১৪ আগস্ট ১৯৪৭

গোলামি থেকে স্বাধীনতা, জাতি গঠন ও স্বাধীন রাষ্ট্রের বুনিয়াদ

গোলামি থেকে স্বাধীনতা, জাতি গঠন ও স্বাধীন রাষ্ট্রের বুনিয়াদ

বাংলাদেশ রাজনৈতিক ইতিহাস বহু দীর্ঘ, বহু স্তরের। এই ভূখণ্ড কখনো বড়তর বঙ্গের কেন্দ্র, কখনো স্বাধীন সুলতানি বাংলা, কখনো মোগল সাম্রাজ্যের সুবাহ (প্রদেশ), কখনো ব্রিটিশ বাংলা এবং শেষ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান হয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ হয়। এই দীর্ঘ ইতিহাসে ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই দিনে ব্রিটিশ পরাধীনতা থেকে পূর্ব পাকিস্তান নামে বাংলা স্বাধীন হয়। এই স্বাধীনতা পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা ও রাজনৈতিক কাঠামোকে স্থায়ী ভিত্তি দেয়।

ঐতিহাসিক বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ স্বাধীনতা প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ। ১২০৪ পর্যন্ত বাংলায় ছিল দক্ষিণ ভারত থেকে আসা ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন শাসন। সেন আমল ছিল বাংলার মানুষের জন্য চরম দুঃসময়। সে সময় বাংলার সমাজ কঠোর বর্ণপ্রথা ও ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যের অধীনে পিষ্ট ছিল। সমাজের বড় অংশ—বিশেষ করে নিম্নবিত্ত, প্রান্তিক কৃষক-দলিত ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ছিল চরম নিপীড়নের শিকার। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে মহাবীর বখতিয়ার বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে সেন শাসন শেষ হয় এবং বাংলায় সাম্যবাদী শাসন শুরু হয়। বখতিয়ারের বাংলাবিজয় ছিল মূলত বাংলার জনগণের মুক্তি। তাই জনগণ বখতিয়ারকে স্বাগত জানায়। তার সাম্যবাদী আদর্শ গ্রহণ করে। এর পরবর্তী কয়েক শতকে বাংলার সুলতানরা দিল্লির অধীনতা অস্বীকার করে বাংলাকে একাধিকবার স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করেন।

বিজ্ঞাপন

১৩৫২ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলাকে প্রথমবার একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাজনৈতিক ভূখণ্ড ও ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। বাংলার নামে তার সাম্রাজ্যের নাম রাখেন ‘সালতানাতে বাঙ্গাল’। নিজের জন্য উপাধি ধারণ করেন ‘শাহে বাঙ্গালিয়ান’ বা ‘শাহে বাঙ্গাল’Ñবাংলা বা বাঙালির শাসক। ইতিহাসে প্রথমবার বাঙালিরা স্বাধীন রাষ্ট্র পায়, বাঙালি পরিচয় পায়, পায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা। সে সময় থেকে মোগল শাসনের আগ পর্যন্ত বাংলা ছিল নিজস্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক দক্ষতায় বিশ্বের অন্যতম উন্নত সাম্রাজ্য।

১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে মোগলরা বাংলা জয় করে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠা করলেও বাংলার সামগ্রিক উন্নতির চিত্র বদল হয়নি। বরং সুবাহ বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম ধনী অঞ্চল হিসেবে বিকশিত হয়। পরবর্তীকালে মুর্শিদকুলি খান, আলীবর্দী খান ও সিরাজউদ্দৌলার সময় বাংলা কার্যত একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল।

এরপর আসে ১৭৫৭। ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় শুধু এক নবাবের পরাজয় না; বাংলার রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের ওপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উপনিবেশের শুরু। পলাশীর যুদ্ধ বাংলার স্বাধীনতা হরণ করে এবং বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি তৈরি করে। বাংলা শত শত বছরের স্বাধীন সময়ের পর ব্রিটিশ পরধীনতায় আবদ্ধ হয়।

ব্রিটিশ শাসন বাংলাকে শুধু রাজনৈতিকভাবে অধীন করেনি; বাংলার অর্থনৈতিক কাঠামোকেও আমূল পরিবর্তন করেছে। বাংলার সম্পদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে ব্যবহৃত হয়েছে। স্থানীয় শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য ও রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর ঔপনিবেশিক নীতির গভীর প্রভাব পড়ে। বিশ্বের অন্যতম উন্নত সাম্রাজ্য থেকে বাংলা ধীরে ধীরে পরিণত হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের লুট ও বাণিজ্যিক স্বার্থসাধনের প্রধান অঞ্চলে। বাংলার সম্পদ-সভ্যতা লুঠ হতে থাকে, তাতে সমৃদ্ধ হতে থাকে লুটেরা ব্রিটেন। বাংলা গরিব হতে থাকে আর ধনী হতে থাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য।

এই পরাধীনতা থেকে মুক্তির চেষ্টা বাংলা-পাক-ভারতের মুসলমানরা শুরু থেকেই চালিয়ে যাচ্ছিল। হিন্দু সমাজ পরে ধীরে ধীরে যুক্ত হয়। তিতুমীরের সংগ্রাম, সন্ন্যাসী-ফকির প্রতিরোধ থেকে শুরু করে কৃষকবিদ্রোহ, সিপাহি বিদ্রোহ, ফরায়েজি আন্দোলন, নীলবিদ্রোহ—বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলার মানুষ ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই প্রতিরোধগুলোর চরিত্র এক ছিল না, কিন্তু এগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন বোধ ছিল—বহিরাগত ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং বাংলা-পাক-ভারতের স্বাধীনতা।

বাঙালি মুসলমান জাতি গঠন

ব্রিটিশ শাসনে বাংলার হিন্দু ও মুসলমান সমাজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আলাদা হতে থাকে। শিক্ষায়, চাকরিতে, জমির মালিকানায়, নগর অর্থনীতিতে এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে দুই সম্প্রদায়ের অবস্থানের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্রিটিশদের বিভাজনমূলক নীতি, জমিদারি কাঠামো এবং আধুনিক শিক্ষার অসম বিস্তার।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এই দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে নতুন প্রদেশ গঠিত হলে ঢাকাকে রাজধানী করা হয়। পূর্বাঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এটিকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সম্ভাবনা হিসেবে দেখে। অন্যদিকে কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্তের বড় অংশ এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ বাতিল হয়।

এরপর ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা—বাংলার দুই প্রধান সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একই ধরনের রাষ্ট্রকল্পনা আর কাজ করছে না।

এবনে গোলাম সামাদ বলেন, দ্বিজাতিতত্ত্বের, অর্থাৎ হিন্দুরা হলেন একটি জাতি আর মুসলমানরা হলেন আরেকটি জাতি’; এই ধারণার উদ্ভব হয় ব্রিটিশ শাসনামলের সময়।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হারবার্ট হেনরি অ্যাসকুইথ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সে ১৯০৯ সালে বলেন, ভারতে হিন্দু-মুসলমান পার্থক্য শুধু ধর্মের পার্থক্য নয়। ঐতিহ্য ও সামাজিক রীতিনীতির দিক দিয়েও তারা স্বতন্ত্র।’

একদিকে বাঙালি হিন্দু সমাজের বড় অংশ হিন্দু পরিচয়কে প্রধান ধরে হিন্দুস্তানি তথা ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও ভারত রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে। অন্যদিকে বাংলার মুসলমানরা ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মুসলিম রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য, প্রতিনিধিত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে পৃথক রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হয়। মুসলমানদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্রের আন্দোলনে বাঙালি মুসলমান নেতৃত্ব দেয় এবং জনগণ ব্যাপকভাবে যুক্ত হয়।

এখানে বাংলার দুটি প্রধান পক্ষ-মুসলমান ও হিন্দু-আলাদা জাতি হয়ে ওঠার সাধনায় লিপ্ত হয়। ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তা আর প্রাসঙ্গিক থাকে না। নতুন জাতির বিকাশের জন্য বাঙালি মুসলমান নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার জন্য এবং বাঙালি হিন্দু হিন্দুস্তানের নাগরিক হয়ে থাকার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়।

শত শত বছরের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই-সংগ্রামের ফলে ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানসমন্বিত অখণ্ড পাকিস্তানের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়। যে বাংলা তখন পূর্ব পাকিস্তান নাম পায়, ব্রিটিশ-মোগল-সুলতানি আমলজুড়ে এর নাম ছিল বাংলাÑকখনো বাংলা সালতানাত, কখনো সুবাহ বাংলা, কখনো বেঙ্গল প্রভিন্স। চরিত্র-কাঠামো বদলেছে, নাম অবদলিত ছিল। পাকিস্তানের নামও বাংলাকে বেশি দিন ধারণ করতে হয়নি। তেইশ বছরের পাকিস্তান আমল শেষ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। বাঙালি মুসলমান যে স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করেছিল শত বছর ধরে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক সাফল্য। এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানা ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি গঠিত হয় ১৯৪৭ সালে। একাত্তরে সে ভিত্তির ওপর স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন