অবসাদ নিরাময়কারী ওষুধ ব্যবহারে রেকর্ড, অতিরিক্ত প্রেসক্রিপশনই কি কারণ

অবসাদ নিরাময়কারী ওষুধ ব্যবহারে রেকর্ড, অতিরিক্ত প্রেসক্রিপশনই কি কারণ

যুক্তরাজ্যে অবসাদ নিরাময়কারী (অ্যান্টি-ডিপ্রেসান্ট) ওষুধ ব্যবহারের হার রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫–২৬ সালে দেশটির প্রায় প্রতি সাতজনের একজনকে অ্যান্টি-ডিপ্রেসান্টের অন্তত একটি প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয়েছে। এই বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে চিকিৎসকেরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ওষুধ দিচ্ছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমস্যাটিকে শুধু ‘অতিরিক্ত প্রেসক্রিপশন’ হিসেবে দেখলে প্রকৃত কারণটি ভুলভাবে চিহ্নিত করা হবে।

অ্যান্টি-ডিপ্রেসান্ট ব্যবহারের বৃদ্ধি যুক্তরাজ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কোভিড-১৯ মহামারি ও লকডাউনের পর যুক্তরাজ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের বিষণ্নতার উপসর্গ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজনের পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিলেও এই হার প্রায় একই রকম ছিল। তরুণদের মধ্যে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক; ইংল্যান্ডে প্রতি চারজন তরুণের একজনের কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অ্যান্টি-ডিপ্রেসান্ট ব্যবহারের সঙ্গে দারিদ্র্যের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলগুলোতেই ওষুধ ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। নর্থ ইস্ট ও নর্থ কামব্রিয়া ইন্টিগ্রেটেড কেয়ার বোর্ড এলাকায় প্রতি এক হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় ২০০ জনকে অ্যান্টি-ডিপ্রেসান্ট দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য থেকে তৈরি চাপ মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে এবং এ কারণেই দরিদ্র অঞ্চলে অ্যান্টি-ডিপ্রেসান্টের ব্যবহার বেশি।

অ্যান্টি-ডিপ্রেসান্টের পরিবর্তে কাউন্সেলিং বা কগনিটিভ বিহেভিয়োরাল থেরাপির মতো চিকিৎসা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হলেও বাস্তবে এসব সেবা পাওয়া অনেক রোগীর জন্য কঠিন। এনএইচএসে এ ধরনের থেরাপির জন্য অনেক সময় মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। সবচেয়ে দরিদ্র এলাকাগুলোতে এই সুযোগ আরও সীমিত। বিপরীতে, প্রয়োজন হলে অ্যান্টি-ডিপ্রেসান্ট তুলনামূলক দ্রুত পাওয়া যায়। ফলে চিকিৎসার বিকল্পগুলোর অসম প্রাপ্যতাও ওষুধ ব্যবহারের হার বাড়ানোর একটি কারণ।

চিকিৎসকেরা ইচ্ছামতো অ্যান্টি-ডিপ্রেসান্ট লিখে দেন—অতিরিক্ত প্রেসক্রিপশনের অভিযোগের বিষয়ে এমন ধারণা সঠিক নয়। জিপিরা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার এক্সেলেন্সের নির্ধারিত ক্লিনিক্যাল নির্দেশনা অনুসরণ করেন। এসব নির্দেশনায় কম তীব্রতার বিষণ্নতায় রোগীর পছন্দ ছাড়া নিয়মিতভাবে অ্যান্টি-ডিপ্রেসান্টকে প্রথম সারির চিকিৎসা হিসেবে দেওয়ার পরামর্শ নেই। ফলে প্রেসক্রিপশনের বৃদ্ধির পেছনে রোগীর প্রকৃত চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে অ্যান্টি-ডিপ্রেসান্ট ব্যবহারের রেকর্ড মাত্রাকে কোনোভাবেই সমস্যা নয় বলে উড়িয়ে দেননি। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় গভীর সংস্কার এবং আরো অর্থায়ন প্রয়োজন। শুধু ওষুধের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো মোকাবিলা করতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে সংকট মোকাবিলা থেকে প্রতিরোধমূলক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার দিকে যাওয়ার জন্য নতুন কৌশলের কথা জানিয়েছে।

যুক্তরাজ্যে এত বেশি মানুষ অ্যান্টি-ডিপ্রেসান্ট গ্রহণ করছেন—এটি বাস্তবেই উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু এর কারণ হিসেবে শুধু চিকিৎসকদের অতিরিক্ত প্রেসক্রিপশনকে দায়ী করা হলে সমস্যার মূল কারণকে ভুলভাবে চিহ্নিত করা হবে। এর পেছনে রয়েছে কোভিড-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্য সংকট, দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ এবং পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব। অর্থাৎ অ্যান্টি-ডিপ্রেসান্ট ব্যবহারের রেকর্ড বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের একটি উপসর্গ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন