হয়, মুরসির ওই ঘোষণা এবং তাড়াহুড়ো করে সংবিধান গ্রহণের প্রক্রিয়া দেশকে গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের দিকে ঠেলে দেয়।

মুরসি সরকারের একটি বড় দুর্বলতা ছিল জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে না পারা। ধর্মনিরপেক্ষ, উদারপন্থি, বামপন্থি ও বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে তার সরকারের দূরত্ব বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক প্রভাব ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে তাদের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, মুরসি রাষ্ট্রের সব পক্ষকে নিয়ে কাজ করার বদলে নিজের রাজনৈতিক শিবিরকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার সমর্থকদের বক্তব্য ছিল, পুরোনো রাষ্ট্রকাঠামোর বাধা এবং বিরোধীদের অসহযোগিতা তাঁর সরকারকে কার্যকরভাবে কাজ করতে দেয়নি।

২০১৩ সালের ৩০ জুন মুরসির পদত্যাগের দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ৩ জুলাই সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে, সংবিধান স্থগিত করে এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে। সেনাবাহিনীর এই পদক্ষেপকে সমর্থকেরা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হিসেবে দেখলেও মুরসির সমর্থকেরা একে সামরিক অভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করেন। পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় রাবা ও অন্যান্য স্থানে বিক্ষোভ দমনের সময় অন্তত ১ হাজার ১৫০ জন নিহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

মুরসির শাসনামলের মূল্যায়নে তাই দুটি বিষয় একসঙ্গে দেখতে হবে। একদিকে তিনি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং তার ক্ষমতাচ্যুতি মিসরের গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করে। অন্যদিকে তার সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সাংবিধানিক পদক্ষেপ, বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সীমাবদ্ধতাও উপেক্ষা করা যায় না। এক বছরের শাসনামল দিয়ে তার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন-দর্শনের সফলতা বা ব্যর্থতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

আল-সিসির মিসর: শক্তিশালী রাষ্ট্র, নিরাপত্তা ও বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প

মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি মিসরের রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি প্রেসিডেন্ট হন। তার শাসনদর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ, বিনিয়োগ এবং কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত উন্নয়ন পরিকল্পনা।

আল-সিসির বক্তব্য ও সরকারি নীতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট: তিনি মিসরকে এমন একটি শক্তিশালী ও আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে চান, যার প্রশাসন, অবকাঠামো, সামরিক সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে সমন্বিত হবে। তার সরকারের কাছে উন্নয়ন মানে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং জনসংখ্যার চাপ সামলানো, নতুন নগর গড়ে তোলা, যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণ, জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো এবং আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে মিসরের অবস্থান ধরে রাখা।

এই দর্শনের আনুষ্ঠানিক কাঠামো হলো ‘মিসর ভিশন ২০৩০’। এতে টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যের কথা বলা হয়েছে। মিসরের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার লক্ষ্য একটি সমৃদ্ধ, উন্নত ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা।

আলসিসির উন্নয়ন পরিকল্পনার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক নতুন প্রশাসনিক রাজধানী। কায়রোর জনসংখ্যার চাপ কমানো, সরকারি দপ্তর স্থানান্তর, নতুন ব্যবসায়িক কেন্দ্র তৈরি এবং আধুনিক নগর অবকাঠামো গড়ে তোলার যুক্তিতে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির সঙ্গে নতুন আবাসন, বাণিজ্যিক ভবন, সরকারি স্থাপনা, সড়ক, পরিবহন ও বিনিয়োগ অঞ্চল যুক্ত হয়েছে।

সরকারের দৃষ্টিতে এটি ভবিষ্যৎ নগরায়ণের একটি মডেল। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, যখন বিপুলসংখ্যক মানুষ মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে রয়েছে, তখন এত ব্যয়বহুল নতুন রাজধানী নির্মাণ কতটা জরুরি? নতুন প্রশাসনিক রাজধানীর আনুমানিক ব্যয় ৫৮ বিলিয়ন ডলার বলা হয়েছে। প্রকল্পের অর্থায়ন, সামরিক বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা, সরকারি সম্পদের ব্যবহার এবং ঋণের চাপ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

নতুন রাজধানী ছাড়াও আলসিসি সরকারের সময়ে মহাসড়ক, সেতু, রেলপথ, নতুন শহর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর এবং সুয়েজ খাল সম্প্রসারণের মতো প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালে সুয়েজ খালের নতুন সম্প্রসারিত অংশ উদ্বোধন করা হয়। সরকারের যুক্তি ছিল, এর মাধ্যমে জাহাজ চলাচলের সক্ষমতা বাড়বে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে মিসরের গুরুত্ব বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি পাবে। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্য, আঞ্চলিক সংঘাত ও জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে খাল থেকে আয় সব সময় একই রকম থাকে না।

আলসিসির উন্নয়ন মডেলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীর অর্থনৈতিক ভূমিকা। মিসরের সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে শুধু প্রতিরক্ষা নয়, নির্মাণ, খাদ্য, উৎপাদন, জমি উন্নয়ন ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত। আলসিসির সময়ে এ ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। সরকারের সমর্থকদের মতে, সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক সক্ষমতা দ্রুত অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করে। সমালোচকদের মতে, সামরিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশেষ সুবিধা বেসরকারি খাতের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করে এবং অর্থনৈতিক জবাবদিহি দুর্বল করে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৫ সালের মিসরবিষয়ক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২২–২৩ অর্থবছরে দেশটির মোট বিনিয়োগের ৭৪ শতাংশ ছিল সরকারি বিনিয়োগ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯৭টি সামরিক মালিকানাধীন কোম্পানির উল্লেখও ওই প্রতিবেদনে রয়েছে। প্রতিবেদনের মূল উদ্বেগ হলো, অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের ব্যাপক উপস্থিতি, বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং অসম প্রতিযোগিতা বেসরকারি বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

অর্থনৈতিক সাফল্য ও সংকট: উন্নয়নের দুই বিপরীত চিত্র

আলসিসির সময়ে মিসরে অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু এই উন্নয়ন মডেলের অর্থায়ন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশি ঋণ, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার সহায়তা, উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ এবং সরকারি ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও অন্যান্য উন্নয়ন খাতে ব্যয় করার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত পঞ্চম ও ষষ্ঠ পর্যালোচনাসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মিসরের সরকারি ঋণ জিডিপির ৯১ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি রাজস্বের প্রায় ৮৩ শতাংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। ঋণের বোঝা কমাতে এবং বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভূমিকা কমানো, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং বেসরকারি খাতকে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে অর্থনীতির চিত্র একমাত্র ঋণের পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায় না। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে মিসরের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৩ শতাংশ, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। উৎপাদনশিল্প, পর্যটন, যোগাযোগ এবং সুয়েজ খালে জাহাজ চলাচলের আংশিক পুনরুদ্ধার এই প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ২০২৩ সালের শেষ দিকে সর্বোচ্চ ৩৮ শতাংশে পৌঁছানোর পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসে।

কিন্তু প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ এই নয় যে সাধারণ মানুষের সংকট দূর হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১–২২ অর্থবছরে মিসরের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আন্তর্জাতিক নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের দারিদ্র্যসীমা ধরে হিসাব করলে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দারিদ্র্য প্রায় পাঁচ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি কমলেও আগের কয়েক বছরের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ক্ষতি পুরোপুরি কাটেনি।

এখানে আলসিসির উন্নয়ন মডেলের একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব দেখা যায়। একদিকে রাষ্ট্র বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, নতুন শহর গড়ছে, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে। অন্যদিকে সেই বিনিয়োগের অর্থায়ন, ঋণ পরিশোধ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠছে। উন্নয়নের সুফল যদি কর্মসংস্থান, প্রকৃত আয় ও সামাজিক সেবায় যথেষ্ট প্রতিফলিত না হয়, তাহলে অবকাঠামোগত অগ্রগতি মানুষের কাছে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক স্বস্তি দিতে পারবে না।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মূল্যায়নে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কিছু অগ্রগতির কথা বলা হলেও উচ্চ সরকারি ঋণ, বড় অর্থায়ন চাহিদা এবং বেসরকারি খাতের সীমিত ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তহবিলটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উপস্থিতি কমানো, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়েছে।

রাজনৈতিক স্বাধীনতা বনাম রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা

মুরসি ও আলসিসির তুলনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলোর একটি হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও বিরোধী মতের অবস্থান। মুরসির সময়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও নির্বাচনী রাজনীতির সুযোগ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তার সাংবিধানিক পদক্ষেপ ও বিরোধীদের সঙ্গে সংঘাত সেই প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে। আলসিসির সময়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে; তবে রাজনৈতিক বিরোধিতা, স্বাধীন গণমাধ্যম, নাগরিক সংগঠন এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করে আসছে।

ফ্রিডম হাউসের ২০২৫ সালের ‘ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রতিবেদনে মিসরকে ‘মুক্ত নয়’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে ১০০-এর মধ্যে ১৮ নম্বর দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, অর্থবহ রাজনৈতিক বিরোধিতা প্রায় অনুপস্থিত এবং মতপ্রকাশ, সংবাদমাধ্যম ও সমাবেশের স্বাধীনতা কঠোরভাবে সীমিত।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের দেশভিত্তিক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ঘটনাবলির আলোকে বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ সমালোচক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত ছিল। দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক, রাজনৈতিক বন্দিদের পরিস্থিতি এবং স্বাধীন সংগঠনের কার্যক্রমের ওপর বিধিনিষেধ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্থাটি আরো বলেছে, অর্থনৈতিক সংকট সাধারণ মানুষের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এগুলো মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ ও অভিযোগ; মিসর সরকার নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলাকে তার নীতির গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হিসেবে তুলে ধরে।

এই বাস্তবতায় আলসিসির রাষ্ট্রচিন্তার একটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট: তিনি রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখেন না; বরং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করেন। তার সমর্থকদের যুক্তি, বিপ্লব-পরবর্তী অস্থিরতা, সন্ত্রাসবাদ ও আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ছাড়া মিসরের ঐক্য ও নিরাপত্তা বজায় রাখা কঠিন ছিল। সমালোচকদের যুক্তি, বিরোধী মতের জায়গা সংকুচিত করে এবং জবাবদিহি দুর্বল রেখে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায় না।

মুরসি ও আলসিসি: দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রভাবনা

মুরসির রাষ্ট্রভাবনায় নির্বাচনী বৈধতা, ইসলামি রাজনৈতিক পরিচয় এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার সরকার জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে পারেনি; সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করেছে এবং অর্থনৈতিক সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি। তবে তার শাসনকাল এত সংক্ষিপ্ত ছিল যে তার উন্নয়ন পরিকল্পনার দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বিচার করার মতো পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি।

আলসিসির রাষ্ট্রভাবনায় নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব, সামরিক সক্ষমতা, বৃহৎ অবকাঠামো ও রাষ্ট্রনির্ভর উন্নয়ন প্রধান। তার সময়ে অবকাঠামো ও নগরায়ণে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে, কিছু খাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ঋণের বোঝা, উচ্চ সুদ ব্যয়, দারিদ্র্য, বেসরকারি খাতের সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংকোচন তার উন্নয়ন মডেলকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

দুই নেতার অর্থনৈতিক দর্শনের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। মুরসি সামাজিক ব্যয় ও ভর্তুকি বজায় রাখার দিকে ঝুঁকেছিলেন, যদিও তার সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত ছিল। আলসিসি বড় অবকাঠামো প্রকল্প, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর বেশি নির্ভর করেছেন। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচির আওতায় ভর্তুকি সংস্কার, বিনিময় হার নমনীয় করা এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে আলসিসির মডেলও একেবারে অপরিবর্তিত নয়; অর্থনৈতিক বাস্তবতার চাপে সরকারকে নীতিতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে।

তবে মুরসি ও আলসিসির শাসনকাল সমান নয়, তাদের ক্ষমতায় আসার পরিস্থিতিও এক নয়। মুরসি ক্ষমতায় এসেছিলেন বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্যে, আর আলসিসি ক্ষমতায় আসেন সামরিক হস্তক্ষেপের পর। মুরসির সময়ের অর্থনৈতিক সূচকগুলো মূলত বিপ্লব-পরবর্তী অস্থিরতার প্রভাব বহন করে। আলসিসির দীর্ঘ শাসনের সময় বিশ্ব অর্থনীতি, করোনা মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক খাদ্য ও জ্বালানি বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত মিসরের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। তাই দুই সময়ের প্রবৃদ্ধি বা মূল্যস্ফীতির হার পাশাপাশি বসিয়ে সরাসরি একজনের সাফল্য ও অন্যজনের ব্যর্থতা ঘোষণা করা বিশ্লেষণগতভাবে যথাযথ হবে না।

আলসিসি আসলে কেমন মিসর গড়তে চান?

আলসিসি এমন একটি মিসর গড়তে চান, যেখানে রাষ্ট্র হবে উন্নয়নের প্রধান পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী; সামরিক বাহিনী থাকবে নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশে; নতুন শহর ও অবকাঠামো হবে আধুনিকায়নের দৃশ্যমান প্রতীক; বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন উন্নয়নের গতি বাড়াবে; আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা থাকবে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার।

কিন্তু তার ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। উন্নত নগর, মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নতুন প্রশাসনিক রাজধানী একটি আধুনিক রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত চেহারা বদলে দিতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত না হলে সেই আধুনিকায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একইভাবে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেই উৎপাদনশীলতা বাড়ে না; বিনিয়োগের দক্ষতা, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতাও জরুরি।

মিসরের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের বিশাল বিনিয়োগ ও সামরিক-প্রভাবিত অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে কীভাবে এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি তৈরি করা যায়, যেখানে বেসরকারি উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষও সমান সুযোগ পাবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক মূল্যায়নও বলছে, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভূমিকা কমানো এবং বেসরকারি খাতের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন।

বাংলাদেশের জন্য মিসরের অভিজ্ঞতার তাৎপর্য

বাংলাদেশের জন্য মিসরের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব এবং নাগরিক স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে বাস্তব শিক্ষা রয়েছে। মুরসির অভিজ্ঞতা দেখায়, নির্বাচনে জয়ী হওয়া যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রের সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে চলা, সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষা এবং বিরোধী মতের সঙ্গে সমঝোতা গড়ে তোলাও জরুরি। অন্যদিকে আলসিসির অভিজ্ঞতা দেখায়, বড় অবকাঠামো প্রকল্প ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে; কিন্তু ঋণ, প্রকল্পের স্বচ্ছতা, সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার ভারসাম্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উপেক্ষা করলে উন্নয়নের সুফল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, উন্নয়নকে কেবল দৃশ্যমান অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি, সামাজিক সুরক্ষা এবং নাগরিক অধিকারকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। রাষ্ট্র শক্তিশালী হওয়া জরুরি, কিন্তু সেই শক্তি যেন নাগরিকের অধিকার ও প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার বিকল্প হয়ে না ওঠে।

রাষ্ট্রচিন্তা ও শাসনপদ্ধতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য

মোহাম্মদ মুরসি ও আবদেল ফাত্তাহ আলসিসি—দুজনের রাষ্ট্রচিন্তা ও শাসনপদ্ধতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মুরসি নির্বাচনী বৈধতা ও ইসলামি রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজন, সাংবিধানিক বিতর্ক এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তার সরকার সফল হতে পারেনি। আলসিসি নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব, বৃহৎ অবকাঠামো ও রাষ্ট্রনির্ভর উন্নয়নকে সামনে রেখে মিসরকে আধুনিকায়নের চেষ্টা করেছেন। তার সময়ে দৃশ্যমান অবকাঠামোগত পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কিছু অগ্রগতি থাকলেও ঋণ, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, বেসরকারি খাতের সীমাবদ্ধতা এবং নাগরিক স্বাধীনতার সংকোচন বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।

আলসিসি যে মিসর গড়তে চান, তা কেবল নতুন রাজধানী, উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক ও বৃহৎ প্রকল্পের মিসর নয়; তার ঘোষিত লক্ষ্য একটি শক্তিশালী, আধুনিক, নিরাপত্তাকেন্দ্রিক ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত উন্নয়নব্যবস্থা। কিন্তু সেই মিসর কতটা সমৃদ্ধ হবে, তা নির্ধারিত হবে প্রকল্পের আকার দিয়ে নয়—মানুষের জীবনমান, অর্থনৈতিক সুযোগ, ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং নাগরিকের স্বাধীনতার বাস্তব অবস্থার ভিত্তিতে।

রাষ্ট্রের শক্তি ও নাগরিকের অধিকার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ—এই তিনটি ভারসাম্য একসঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই মিসরের উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে। এটাই মুরসি-পরবর্তী মিসরের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন