সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারের সময় গোপনে পরমাণু কর্মসূচি পরিচালনার নতুন প্রমাণ পেয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা—আইএইএ। সংস্থাটির সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়েছে, পূর্ব সিরিয়ার দেইর আজ-জোর এলাকায় একটি অঘোষিত পরমাণু চুল্লি নির্মাণ করা হচ্ছিল। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে জ্বালানি তৈরি ও সংরক্ষণের কার্যক্রমও চলছিল।
আইএইএ’র সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেইর আজ-জোরের স্থাপনাটিতে পাওয়া অবকাঠামোর সঙ্গে পরমাণু চুল্লির অবকাঠামোর স্পষ্ট মিল রয়েছে। বিশেষ করে সেখানে পাওয়া একটি শীতলীকরণ কাঠামো পরমাণু চুল্লির জন্য ব্যবহৃত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সংস্থাটি বলেছে, সিরিয়ার সাবেক সরকার তাদের পরমাণু উপকরণ, স্থাপনা ও কার্যক্রম সম্পর্কে আইএইএকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়নি।
দেইর আজ-জোরের এই স্থাপনাটি ২০০৭ সালে ইসরাইলি বিমান হামলায় ধ্বংস হয়। এরপর সিরিয়ার তৎকালীন সরকার এলাকাটি সমতল করে দেয় এবং আইএইএ’র প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ জবাব দেয়নি। তবে ২০২৪ সালে আইএইএ’র পরিদর্শকেরা ওই এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। পরে সেসব নমুনায় ইউরেনিয়ামের কণা পাওয়া যায়।
আইএইএ’র তদন্তে দেইর আজ-জোরের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত আরো কয়েকটি স্থাপনার তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে একটি স্থাপনায় পরমাণু জ্বালানি তৈরি বা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এবং অন্য একটি স্থাপনায় নির্মাণসামগ্রী ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ধারণা আরো জোরালো হয়েছে যে চুল্লিটি বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্প ছিল না; এর সঙ্গে একটি বৃহত্তর পরমাণু অবকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা ছিল।
তদন্তে আরো চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে সিরিয়ার অন্য একটি অঘোষিত স্থাপনায়। সেখানে প্রায় ৭৩ টন প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম ধাতু পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ টন জ্বালানি রডের আকারে ছিল। বর্তমানে এসব পরমাণু উপকরণ আইএইএ’র নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে।
আইএইএ’র তদন্তে দীর্ঘদিনের একটি সন্দেহও আরো স্পষ্ট হয়েছে। অতীতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন পক্ষের মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, সিরিয়ার গোপন পরমাণু কর্মসূচিতে উত্তর কোরিয়ার সহায়তা ছিল। ২০০৭ সালে ইসরাইল হামলা চালিয়ে দেইর আজ-জোরের অসমাপ্ত চুল্লিটি ধ্বংস করে। ধারণা করা হয়, ওই চুল্লি থেকে ভবিষ্যতে পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপযোগী প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল।
তবে বর্তমান সিরীয় সরকার সাবেক সরকারের এই উত্তরাধিকার নিয়ে আইএইএ’র সঙ্গে সহযোগিতার পথ বেছে নিয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নতুন সরকার আন্তর্জাতিক পরমাণু পরিদর্শকদের সন্দেহজনক স্থাপনাগুলোতে প্রবেশের সুযোগ দেয়। আইএইএ মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি সিরিয়ার এই সহযোগিতাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সিরিয়ার নতুন সরকার জানিয়েছে, দেশটির পরমাণু উপকরণ সিরিয়ার হেফাজতেই থাকবে, তবে তা আইএইএ’র আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীনে থাকবে। দামেস্ক একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ কাজে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহারের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আইএইএও জানিয়েছে, অতীতের অঘোষিত কার্যক্রমের বিষয়টি নিষ্পত্তির পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তিতে সিরিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে।
আসাদ সরকারের গোপন পরমাণু কর্মসূচির এই নতুন তথ্য মধ্যপ্রাচ্যের পরমাণু নিরাপত্তা নিয়ে পুরোনো উদ্বেগকে আবারও সামনে এনেছে। তবে বর্তমান সিরিয়া আইএইএ’র সঙ্গে সহযোগিতা করায় বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা এই তদন্তের সমাধানের পথ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্মুক্ত হয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা, আরব নিউজ, রয়টার্স ও গ্লোবাল সিকিউরিটি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


