ভুটানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

মানুষের সুখ ও কল্যাণ যেভাবে গণতন্ত্রের মাপকাঠি

মানুষের সুখ ও কল্যাণ যেভাবে গণতন্ত্রের মাপকাঠি

গণতন্ত্রের সাফল্য শুধু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কিংবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; নাগরিকের জীবনমান, নিরাপত্তা, মর্যাদা, সামাজিক আস্থা ও সামগ্রিক কল্যাণও গণতন্ত্রের কার্যকারিতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হতে পারে। ‘হোয়্যার হ্যাপিনেস ইজ আ মেজার অভ গভর্ন্যান্স: হোয়াট ভুটান্‌জ ডেমোক্র্যাটিক কনসলিডেশন ক্যান টিচ গ্লোবাল সাউথ নেশন্স’ শীর্ষক নিবন্ধে এমনই একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।

নিবন্ধকার সামিয়া ইফফাতের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মেরুকরণ, বৈষম্য, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকট, আইনের শাসনের দুর্বলতা এবং জনঅংশগ্রহণের ঘাটতি গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে ভুটানের রাজনৈতিক রূপান্তর ও ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ ধারণা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বিকল্প চিন্তার সুযোগ তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

ভুটান একটি নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র থেকে সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। এই পরিবর্তন ব্যাপক গণআন্দোলন বা বাইরের চাপের মাধ্যমে ঘটেনি; বরং দেশটির নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ও ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ ধারণার সঙ্গে এর রূপান্তরকে যুক্ত করা হয়েছে। সাবেক রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুকের সময় থেকেই এই ধারণা বিকশিত হয়। তার দর্শনে শুধু মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি দিয়ে উন্নয়ন পরিমাপের পরিবর্তে মানুষের সুখ, কল্যাণ ও পরিবেশ সুরক্ষাকেও উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ভুটানের ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ চারটি প্রধান ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত—টেকসই ও ন্যায্য আর্থসামাজিক উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ এবং সুশাসন। এসব ভিত্তিকে আরও নয়টি ক্ষেত্রে মূল্যায়ন করা হয়। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের জীবনমান, সামাজিক সম্পর্ক, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও প্রশাসনের কার্যকারিতাকেও উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা হয়।

ভুটান সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও গ্রামীণ উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করেছে। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণকে রাষ্ট্রীয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছে। দেশটির ৭০ শতাংশের বেশি ভূমি বনাঞ্চলের আওতায় রয়েছে এবং সংবিধানেও বন সংরক্ষণের বিষয়টি সুরক্ষিত করা হয়েছে। লেখাটিতে ভুটানকে বিশ্বের একমাত্র কার্বন-নেগেটিভ দেশ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য ভুটানের পরিবেশনীতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নদীদূষণ, বন উজাড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ম্যানগ্রোভ ধ্বংস এবং অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের মতো পরিবেশগত ঝুঁকি শুধু প্রকৃতির ওপর নয়, মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপরও প্রভাব ফেলছে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে শুধু পরিবেশগত বিষয় হিসেবে না দেখে মানবনিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সাংস্কৃতিক সংরক্ষণকেও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার একটি অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। ভুটান গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পাশাপাশি নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশেরও দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। তবে লেখকের মতে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের পরিবর্তে বহুত্ববাদ, অন্তর্ভুক্তি ও সংখ্যালঘু অধিকারের প্রতি সম্মান রেখে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

‘সুশাসন’কে ভুটানের সুখের ধারণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কার্যকর প্রশাসন, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, দ্রুত সেবা প্রদান এবং জনআস্থাকে নাগরিক কল্যাণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। এ দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত গণতান্ত্রিক ধারণার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিমূলক সরকারকে গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

শুধু নির্দিষ্ট সময় পরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই গণতন্ত্র কার্যকর হয়েছে বলা যায় না। নাগরিক যদি অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ, সামাজিকভাবে সংযুক্ত, ব্যক্তিগতভাবে মর্যাদাপূর্ণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাশীল বোধ করেন, তাহলে গণতন্ত্র আরও স্থিতিশীল হতে পারে। এ কারণে গণতন্ত্রের মূল্যায়নে মানুষের বস্তুগত, সামাজিক ও ব্যক্তিগত কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গত দুই দশকে দেশটি জীবন প্রত্যাশা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুমৃত্যু কমানো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে একই সময়ে গণতন্ত্রের বিভিন্ন সূচকে দেশটির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উন্নয়নে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নির্বাচনী প্রতিযোগিতার দিকে নজর না দিয়ে নাগরিক কল্যাণ, মানবিক মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষে ভুটানের মডেল হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব বা প্রয়োজনীয় নয়। দুই দেশের আয়তন, জনসংখ্যা, রাজনৈতিক ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বৈচিত্র্যের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। বরং ভুটানের অভিজ্ঞতা থেকে নীতিগত শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি মানবকেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি জনআস্থা, সরকারি সেবায় সন্তুষ্টি এবং মানুষের মানসিক সুস্থতার মতো বিষয়ও মূল্যায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি জলবায়ু অভিযোজন, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, নদী পুনরুদ্ধার ও নগর পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সামাজিক সংহতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্য শুধু ব্যালট বাক্সে প্রকাশ পায় না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকের দৈনন্দিন জীবন কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও কল্যাণমুখী করতে পারছে—তার ওপরও গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে। ভুটানের ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ দর্শন এ কারণে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গণতন্ত্রকে আরও মানবকেন্দ্রিক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...