“বিশ্ব ইতোমধ্যেই বিশ্বযুদ্ধে”: রে ডালিওর সতর্কবার্তা

আমার দেশ অনলাইন

“বিশ্ব ইতোমধ্যেই বিশ্বযুদ্ধে”: রে ডালিওর সতর্কবার্তা

বিশ্বখ্যাত বিলিয়নিয়ার বিনিয়োগকারী রে ডালিও সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যুদ্ধকে বিচ্ছিন্ন কোনো সংকট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তার মতে, এটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার বড় ধরনের ভাঙনের অংশ এবং ইতিহাসের সেই ধরণের পুনরাবৃত্তির মধ্যে পড়ে, যা বড় যুদ্ধের আগে দেখা গেছে।

বিজ্ঞাপন

একটি ব্লগ পোস্টে তিনি লেখেন, “আমরা এখন এমন একটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে আছি, যা খুব শিগগিরই শেষ হওয়ার নয়।” তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কোনো একক আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও ভূরাজনৈতিক—সব ক্ষেত্রেই বিস্তৃত একাধিক আন্তঃসংযুক্ত সংঘাতের সমষ্টি।

ডালিও বিভিন্ন চলমান সংঘাতের উদাহরণ দিয়ে বলেন—রাশিয়া-ইউক্রেন-ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ, ইসরাইল-গাজা-লেবানন-সিরিয়া সংঘাত, ইয়েমেন-সুদান-সৌদি আরব-ইউএই যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-জিসিসি-ইরান উত্তেজনা—এগুলো আর আলাদা নয়। তার ভাষায়, “সব মিলিয়ে এগুলো একটি ক্লাসিক বিশ্বযুদ্ধের চিত্র তৈরি করছে।”

ডালিওর “বিগ সাইকেল” তত্ত্ব

ডালিওর বহুল আলোচিত “বিগ সাইকেল” তত্ত্ব অনুযায়ী, ইতিহাস একটি পুনরাবৃত্তিমূলক চক্রে চলে, যেখানে একসঙ্গে আর্থিক ব্যবস্থা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য দুর্বল হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, বর্তমানে এমন অনেক সূচক রয়েছে যা দেখায়—বিশ্ব এখন সেই পর্যায়ে আছে, যেখানে আর্থিক শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক কাঠামো এবং ভূরাজনৈতিক বিশ্বব্যবস্থা একসঙ্গে ভেঙে পড়ছে।

এই পর্যায়কে তিনি যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থা থেকে সরাসরি সংঘর্ষের দিকে যাওয়ার ধাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ১৯১৩-১৪ বা ১৯৩৮-৩৯ সালের সময়ের সঙ্গে তুলনীয়।

সংঘাতের ধাপ ও ঝুঁকি

ডালিও তার বিশ্লেষণে বলেন, প্রথমে প্রভাবশালী শক্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং উদীয়মান শক্তি শক্তিশালী হয়। এরপর অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু হয়—নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্য বাধা, জোট গঠন, প্রক্সি যুদ্ধ বৃদ্ধি পায়।

এরপর আর্থিক চাপ, ঋণ, ঘাটতি বাড়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ে। বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত হয় এবং নতুন যুদ্ধ প্রযুক্তি তৈরি হয়।

তিনি বলেন, বিশ্ব এখন সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে “একাধিক অঞ্চলে একসঙ্গে সংঘাত চলছে।”

এর পরবর্তী ধাপ আরও ভয়াবহ হতে পারে—অভ্যন্তরীণ বিরোধ দমন, বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ, এবং যুদ্ধ চালাতে সরকারগুলোর কর বৃদ্ধি, ঋণ নেওয়া, মুদ্রা ছাপানো ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ।

‘জয়ী’ চীন ও রাশিয়া

ডালিওর মতে, এই সংঘাতে ইতোমধ্যেই বিজয়ী ও পরাজিত নির্ধারণ শুরু হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “সবকিছু বিবেচনায় মনে হচ্ছে, চীন ও রাশিয়াই অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে আপেক্ষিকভাবে লাভবান হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে জোটগুলোর ভূমিকা যুদ্ধক্ষেত্রের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। চীন রাশিয়ার সঙ্গে, আর রাশিয়া ইরান, উত্তর কোরিয়া ও কিউবার সঙ্গে অবস্থান করছে—যা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিপরীতে একটি শক্তিশালী ব্লক তৈরি করছে।

১৯৪৫-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন

ডালিও মনে করেন, ১৯৪৫ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়ছে। এর পরিবর্তে “যার শক্তি বেশি, তার নিয়ম”—এমন এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, যেখানে কোনো একক শক্তি আধিপত্য বিস্তার করছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ

তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে এবং একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ চালানো তার জন্য কঠিন হতে পারে।

তার সবচেয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য—“এই পর্যায়ে সাধারণত সংঘাত কমে না, বরং আরও তীব্র হয়।”

ডালিওর মতে, ইরান যুদ্ধ কোনো সংকটের শেষ নয়, বরং একটি বৃহত্তর বিশ্বযুদ্ধের সূচক—যেখানে সামনে আরও সংঘাত বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এসআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন