গালাগালি নয় গলাগলি জরুরি

কাকন রেজা

গালাগালি নয় গলাগলি জরুরি

অসহায়ের প্রতিবাদের স্বরূপ কী? ধরুন, আপনি একজন সবল মানুষ, পরাক্রমশালী। আপনার দ্বারা আক্রান্ত একজন পরাক্রমহীন, দুর্বল মানুষের প্রতিবাদের স্বরূপ কী হতে পারে? রাস্তায় যখন একজন ক্ষমতাবান মানুষ একজন রিকশাওয়ালাকে থাপ্পড় দেয়, সেই রিকশাওয়ালার অসহায় ক্ষোভের প্রকাশ কী? মনস্তত্ত্ব কী বলে?

বিজ্ঞাপন

মনস্তত্ত্ব বলে, ‘চরম হতাশা, ক্ষোভ বা ক্ষমতার অসম কাঠামোর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ অনেক সময় মৌখিক আক্রমণ বা গালিকে প্রতিবাদের তাৎক্ষণিক মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়।’ সমাজের নিচুতলার মানুষ, যারা ক্ষমতার পরিকাঠামোর বাইরে, যারা অধিকারহারা, তারা প্রায় সময়ই আপনার আঘাতের পরিসীমার বাইরে থেকে আপনার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক এবং সাধারণ ক্ষেত্রে যা অশালীন, সেই শব্দ চয়নের মাধ্যমে তার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে, এটাই মনস্তত্ত্ব। আপনি যতই যুক্তি দেন না কেন, এর বাইরে আর কোনো মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নেই।

এই ব্যাখ্যাকে যদি রাজনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করতে যান, তাতেও ভিন্নতার অবকাশ থাকে না। জুলাই রেভল্যুশনের দিকে তাকান, দেখবেন ক্ষমতাবানদের তাজা বুলেটের বিপরীতে অসহায় মানুষের অস্ত্র ছিল গালি। গুলির বিকল্পে গালি। সে সময়ের বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে গালির দৃশ্যমান প্রয়োগ দেখতে পাবেন। তখনকার স্লোগানের কথা বলি, ‘এক দুই তিন চার, ইয়ে ইয়ে ইয়ে মার’, ‘ইয়ে’টা তো নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বলতে হবে না। মনে আছে, যাত্রাবাড়ীর প্রতিরোধের কথা। স্ট্যালিনগ্রাদতুল্য সেই প্রতিরোধেও কিন্তু আক্রমণাত্মক ও অশালীন শব্দচয়ন শ্রুত হয়েছে। সেফুদার ভাষায় শব্দবোমা। গুলির বিপরীতে দাঁড়িয়ে একটা রাগী প্রজন্মের গালিবোমা। আমাদের কানে তখন সেই গালি ছিল মধুর বাণী, মুক্তির মন্ত্র। কারণ আমরা তখন সবাই অসহায়, ক্ষমতাহীন। ক্ষমতাহীনদের কাছে তখন গালিই বিকল্প অস্ত্র। কবির কবিতা।

কবিতার কথায় আসি। হাংরি আন্দোলনের কথা নিশ্চয়ই জানা আছে, যারা বুদ্ধিজীবী বলে দাবি করেন অন্তত তাদের। এখন অবশ্য বুদ্ধি ছাড়াই অনেককিছু চলে। অ্যাক্টিভিজম চলে, সাংবাদিকতা চলে, সাহিত্য-কবিতা চলে। একটা জোক বলি। উগান্ডার এক মন্ত্রী আমেরিকাতে গিয়েছেন কনফারেন্সে। গিয়ে তার মনে হলো অনেক দিন মগজটাকে ধোলাই করা হয়নি, আমেরিকায় যেহেতু এসেছি, ধোলাই করে যাই। যেই ভাবা, সেই কাজ। লন্ড্রি আদলে মগজ ধোলাইয়ের দোকানে গেলেন মন্ত্রী। মগজটা দিয়ে এলেন এবং বললেন, কনফারেন্স শেষ হলে নিয়ে যাবেন। কিন্তু দিন যায়, মন্ত্রী মগজ নিতে আসেন না। এদিকে যিনি ধোলাইয়ের জন্য মগজটাকে রেখেছিলেন, তিনি পড়লেন বিপদে। কী করেন, অবশেষে অনেক কষ্ট করে মন্ত্রীবাবুর ফোন নম্বর জোগাড় করে ফোনে মগজ নেওয়ার তাগাদা দিলেন। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে মন্ত্রীর জবাব, আবার যখন সরকারি খরচে সফরে আসব, তখন নিয়ে যাব। ধোলাইকার আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলেন, মগজ ছাড়া মন্ত্রিত্ব চালাচ্ছেন কী করে! বিপরীতে মন্ত্রী বললেন, উগান্ডায় মন্ত্রিত্ব চালাতে মগজ লাগে না।

যাকগে, যা বলছিলাম—হাংরি আন্দোলন কী ও কেন? ১৯৬১ সালে ভারতাধীন পশ্চিমবঙ্গের পাটনা থেকে মূলত হাংরি আন্দোলনের শুরু। ষাটের দশকে তৎকালীন সুশীলরা সমাজের ক্ষমতাহীনদের কথা বাদ দিয়ে একধরনের জীবনবোধহীন জম্বি সাহিত্যে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। যে পুতু-পুতু সাহিত্য মূলত ক্ষমতাবানদের বৈঠকখানার সাহিত্য। সেই সাহিত্যের বিরুদ্ধে সমর রায় চৌধুরী, মলয় রায় চৌধুরী ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়দের নেতৃত্বে শুরু হওয়া প্রগতিশীল ও বিদ্রোহী সাহিত্য আন্দোলনই হলো হাংরি মুভমেন্ট বা হাংরি আন্দোলন। মনে রাখবেন, ‘প্রগতিশীল’ ও ‘বিদ্রোহী’ শব্দের চয়নকে। হাংরি আন্দোলনে গদ্যে-কবিতায় অশ্লীল শব্দপ্রয়োগে বাধাহীন হওয়ার কথা বলা হয়। সুতরাং অশ্লীল শব্দ বা গালিও ‘প্রগতিশীল’ ও ‘বিদ্রোহী’ হতে পারে। হেলাল হাফিজের গ্রামের পোলারা যেমন ‘চুৎমারানি গাইল দিতে’ জানে।

গালিও একটা শিল্প; কিন্তু অকারণ গালি কোনো কাজের কথা নয়। ধর্মও অকারণ গালির বিরুদ্ধে। হাদিস বলে, ‘গালিবর্ষণকারী উভয় পক্ষই শয়তানসদৃশ।’ গালি নিয়ে ইসলামে আরো অনেক কথা বলা আছে। কিন্তু মুশকিল হলো, গালির বিষয়ে ইসলামে সরাসরি কোনো শাস্তির কথা বলা হয়নি। ইসলাম বলে, গালি মূলত আখেরাতে শাস্তিযোগ্য, দুনিয়াবি শাস্তির কথা উল্লেখ নেই। তবে ব্যতিক্রম রয়েছে শুধু রাসুল (সা.)-এর ক্ষেত্রে। অধিকাংশ ইসলামি আলেমরা ইজমার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, রাসুল (সা.)-কে গালি দেওয়ার শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড। মনে রাখবেন, এই শাস্তি শুধু রাসুল (সা.)-এর সম্মানে।

আমাদের প্রচলিত আইনে অবশ্য গালি মানহানিকর ও শাস্তিযোগ্য। আইনের ৫০৪ ধারায় গালি একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ, যার সর্বোচ্চ শাস্তি হলো দুই বছরের কারাদণ্ড, কিংবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডই প্রযোজ্য। এই ধারা হলো, ইচ্ছাকৃতভাবে গালি দিয়ে শান্তিভঙ্গের উসকানি-বিষয়ক। বলতে পারেন, কারণ ছাড়া গালি দিয়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি। কিন্তু গালির কারণ যদি রাজনৈতিক হয়, ক্ষমতাহীনদের প্রতিবাদের ভাষা হয়, তাহলে সে গালি শাস্তিযোগ্য কি না, তা আইনজ্ঞরাই সম্ভবত সঠিকভাবে বলতে পারবেন। ৪৯৯ ও ৫০০ ধারাতেও মানহানির শাস্তি রয়েছে এবং তা কিছুটা কম।

বিপরীতে আইনের ভুল প্রয়োগ কিন্তু মানহানির চেয়েও অনেক বেশি শাস্তিযোগ্য। আইনের ২১৯ ধারায় পরিষ্কার বলা আছে, ‘কোনো বিচারক বা সরকারি কর্মকর্তা যদি বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে আইন লঙ্ঘন করে কোনো রিপোর্ট, আদেশ বা রায় প্রদান করেন, তবে তার সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড (সশ্রম বা বিনাশ্রম), অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।’ এ ছাড়া রয়েছে বিভাগীয় শাস্তি। সুতরাং মাইন্ড ইট।

যাকগে, গালি নিয়ে অনেক কথা হলো। কিন্তু চব্বিশের জুলাই রেভল্যুশনের পর ধীরে ধীরে এমন একটা গণতান্ত্রিক সমাজ আমরা গড়ে তুলতে চাই, যাতে গালি হয়ে ওঠে অপ্রয়োজনীয়। মানুষ গালাগালির বিপরীতে গলাগলিকেই একান্ত প্রয়োজনীয় মনে করে। আমরা সেই সমাজের প্রতীক্ষায়।

লেখক: সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন