গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপে হুথি, বন্ধ সৌদির তেল পাইপলাইন

গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপে হুথি, বন্ধ সৌদির তেল পাইপলাইন
ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে নতুন করে চাপে পড়েছে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ। লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত পেরিম দ্বীপে পৌঁছে গেছে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি। একই সময়ে ইরাক থেকে আসা ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার ইয়েমেন সরকারের চারটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, হুথিরা পেরিম দ্বীপে পৌঁছেছে। দ্বীপটি বাব আল-মান্দেব প্রণালির মুখে অবস্থিত। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটির ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হুথিদের অগ্রযাত্রার সঙ্গে সৌদি তেল সরবরাহের ওপর তৈরি হয়েছে নতুন চাপ। হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি আরবের জন্য পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেটিও এখন সাময়িকভাবে বন্ধ।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বাব আল-মান্দেব ঘিরে হুথিদের অগ্রগতিতে। ইরানের মিত্র এই গোষ্ঠী যদি প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তাহলে আরব উপদ্বীপের দুই পাশে থাকা দুটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথই ইরানের প্রভাবের মধ্যে চলে আসতে পারে। এতে তেল সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

হুথিদের অগ্রযাত্রা থামাতে সৌদি আরব ওয়াশিংটনের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে নভেম্বরের কংগ্রেশনাল নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান পার্টি রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে নতুন এই উত্তেজনায় ওয়াশিংটন কতটা সরাসরি যুক্ত হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের দুটি সূত্র জানিয়েছে, তাদের বাহিনী পেরিম থেকে সরে গেছে। একই সময়ে হুথিরা মূল ভূখণ্ডের লোহিত সাগর উপকূলীয় শহর ধুবাব দখল করেছে। শহরটি পেরিম দ্বীপের ঠিক বিপরীতে।

বর্তমান যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালায়। এরপর হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। হরমুজের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব লোহিত সাগরপথের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

এর মধ্যেই সৌদি আরবের রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে একাধিক হামলা হয়েছে। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক সূত্রের বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এসব হামলার পর পাইপলাইনের সক্ষমতাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

হামলাটি কারা চালিয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সৌদি আরব জানিয়েছে, ড্রোনগুলো ইরাক থেকে এসেছিল। ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র মিলিশিয়াদের উপস্থিতি রয়েছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের পর এখন পর্যন্ত রিয়াদ কোনো পাল্টা হামলা চালায়নি। ইরাক সরকারও হামলার নিন্দা জানিয়েছে।

সৌদি আরবের জন্য এই পাইপলাইনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা এর সক্ষমতা থেকেই বোঝা যায়। ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল বৈশ্বিক বাজারে পাঠানোর প্রধান বিকল্প পথ। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের হিসাবে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এতে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। এই পরিমাণ বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ৪ থেকে ৫ শতাংশ।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাইপলাইনে হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে। তবে সৌদি তেল রপ্তানিতে এর প্রভাব কতটা পড়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা শুক্রবার জানিয়েছে, সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হুথি-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর হামলাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

এর প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারেও। শুক্রবার তেলের দাম কিছুটা কমলেও সপ্তাহ শেষে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকার পথে রয়েছে। মে মাসের মাঝামাঝির পর এই প্রথম এমনটি হতে যাচ্ছে।

তবে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য সব ধরনের নৌযানের জন্য সামুদ্রিক চলাচল নিরাপদ। সৌদি জাহাজের ওপর আগে ঘোষণা করা নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৌদি আরব সরাসরি মার্কিন সহায়তা চেয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র শুক্রবার রয়টার্সকে জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার অন্তত দুবার ট্রাম্পকে ফোন করে সামরিক সহায়তার অনুরোধ করেন। এর আগে অ্যাক্সিওসও একই তথ্য জানিয়েছিল।

সূত্রগুলো বলেছে, ওয়াশিংটন আপাতত হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে রাজি হয়নি। তবে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সৌদি আরবকে সহায়তার কথা জানিয়েছে।

ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজের ফোনালাপ নিয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউস। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে ওয়াশিংটন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন