ইসরাইলের নির্বাচনে ট্রাম্পের সমর্থন আদায়ে মরিয়া নেতানিয়াহু

ইসরাইলের নির্বাচনে ট্রাম্পের সমর্থন আদায়ে মরিয়া নেতানিয়াহু
২৮ জুলাই হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: এএফপি

তিন মাসেরও কম সময় বাকি ইসরাইলের নির্বাচন। নির্বাচনে জয়ী হতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্ণ সমর্থন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্কের দৃঢ়তা দেখানো এখন সবচেয়ে জরুরি।

এই অবস্থায় চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বন্ধু ও ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সমর্থক মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের প্রয়াণের পর ওয়াশিংটন সফরের সুযোগটি হাতছাড়া করেননি নেতানিয়াহু। তবে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে তার ৯০ মিনিটের রুদ্ধদ্বার বৈঠক দুই নেতার মধ্যকার বিদ্যমান মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ও অস্বস্তি আবারও প্রকাশ্যে এনেছে।

বিজ্ঞাপন

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক উপদেষ্টা অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, লিন্ডসে গ্রাহামের প্রয়াণ না ঘটলে নেতানিয়াহুর এই ওয়াশিংটন সফরই হতো না।

আরব নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের একের পর এক বৈঠক

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্য যেকোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়ে নেতানিয়াহুই তার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি দেখা করার সুযোগ পেয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক হোয়াইট হাউস বৈঠকটি নেতানিয়াহুর জন্য ছিল অতিরিক্ত উদ্বেগের।

এর আগে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক আঞ্চলিক নেতার সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করেন। আঙ্কারায় তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা এবং ওয়াশিংটনে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি ও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে আলোচনা করেন ট্রাম্প।

রামাল্লার ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সাবেক উপদেষ্টা ও জর্জে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিজার ফারজাখ বলেন, ‘ট্রাম্প আরব নেতাদের সঙ্গে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছেন। এখন কেবল নেতানিয়াহুই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান। অন্যদিকে বাকি সবাই সংঘাতের অবসান চান। ফলে অন্য নেতারা যা নষ্ট করেছেন, তা সংশোধন করতেই ওয়াশিংটন গেছেন নেতানিয়াহু।’

গোপন বৈঠক ও দুই নেতার বিপরীতমুখী সুর

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার বৈঠকটি সাংবাদিকদের উপস্থিতি ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়। মিলারের মতে, দুই নেতার সাফল্য উদযাপনের চেয়ে মতভেদ মেটানোর বিষয়ই বেশি ছিল।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট আলোচনাটিকে ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ বলে বর্ণনা করলেও নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় একে ‘চমৎকার ও পারস্পরিক অংশীদারত্বের’ আলোচনা হিসেবে দাবি করেন।

তবে বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। গত মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, নেতানিয়াহু চান যুক্তরাষ্ট্র যেন ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালিয়ে যায়, যা ট্রাম্প নিজে আর নাও চাইতে পারেন।

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ বিষয়ে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্যের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘পিকঅ্যাক্স পর্বতে কী ঘটছে, তা আমাকে জানাতে বিবিকে (নেতানিয়াহু) লাগবে না। তিনি এগুলো বলছেন কারণ তিনি চান আমরা যেন যুদ্ধে জড়িয়ে থাকি। প্রকাশ্যে বিশ্বকে এগুলো জানানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না।’

ফারজাখ মনে করেন, গাজা ও লেবানন ইস্যুতে নেতানিয়াহুর হাতে দেখানোর মতো কোনো সাফল্য না থাকায় তিনি আবারও ইরানের পারমাণবিক হুমকিকে সামনে আনছেন।

তিনি আরো বলেন, ‘ট্রাম্প হয়তো ভাবছেন আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন কি-না। ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর আর ভরসা রাখতে পারছেন না।’

তুরস্ক ইস্যুতে কঠোর বার্তা ও ব্যক্তিগত টানাপোড়েন

তুরস্কের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে ইসরাইলের আপত্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প স্পষ্ট জানান, ‘আমাদের কী বিক্রি করা উচিত, তা কেউ আমাকে বলে দিতে পারে না। তুরস্ক আমার দুর্দান্ত মিত্র এবং এরদোয়ান আমার বন্ধু।’

আমেরিকার সাবেক কূটনীতিক মিলার উল্লেখ করেন, ট্রাম্প ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যেভাবে প্রকাশ্যে বিষোদ্গার করেছেন, কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট তা কখনো করেননি। ট্রাম্প গোপন ফোনালাপ ফাঁস হতে দিয়েছেন, ইসরাইলকে না জানিয়ে হামাসের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন এবং হুতিদের সঙ্গেও চুক্তি করেছেন।

বর্তমানে দুর্নীতি মামলার মুখোমুখি হয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা নেতানিয়াহুর ওপর নির্বাচনের এই সময়ে ট্রাম্পের চরম প্রভাব রয়েছে।

ওয়াশিংটনে বিক্ষোভ ও মার্কিন নাগরিকদের ক্ষোভ

ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহুর আগমন ও অবস্থানকালে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে রাস্তায় বিক্ষোভ করেন মার্কিন নাগরিকরা। নেতানিয়াহুর গাড়ি বহর যাওয়ার সময় তাকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে স্লোগান দেওয়া হয়। গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) থেকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি রয়েছে।

দি ইকোনমিস্ট ও ইউগভ-এর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া মার্কিন নাগরিকদের ৪৯ শতাংশ নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের পক্ষে মত দিয়েছেন।

এছাড়া ইউগভ ও সিবিএস নিউজের পৃথক জরিপে দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ আমেরিকানই চান ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ হোক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন ট্রাম্প, অন্যদিকে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়ছেন নেতানিয়াহু। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নেতানিয়াহু আবারও ওয়াশিংটন সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন