যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী উত্তরসূরি কে হবেন, সেই প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝপথে এসে রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, নেতৃত্বের উত্তরাধিকার এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। এই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানের সমালোচনা করে ভ্যান্স যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা তার রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে ঘটনাটিকে কেবল ট্রাম্পের সঙ্গে মতবিরোধ হিসেবে দেখলে পুরো রাজনৈতিক চিত্রটি বোঝা যাবে না। ভ্যান্স একদিকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখতে চাইছেন, অন্যদিকে নিজের পরিচিতি, সমর্থকগোষ্ঠী, অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করছেন। অর্থাৎ তিনি ট্রাম্পের বলয়ের ভেতরে থেকেই নিজের জন্য আলাদা একটি রাজনৈতিক বলয় নির্মাণের পথে হাঁটছেন কি না, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপর্যয় ও ভ্যান্সের প্রকাশ্য অবস্থান
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা উল্লেখযোগ্য আসন বৃদ্ধি করেছে এবং প্রতিনিধি পরিষদেও রিপাবলিকানদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত এলাকাতেও ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও নেতৃত্বের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নির্বাচনের পর ৪ নভেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বক্তব্যে ভ্যান্স রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধকে চিহ্নিত করেন। তার বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল, ‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে।’ তিনি আরো প্রশ্ন তোলেন, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিনিময়ে ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কতটা যৌক্তিক ছিল।
এ বক্তব্য ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করে। ট্রাম্প যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে দাবি করেছেন এবং বলেছেন, একই পরিস্থিতিতে পড়লে তিনি আবারও এমন সিদ্ধান্ত নিতেন। অর্থাৎ যেখানে প্রেসিডেন্ট সামরিক অভিযানকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, সেখানে তার ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী পরাজয়ের রাজনৈতিক দায়ের সঙ্গে যুদ্ধের সম্পর্ক সামনে আনছেন।
৪ নভেম্বরের প্রতিবেদনে এই মতপার্থক্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভ্যান্সের বক্তব্য শুধু যুদ্ধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি এবং রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের দায় নির্ধারণ নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান।
এখানে লক্ষণীয়, ভ্যান্স নিজেকে প্রশাসনের বাইরে দাঁড় করিয়ে সমালোচনা করেননি। তিনি প্রশাসনেরই ভাইস প্রেসিডেন্ট। ফলে তার বক্তব্যের মধ্যে একই সঙ্গে প্রশাসনের নীতির সমালোচনা এবং নিজের রাজনৈতিক দায় সীমিত রাখার প্রবণতা রয়েছে। এই দ্বৈত অবস্থানই তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের ছায়ায় থেকেও নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ
ভ্যান্সের রাজনৈতিক কৌশল বুঝতে হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরের বক্তব্যের পাশাপাশি গত দুই বছরের কর্মকাণ্ডও বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি হঠাৎ করে ট্রাম্পের বলয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা শুরু করেননি। বরং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ অবস্থান বজায় রেখেই নিজের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরির কাজ এগিয়ে নিয়েছেন।
ভ্যান্সের ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক কৌশলের কয়েকটি দিক উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা, রিপাবলিকান পার্টির অর্থদাতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা, রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের সমর্থন অর্জন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালানো এবং দলীয় সংগঠকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বৃদ্ধি করা।
ভ্যান্স রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির অর্থসংগ্রহবিষয়ক দায়িত্বে যুক্ত ছিলেন। এই দায়িত্ব তাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের বড় দাতা, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক সংগঠক এবং দলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির সুযোগ দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শুধু জনপ্রিয়তা নয়, অর্থসংস্থান, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভ্যান্সের এই প্রস্তুতিকে তাই নিছক প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ভ্যান্সের সঙ্গে প্রযুক্তি খাতের ধনকুবেরদের যোগাযোগ রয়েছে। তবে প্রচলিত রিপাবলিকান অর্থদাতা ও রাজনৈতিক তহবিল সংগ্রাহকদের মধ্যেও তার প্রভাব বিস্তারের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং জ্যাক পসোবিয়েকের মতো রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রভাবকদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ভবিষ্যৎ প্রচারণায় সহায়ক হতে পারে।
ভ্যান্স শুধু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে চাইছেন না। তিনি এমন একটি রাজনৈতিক সমর্থনব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছেন, যা ট্রাম্পের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ছাড়াও কার্যকর থাকতে পারে। এই প্রস্তুতিকে ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছে।
১৭টি নির্বাচনী সমাবেশ ও জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভ্যান্সের রাজনৈতিক তৎপরতা আরো দৃশ্যমান হয়। সেপ্টেম্বর মাসে রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনবিষয়ক সম্মেলনের পর থেকে তিনি ১৭টি নির্বাচনী সমাবেশে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এসব সমাবেশের মাধ্যমে তিনি শুধু রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালাননি, নিজের জাতীয় রাজনৈতিক পরিচিতিও বাড়িয়েছেন।
ভ্যান্সের সমাবেশে অনেক সমর্থক তাকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করছিলেন। তাকে ঘিরে ‘৪৮’ সংখ্যাটিও আলোচনায় আসে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮তম প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনার প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে ভ্যান্স সরাসরি প্রার্থিতা ঘোষণার পথে হাঁটেননি। বরং তিনি বলেছেন, আগে ২০২৬ সালের নির্বাচনের কাজ শেষ করতে চান।
ভ্যান্স এমন অঙ্গরাজ্য ও নির্বাচনী এলাকায় বেশি সময় দিয়েছেন, যেখানে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে। বিশেষ করে রক্ষণশীল ভোটার, স্থানীয় সংগঠক এবং ভবিষ্যৎ দলীয় প্রাইমারিতে তার পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন এমন রাজনীতিকদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির বিষয়টি তার প্রচারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ ছাড়া ট্রাম্পের তুলনায় ভ্যান্সের বক্তব্যের ধরনেও কিছু পার্থক্য রয়েছে। ট্রাম্প যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ে সাফল্যের দাবি করেন, সেখানে ভ্যান্স আবাসন, জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে আরো কাজ করার প্রয়োজন স্বীকার করেছেন। ট্রাম্প যেখানে ইরান যুদ্ধের ব্যয়কে প্রয়োজনীয় বলে তুলে ধরেছেন, সেখানে ভ্যান্স যুদ্ধবিরোধী ভোটারদের উদ্বেগ স্বীকার করেছেন।
ভ্যান্স অনেক ক্ষেত্রে ট্রাম্পের তুলনায় অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য ও সংলাপমুখী রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করছেন। তার উদ্দেশ্য হতে পারে শুধু ট্রাম্পের মূল সমর্থকগোষ্ঠী নয়, বরং অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থি ও অসন্তুষ্ট ভোটারদের কাছেও নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো।
ইরান যুদ্ধ: আদর্শগত অবস্থান নাকি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস?
ভ্যান্সের সঙ্গে ট্রাম্পের মতপার্থক্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ইরান যুদ্ধ। ভ্যান্স দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছেন। তিনি ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাবেক মেরিন সেনা। সামরিক অভিজ্ঞতা থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল বিদেশি যুদ্ধের ঝুঁকি সম্পর্কে কথা বলেছেন।
ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও তিনি অতীতের মতো অনির্দিষ্টকাল ধরে বিদেশে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করলে ভ্যান্স প্রথম দিকে প্রকাশ্যে তেমন সমালোচনা করেননি। বরং কিছু সময় পর তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারলে যুদ্ধের ব্যয় গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
এখন নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর তার অবস্থান অনেক বেশি স্পষ্ট। তিনি শুধু যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় নয়, নির্বাচনী মূল্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ভ্যান্সের বক্তব্যের পর হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তা এটিকে প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে প্রকাশ্য মতপার্থক্য হিসেবে দেখেছেন। এমনকি ভ্যান্সের বক্তব্যটি হোয়াইট হাউসের অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে আগাম প্রত্যাশিত ছিল না।
ভ্যান্সের বক্তব্যকে তার ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রস্তুতির সূচনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি। তবে এ বিষয়ে তার শিবিরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রার্থিতা ঘোষণার কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
এখানে রাজনৈতিক হিসাবটি আরও গভীর। ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করে ভ্যান্স একই সঙ্গে তিনটি শ্রেণির ভোটারের কাছে নিজের অবস্থান গ্রহণযোগ্য করার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রথমত, বিদেশে নতুন যুদ্ধ ও সামরিক ব্যয়ের বিরোধী রক্ষণশীল ভোটার। দ্বিতীয়ত, জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন সাধারণ ভোটার। তৃতীয়ত, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন এমন রিপাবলিকান সমর্থক।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক লাখের বেশি ভোটারের ওপর পরিচালিত নির্বাচনী জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার ইরানে সামরিক অভিযানকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করেছেন। তবে জরিপে এটিও দেখা যায়, যুদ্ধের চেয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি দুর্নীতি ভোটারদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ইস্যু ছিল। অর্থাৎ ভ্যান্স যুদ্ধের বিষয়টি সামনে আনলেও রিপাবলিকানদের পরাজয়ের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা শুধু ইরান যুদ্ধ দিয়ে দেওয়া যাবে না।
ইসরাইল প্রশ্নেও ট্রাম্পের সঙ্গে পার্থক্য
ভ্যান্সের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার আরেকটি ক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্য ও ইসরাইলনীতি। ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলের প্রতি দৃঢ় সমর্থন বজায় রেখেছে। কিন্তু ভ্যান্সের বক্তব্যে এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন সুর লক্ষ করা যাচ্ছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচনের পক্ষে ভ্যান্স প্রকাশ্যে সমর্থন জানাননি। এ ছাড়া ইরান যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করায় ইসরাইলি সরকারের কিছু সদস্যের সমালোচনাও করেছেন তিনি।
এ অবস্থানকে সরাসরি ইসরাইলবিরোধী নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ, সামরিক ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সম্পৃক্ততার প্রশ্নে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে এমন একটি অংশ রয়েছে, যারা ঐতিহ্যগতভাবে ইসরাইলের নিরাপত্তাকে সমর্থন করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ বিদেশি সংঘাতে ব্যয় করার বিষয়ে প্রশ্ন তোলে। ভ্যান্স এই অংশের সমর্থন ধরে রাখতে চাইতে পারেন। তবে তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, ট্রাম্পের শক্তিশালী ইসরাইলপন্থি সমর্থকগোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ না করে কীভাবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা যায়।
অভিবাসননীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন সুর
ভ্যান্সের সাম্প্রতিক বক্তব্যে অভিবাসননীতি নিয়েও কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসনবিরোধী অবস্থানকে তিনি এত দিন দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছেন। কিন্তু মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তিনি বলেছেন, অবৈধ শ্রমিক নিয়োগকারী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে অভিবাসন আইন প্রয়োগের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা যেতে পারে।
অর্থাৎ শুধু অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা না করে, তাদের অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়া নিয়োগকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টি তিনি সামনে এনেছেন। তবে তিনি অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারীদের সাধারণ ক্ষমা দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে এটি অভিবাসননীতি থেকে সরে আসা নয়; বরং নীতি বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে নতুন রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ।
এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কঠোর অভিবাসননীতির সমর্থক রিপাবলিকান ভোটারদের ধরে রেখেও অভিবাসন অভিযান নিয়ে উদ্বিগ্ন মধ্যপন্থী ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার চেষ্টা এতে প্রতিফলিত হতে পারে।
ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক কি ভাঙনের দিকে যাচ্ছে?
ভ্যান্সের বক্তব্যের পর ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ভ্যান্সের অবস্থানকে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেননি। বরং সাংবাদিকদের বলেছেন, ভ্যান্সের অনুভূতি সম্পর্কে তিনি জানেন এবং তার বক্তব্য ঠিক আছে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
এখানে লক্ষণীয়, ট্রাম্প ও ভ্যান্সের মধ্যে প্রকাশ্য মতপার্থক্য থাকলেও দুজনের সম্পর্কের অবসান ঘটেছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং ট্রাম্প এখনো ভ্যান্সকে নিজের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে ভ্যান্সও ট্রাম্পকে সরাসরি আক্রমণ করেননি। তিনি প্রশাসনের সামগ্রিক ব্যর্থতার দায় নিজের ওপর না নিয়ে নির্দিষ্ট নীতির নির্বাচনী পরিণতি নিয়ে কথা বলেছেন। তার বক্তব্যে ট্রাম্পের নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার চেয়ে নির্বাচনী ফলাফল থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান বেশি স্পষ্ট।
তবে ডেমোক্র্যাটরা ভ্যান্সের এই অবস্থানকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের প্রশ্ন, তিনি যদি ইরান যুদ্ধের বিরোধী হয়ে থাকেন, তাহলে যুদ্ধ চলাকালে প্রকাশ্যে আরো জোরালো প্রতিবাদ করেননি কেন? ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রশাসনের নীতির দায় তারও রয়েছে।
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের চিফ অব স্টাফ মার্ক শর্টও বলেছেন, ভ্যান্সের এই বক্তব্য ট্রাম্পের কাছ থেকে ইচ্ছাকৃত দূরত্ব তৈরির ইঙ্গিত বহন করে। তার মতে, ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত থাকার দায় এড়ানো সহজ হবে না।
২০২৮ সালের দৌড়ে ভ্যান্সের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা
রিপাবলিকান পার্টির পরবর্তী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে ভ্যান্স একমাত্র সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী নন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, ফ্লোরিডার রাজনীতিক রন ডিস্যান্টিস, সিনেটর টেড ক্রুজ এবং জশ হাওলির মতো ব্যক্তিদের নামও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের আলোচনায় আসতে পারে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে মার্কো রুবিওকে ভ্যান্সের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনের পর রুবিওর নীরবতাকেও প্রতিবেদনে আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়। ভ্যান্সের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, তিনি বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট। ফলে তার হাতে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং গণমাধ্যমে নিয়মিত উপস্থিতির সুযোগ রয়েছে। ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তাকে রিপাবলিকানদের ট্রাম্পপন্থি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে।
কিন্তু দুর্বলতাও রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যর্থতার দায় থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত নন। রিপাবলিকানরা যদি মনে করে যে ভ্যান্স ট্রাম্পের নীতির অংশীদার হয়েও পরাজয়ের পর দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তাহলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের সমর্থন ছাড়া রিপাবলিকান প্রাইমারিতে জয়ী হওয়াও তার জন্য কঠিন হতে পারে। ট্রাম্প এখনো দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি প্রকাশ্যে ভ্যান্সের প্রশংসা করলেও তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরসূরি হিসেবে সমর্থন দেননি। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে দাতাদের কাছে ভ্যান্সের পক্ষে কথা বলেছেন বলে আগে খবর প্রকাশিত হলেও প্রকাশ্যে তাকে সমর্থনের ঘোষণা দেননি।
ভ্যান্সের সামনে তিনটি রাজনৈতিক পথ
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভ্যান্সের সামনে তিনটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক পথ রয়েছে।
প্রথমত, তিনি ট্রাম্পের বিশ্বস্ত উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শন, অভিবাসননীতি, জাতীয়তাবাদী অর্থনৈতিক অবস্থান এবং রক্ষণশীল সামাজিক মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। এর বিনিময়ে ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীর বড় অংশ তার পাশে থাকতে পারে।
দ্বিতীয়ত, তিনি ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বজায় রেখেও পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় কিছু পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন। ইরান যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অভিবাসননীতি নিয়ে তার সাম্প্রতিক বক্তব্য এই সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। এ পথে তিনি ট্রাম্পপন্থি ভোটারদের পাশাপাশি নতুন ভোটারগোষ্ঠীর সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করতে পারেন।
তৃতীয়ত, তিনি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র রাজনৈতিক বলয় গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তাকে নিজস্ব অর্থদাতা, রাজনৈতিক সংগঠক, প্রচারক, নির্বাচনী কর্মী এবং নীতিনির্ধারণী সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করতে হবে। ট্রাম্পের অনুমোদন ছাড়াও যাতে তার রাজনৈতিক অবস্থান টিকে থাকে, সেই সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলা প্রয়োজন হবে।
তবে তৃতীয় পথটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমলেও রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে তার প্রভাব এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। ট্রাম্পের বিরোধিতা করে দলের নেতৃত্ব অর্জন করতে গেলে ভ্যান্সকে এমন একটি সমর্থনভিত্তি তৈরি করতে হবে, যা বর্তমান বাস্তবতায় সহজ নয়।
রিপাবলিকান পার্টি কি ট্রাম্প-পরবর্তী যুগের প্রস্তুতি নিচ্ছে?
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ধাক্কা নয়; এটি রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নও সামনে এনেছে। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও নির্বাচনী কৌশলের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা দলটি তার পরবর্তী সময়ে একইভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
দলের ভেতরে একদিকে রয়েছে ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকগোষ্ঠী, অন্যদিকে রয়েছে ঐতিহ্যগত রিপাবলিকান নেতৃত্ব, ব্যবসায়ী ও অর্থদাতা শ্রেণি এবং বিদেশনীতি ও অর্থনৈতিক নীতিতে ভিন্নমত পোষণকারী রক্ষণশীলরা। এদের সবাইকে একই রাজনৈতিক ছাতার নিচে ধরে রাখা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা হবে।
ভ্যান্সের বিশেষ সুবিধা হলো, তিনি ট্রাম্পের রাজনৈতিক আন্দোলনের বাইরে থেকে উঠে আসেননি। বরং সেই আন্দোলনের ভেতর থেকেই নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। ফলে ট্রাম্পের সমর্থকদের কাছে তিনি অপরিচিত নন। একই সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়কে আরও বিস্তৃত করার সুযোগও তার রয়েছে।
তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল তাকে একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করলেই যে সব নির্বাচনে জয় পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, যুদ্ধ, অভিবাসন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির মতো বিষয়গুলোতে ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ভিত্তি আরও দুর্বল হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ভ্যান্সের লক্ষ্য কী?
বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ থেকে ভ্যান্সের রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই। বরং তিনি ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রেখে নিজের নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন বলে মনে হয়।
এটি অনেকটা একই রাজনৈতিক আন্দোলনের ভেতরে থেকে পরবর্তী নেতৃত্বের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার কৌশল। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাব যত দিন থাকবে, তত দিন তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা ভ্যান্সের জন্য লাভজনক। কিন্তু ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমতে থাকলে কিংবা রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে নতুন নেতৃত্বের দাবি জোরালো হলে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান কাজে লাগাতে পারবেন তিনি।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয় ভ্যান্সের জন্য তাই একই সঙ্গে সংকট ও সুযোগ তৈরি করেছে। একদিকে তিনি এমন একটি প্রশাসনের অংশ, যার নীতির বিরুদ্ধে ভোটাররা রায় দিয়েছেন। অন্যদিকে সেই রায়ের ব্যাখ্যা দেওয়ার মাধ্যমে তিনি দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের আলোচনায় নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়ার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সব সময়ই কঠিন। ভ্যান্সের জন্যও চ্যালেঞ্জটি সহজ নয়। তাকে প্রমাণ করতে হবে, তিনি শুধু ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরসূরি নন, বরং নিজের রাজনৈতিক দর্শন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং জাতীয় নেতৃত্বের যোগ্যতাসম্পন্ন একজন স্বতন্ত্র রাজনীতিক।
সুতরাং, ট্রাম্পের বলয় থেকে ভ্যান্স বেরিয়ে যাচ্ছেন—এ কথা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। বরং বলা যায়, তিনি ট্রাম্পের বলয়ের ভেতরে থেকেই নিজের রাজনৈতিক বলয় তৈরি করছেন। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রার্থিতা, ট্রাম্পের সমর্থন এবং রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে, এই কৌশল কতটা সফল হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


