ইরান ইস্যুতে ভয়াবহ সংকটে ওয়াশিংটন, নতুন করে বিপদ বাড়ছে ট্রাম্পের

ইরান ইস্যুতে ভয়াবহ সংকটে ওয়াশিংটন, নতুন করে বিপদ বাড়ছে ট্রাম্পের

ইরানকে ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারো এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছেন, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই আগের চেয়ে আরো কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযান কাঙ্ক্ষিত ফল না দেওয়ায় এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কূটনৈতিক উদ্যোগ, সামরিক চাপ বৃদ্ধি কিংবা অর্থনৈতিক অবরোধ প্রতিটি বিকল্পই বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিজ্ঞাপন

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, টানা ১৩ রাত বিমান হামলার পর তিন রাতের জন্য হামলা স্থগিত রাখা হয়েছে, যাতে কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়। তবে একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারো সামরিক অভিযান জোরদার করতে প্রস্তুত।

এদিকে ইরান জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি তেহরান। এই ইস্যুকেই বর্তমান উত্তেজনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রায় পাঁচ মাস আগে শুরু হওয়া সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হলেও বাস্তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক চাপ বাড়িয়ে ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে চাইলেও সেই কৌশল প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।

সীমিত হয়ে আসছে বিকল্প

যুক্তরাষ্ট্র চাইলে স্থলবাহিনী মোতায়েন করে সামরিক চাপ আরো বাড়াতে পারে। তবে এমন সিদ্ধান্তে মার্কিন সেনাদের ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে, যা ইতোমধ্যেই যুদ্ধবিরোধী জনমতকে আরো শক্তিশালী করতে পারে।

অন্যদিকে ইরানের পরিবহন অবকাঠামো ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে অর্থনীতিকে আরো দুর্বল করার বিকল্পও রয়েছে। তবে এতে সাধারণ ইরানি নাগরিকদের দুর্ভোগ বাড়বে এবং তাতেও তেহরানের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

এছাড়া ইরানের জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা পুনরায় শুরু করতে পারে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন সংকট সৃষ্টি করবে।

বাড়ছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ

যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যেই বিশ্ববাজারে পড়তে শুরু করেছে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যদিও রোববার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৫ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের বিকল্প তেল পরিবহন পথেও হামলার হুমকি দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের মজুত কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে। আর এ সংকটের মধ্যেই আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।

হোয়াইট হাউসেও মতপার্থক্য

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউসের এক বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন যুদ্ধ আরো বিস্তৃত করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সক্ষমতা নিয়ে তারা সতর্ক করেছেন।

একই সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বিমান হামলা ইরানকে আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করতে পারবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

নতুন পথের খোঁজে যুক্তরাষ্ট্র

পরিস্থিতি মোকাবিলায় আবারো যুদ্ধবিরতির মতো একটি সমঝোতায় ফেরার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। তবে তেহরান হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি পূরণ না হলে এমন কোনো চুক্তিতে রাজি হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি সেই দাবি মেনে নেয়, তবে তা ওয়াশিংটনের জন্য রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কংগ্রেস ও জনগণের সঙ্গে একটি জাতীয় সংলাপ শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, এমন একটি নতুন কৌশল প্রয়োজন, যাতে ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ না পায় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়াতে না হয়।

জনমতেও বাড়ছে অনিশ্চয়তা

সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন। ৪০ শতাংশ মনে করেন, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। আর ৭৬ শতাংশের মতে, যুদ্ধটি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।

তবে হোয়াইট হাউসের দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রশাসন এখনও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সূত্র: সিএনএন

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন