দীর্ঘ এক দশক আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হয়ে কাজ করার পর যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে আনা এক আফগান নাগরিক টেক্সাসের হাসপাতালে মারা গেছেন। অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হেফাজতে নেওয়ার পরই তার মৃত্যু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর এক প্রতিবেদনে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের বরাতে জানানো হয়, নিহতের নাম মোহাম্মদ নাজির পাকতিয়াওয়াল (৪১)। তাকে ‘অপরাধী’ দাবি করে কর্মকর্তারা বলেন, পাকতিয়াওয়ালের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির সুবিধা নেওয়া এবং চুরির অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সামরিক বাহিনীতে কাজ করার কোনো রেকর্ড তিনি দেখাতে পারেননি বলেও দাবি করেন কর্মকর্তারা।
তবে দুই দশক ধরে চলা যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীকে সহায়তা করা আফগানদের পুনর্বাসনে নিয়োজিত সান ডিয়েগো ভিত্তিক সংগঠন ‘হ্যাশট্যাগ আফগান ইভ্যাক’ সরকারের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিইর হেফাজতে মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে পাকতিয়াওয়াল।
সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট শন ভ্যান ডাইভার বলেন, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই একজনকে অপরাধী বলা এবং বিভিন্ন সংস্থার তথ্য যাচাই না করে তার চাকরির ‘রেকর্ড নেই’ বলে দাবি করা সত্য অনুসন্ধান নয়, বরং দায় এড়ানোর চেষ্টা। ছয় সন্তানের জনক ৪১ বছর বয়সী একজন মানুষ আইসিই হেফাজতে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে কীভাবে মারা গেলেন, সরকারের উচিত এর ব্যাখ্যা দেওয়া।
ডালাস কাউন্টি মেডিকেল এক্সামিনারের কার্যালয় থেকে এখনো মৃত্যুর কারণ জানানো হয়নি। তবে পাকতিয়াওয়ালের পরিবার জানিয়েছে, তিনি অসুস্থ ছিলেন না। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘কীভাবে এমনটি ঘটল তা আমরা এখনো বুঝতে পারছি না। মাত্র ৪১ বছর বয়স ছিল তার, তিনি একজন সুস্থ-সবল মানুষ ছিলেন। তার সন্তানেরা বারবার প্রশ্ন করছে, বাবা কখন বাড়ি ফিরবে?
গত সোমবার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মুখপাত্র লরেন বিস জানান, গত শুক্রবার পাকতিয়াওয়ালকে গ্রেপ্তার করে আইসিই। ডালাসে আইসিইর একটি কার্যালয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় তিনি শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথার কথা জানান। এরপর তাকে ডালাসের পার্কল্যান্ড হাসপাতালে নেওয়া হয়। শনিবার তার জিহ্বা ফুলে যায় এবং তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু সকালে তার অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা কৃত্রিমভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস চালানোর (সিপিআর) চেষ্টা করেন। সকাল ৯টা ১০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
আইসিই হেফাজতে থাকা কাউকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা হয় না বলে দাবি করেন লরেন বিস।
আইসিই জানিয়েছে, তার মৃত্যুর ঘটনা এখনো তদন্তাধীন। তবে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য জুলি জনসন অভিযোগ করেন, অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অতীতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়ার ইতিহাস রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেমনটা বলেন, তিনি মোটেও তেমন কোনো সহিংস অপরাধী ছিলেন না। তিনি একটি বেকারিতে কাজ করতেন। পরিবারের ভরণপোষণ আর দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছিলেন। তবুও কেন তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হলো? কেন তাকে আটক করা হলো? কেন তিনি হেফাজতে মারা গেলেন, এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা চাই।
এদিকে আইসিই দাবি করেছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি ‘স্ন্যাপ’-এ জালিয়াতির অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এছাড়া ১ নভেম্বর গারল্যান্ড পুলিশের হাতে চুরির অভিযোগেও তিনি গ্রেপ্তার হন।
ডালাস কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের এক মুখপাত্র জানান, পাকতিয়াওয়ালের বিরুদ্ধে ২০০ ডলার বা তার বেশি অর্থমূল্যের খাদ্য সহায়তা জালিয়াতির একটি মামলা এখনো বিচারাধীন, যা তৃতীয় ডিগ্রির অপরাধ হিসেবে গণ্য।
ডালাসের উপশহর গারল্যান্ডের পুলিশ জানায়, ১ নভেম্বর একটি ওয়ালমার্ট দোকান থেকে পণ্য মূল্য পরিশোধ না করার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এ মামলাটি (মিসডিমিনার) এখনো ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল হয়নি।
পাকতিয়াওয়াল আফগানিস্তানে প্রায় এক দশক ধরে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসেন।
বিবাহিত পাকতিয়াওয়াল ডালাসের উপশহর রিচার্ডসনে বসবাস করছিলেন। জুলি জনসন জানান, পরিবারের কাছ থেকে তিনি জেনেছেন, পাকতিয়াওয়াল আশ্রয়ের (অ্যাসাইলাম) জন্য আবেদন করেছিলেন এবং সেটি প্রক্রিয়াধীন ছিল। কিন্তু আইসিই কর্মকর্তাদের দাবি, তিনি আশ্রয়ের জন্য নির্ধারিত সাক্ষাৎকারগুলোতে উপস্থিত ছিলেন না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

