যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ডাকযোগে পাঠানো প্রায় ২০ হাজার ব্যালট আলাদা করে রাখার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের করা আবেদন খারিজ করে দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। প্রশাসনের দাবি ছিল, এসব ব্যালটের ভোটারদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরা রয়েছেন, যারা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন। তবে নাগরিকত্ব যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এসব ভোট গণনা বন্ধ রাখার আবেদন নাকচ করে দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগের দিন সোমবার এ সিদ্ধান্ত আসে। ট্রাম্প প্রশাসন আবেদন করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে তা খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট। তবে আবেদন প্রত্যাখ্যানের পক্ষে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি আদালত। এক বাক্যের আদেশে সিদ্ধান্তটি জানানো হয়।
আদেশে বলা হয়েছে, আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশ চেয়ে বিচারপতি এলেনা কাগানের কাছে যে আবেদন করা হয়েছিল এবং তিনি তা আদালতের কাছে পাঠিয়েছিলেন, সেটি নাকচ করা হয়েছে।
নিম্ন আদালতে পরাজয়ের পর নির্বাচনের মাত্র এক দিন আগে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এর আগে আপিল আদালতসহ নিম্ন আদালতগুলো দুই দফায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি শুনতে অস্বীকৃতি জানানোয় নিম্ন আদালতের রায় বহাল থাকছে। ফলে বিতর্কিত ব্যালটগুলো আলাদা করে রাখার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ মুহূর্তের প্রচেষ্টাও কার্যত ব্যর্থ হলো।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ অভিযোগ করেছিল, ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটার তালিকায় প্রায় ২০ হাজার ‘সম্ভাব্য’ অ-নাগরিক রয়েছেন। তাদের নাগরিকত্ব যাচাই না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ভোট গণনা বন্ধ রাখতে একটি ফেডারেল বিচারকের কাছে আবেদন জানায় বিভাগটি।
তবে ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মকর্তারা ওই সংখ্যার বিষয়ে আপত্তি জানান। তাদের যুক্তি ছিল, এসব ভোট গণনা না করার দাবি জানানোর এখতিয়ার ট্রাম্প প্রশাসনের নেই। বিচার বিভাগ আদালতের কাছে আবেদন করেছিল, যাতে অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রায় ২০ হাজার ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট আলাদা করে রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রশাসনের আশঙ্কা ছিল, এসব ব্যালট অবৈধভাবে ভোট দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক ভোট জালিয়াতি হয়।
তার অভিযোগ, ডেমোক্র্যাটরা অভিবাসীদের অবৈধভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ দিয়ে নির্বাচন চুরি করে। এ ক্ষেত্রে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাকে দায়ী করেন তিনি। অনেক ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্যে এ পদ্ধতিতে ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় নিবন্ধিত ভোটার প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ। একাধিক নিম্ন আদালত অঙ্গরাজ্যটির নির্বাচন কর্মকর্তাদের পক্ষে রায় দিয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল, ফেডারেল সরকার অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের পাশাপাশি নির্বাচনের ফল নিয়ে সন্দেহ তৈরি করতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে ক্যালিফোর্নিয়ার আসনসংখ্যা ৫২। অন্য যেকোনো অঙ্গরাজ্যের তুলনায় এটি বেশি। বিভিন্ন গবেষণা ও অঙ্গরাজ্যভিত্তিক নিরীক্ষায় দেখা গেছে, ভোট দেওয়ার অযোগ্য ব্যক্তিদের ভোট দেওয়া, যার মধ্যে অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে, খুবই বিরল।
৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ নির্বাচনে ভোটাররা কংগ্রেসের দুই কক্ষ—সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচন করবেন। এরই মধ্যে লাখ লাখ মার্কিন নাগরিক ভোট দিয়েছেন। জর্জিয়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে আগাম ভোটের নতুন রেকর্ড হয়েছে। অঙ্গরাজ্যটির মোট নিবন্ধিত ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ ইতিমধ্যে ভোট দিয়েছেন।
নির্বাচনি প্রচারণার শেষ মুহূর্তে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের প্রার্থীরাই ভোটারদের কাছে শেষবারের মতো নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরছেন। ওয়াশিংটন ডিসিতে লিংকন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুলের বাইরে ভাষণ দিয়ে প্রচারণা শেষ করেন ট্রাম্প।
প্রথমে ওয়াশিংটন ডিসির সংস্কারকাজ নিয়ে প্রায় ২৫ মিনিট কথা বলেন তিনি। এরপর মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রসঙ্গে কথা বলেন। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ডেমোক্র্যাট পার্টি মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে চরমপন্থি ও বিপজ্জনক প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে।
তার ভাষায়, ‘এরা এখন পর্যন্ত উপস্থাপিত সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রার্থী।’
ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে উগ্র কর্মসূচি ও ‘বিপজ্জনক মতাদর্শ’ অনুসরণের অভিযোগও তোলেন ট্রাম্প। এ সময় অভিবাসন ও ট্রান্সজেন্ডার অধিকার নিয়ে দলটির অবস্থানের সমালোচনা করেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য আমাদের দেশ, আমাদের সংস্কৃতি ও আমাদের ঐতিহ্য রক্ষা করব।’
পরে ফক্স নিউজের উপস্থাপক শন হ্যানিটির অনুষ্ঠানে ফোনে যুক্ত হন ট্রাম্প। এ সময় রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের অধীনে তার প্রশাসনের ‘দুটি দারুণ বছর’ কেটেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ট্রাম্প জানান, গত ২৭ দিনে তিনি ৩১টি নির্বাচনি সমাবেশ করেছেন। পাশাপাশি অংশ নিয়েছেন বেশ কয়েকটি টেলি-সমাবেশে। এসব সমাবেশে কোনো রাজনীতিক সরাসরি উপস্থিত না থেকে ফোনের মাধ্যমে যুক্ত হন।
হ্যানিটিকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের আবার সারা বিশ্বে সম্মান করা হচ্ছে।’ সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ‘হাসাহাসি করা হয়েছিল’ বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে নির্বাচনের আগে ইরানের একটি দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার খবর প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ ও দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়।
সোমবার দিনের শুরুতে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা বাড়ানোর বিষয়ে তার ‘কোনো তাড়া নেই’।
সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে তিনি বলেন, ‘একভাবে বা অন্যভাবে আমরা কিছু করব, কিন্তু কোনো তাড়া নেই। আমরা আর্থিকভাবে তাদের পঙ্গু করে দিয়েছি।’
ট্রাম্প আরো বলেন, ‘তাদের কাছে কোনো অর্থ নেই, কোনো জ্বালানি নেই এবং তাদের জনগণ এতে খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়ছে।’
সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে এক অনুষ্ঠানে এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তিনি ইরানের ওপর আবার হামলা শুরু করবেন কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না।’
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সেন্টকমের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিবিসি। তবে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কিছু জানানো হয়নি।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

