ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে নজরদারি ও তদন্ত বাড়ানোর প্রস্তুতি ডেমোক্র্যাটদের

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে নজরদারি ও তদন্ত বাড়ানোর প্রস্তুতি ডেমোক্র্যাটদের

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে হারিয়ে কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে দলটি। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের মেয়াদের বাকি দুই বছর আইন প্রণয়ন, সরকারি নীতি বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

গত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তোষ নির্বাচনে দলটির সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা ২৫৩টি এবং রিপাবলিকানরা ১৫৭টি আসনে জয় পেয়েছেন। বাকি আসনগুলোর ফল তখনো চূড়ান্ত হয়নি। অন্যদিকে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪টি এবং রিপাবলিকানদের ৪৪টি। দুটি আসনের ফল তখনো বাকি ছিল। ফলে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাল রিপাবলিকানরা

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে ১০০টি এবং নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ৪৩৫টি আসন রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে অন্তত ২১৮টি আসন প্রয়োজন। সিনেটে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৫১টি আসন।

নির্বাচনের আগে সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩টি আসন ছিল। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে থাকা স্বতন্ত্র সদস্যদের নিয়ে বিরোধী শিবিরের আসন ছিল ৪৭টি। এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সাতটি আসন ডেমোক্র্যাটদের দখলে চলে যায়। ফলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারায় ট্রাম্পের দল।

সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা অন্তত ৫৪-৪৪ ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদে অন্তত ৩০টি আসন বাড়িয়েছে দলটি। ভোট গণনা ও ফল ঘোষণা অব্যাহত থাকায় আসনসংখ্যায় আরও পরিবর্তন হতে পারে।

রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও ডেমোক্র্যাটদের জয়

এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের প্রভাবাধীন কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে।

টেক্সাসে সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকো। গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে অঙ্গরাজ্যটিতে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হননি। ফলে তালারিকোর জয়কে দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সাউথ ক্যারোলাইনাতেও রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলিন গ্রাহামকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। এ ছাড়া আইওয়ায় জশ টুরেক, কানসাসে অ্যাডাম হ্যামিলটন এবং মেইনে ট্রয় জ্যাকসন সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন।

কানসাসে প্রায় ৯৪ বছর পর কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে মেইনে দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ট্রয় জ্যাকসন।

এ ছাড়া ওহাইওতে সাবেক সিনেটর শেরড ব্রাউন রিপাবলিকান প্রার্থী জন হাস্টেডকে পরাজিত করেছেন। উত্তর ক্যারোলাইনায় জয় পেয়েছেন রয় কুপার। এসব ফলাফলে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্য থাকা অঞ্চলগুলোতেও ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তন স্পষ্ট হয়েছে।

কেন ট্রাম্পের দলকে প্রত্যাখ্যান করলেন ভোটাররা

ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির প্রতি অসন্তোষ ডেমোক্র্যাটদের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এবং সরকারি কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে।

প্রায় দুই হাজার ১০০টি কাউন্টির মধ্যে ৯৯ শতাংশ এলাকায় রিপাবলিকানদের ভোটের অংশ কমেছে। এসব এলাকায় ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পাওয়া ভোটের তুলনায় এবার রিপাবলিকানদের সমর্থন গড়ে ৯ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।

বিশেষ করে হিস্পানিক অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি সমর্থন বেড়েছে। এ ধরনের ৬৪টি কাউন্টিতে সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভোটের অংশ ২০২৪ সালের তুলনায় ১৪ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।

ট্রাম্পের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন বাড়ানোর জন্য কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে ডেমোক্র্যাটরা ভালো ফল করেছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের সুযোগ বাড়বে

কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে ডেমোক্র্যাটদের সামনে।

প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব এখন বিরোধী দলের হাতে যাবে। ফলে প্রশাসনের নীতিনির্ধারণ, সরকারি ব্যয়, বিভিন্ন চুক্তি এবং প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তদন্ত ও শুনানির উদ্যোগ নিতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা।

এ ছাড়া প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কংগ্রেসে তলব, সরকারি নথিপত্র চাওয়া এবং বিভিন্ন বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষমতাও বাড়বে।

ডেমোক্র্যাট নেতারা ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেসিডেন্টের পরিবারের আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত জোরদারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এতে ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময় রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে।

নতুন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস স্পিকার পদে দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তিনি এরই মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর কঠোর নজরদারিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

আইন প্রণয়নে বাধার মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। নতুন কোনো আইন পাস করতে হলে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে বাজেট, সরকারি ব্যয় এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তে দুই দলের মধ্যে সমঝোতা জরুরি হয়ে পড়বে।

তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে। তিনি কংগ্রেসে পাস হওয়া কোনো বিলে ভেটো দিতে পারবেন। সেই ভেটো অকার্যকর করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে।

অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ট্রাম্প প্রশাসনের সব সিদ্ধান্ত সরাসরি বাতিল করতে পারবেন না। তবে আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করার মতো রাজনৈতিক ক্ষমতা তাদের হাতে থাকবে।

নির্বাচনের ফল নিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, এটি তার জন্য ব্যক্তিগত পরাজয় নয়। তিনি রিপাবলিকান প্রার্থীদের মান এবং নির্বাচনী পরিস্থিতিকে দলের পরাজয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান নেতারা ডেমোক্র্যাটদের বিভিন্ন উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি করেছে। হোয়াইট হাউস রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আইনসভার দুই কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনকে আগামী দুই বছর বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করেই এগোতে হবে।

সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), দ্য গার্ডিয়ান ও ব্যালটপেডিয়া

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন